বেহাল সড়ক, বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা


বেহাল সড়ক, অকার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের মরণদশা

বেশ কিছুদিন ধরে মৃত্যুর খবরে এই দেশের মানুষ জর্জরিত। প্রতিদিনই কম পক্ষে একটি করে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, নিহত আহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, বাড়ছে ঘরে ঘরে কান্নার রোল, কিংবা নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকা। আজ মনে পড়ছে গত মে মাসে আমাদের একজন সহকর্মী মিজান (মুসা) টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা আসার পথে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যায়, আমরা তখন কেউ মেনে নিতে পারি নি। ট্রাকটি মেরে দিয়ে চলে গিয়েছিল, থামে নি। সকলে কেঁদেছি, কিন্তু কিছু করতে পারি নি। আমাদের মধ্যে তার শুন্যতাই বিরাজ করছে, অন্যদিকে তার দুটি অবোধ শিশু সন্তান আজও মনে করে বাবা ফল নিয়ে বাড়ি আসবে। মুসা তাৎক্ষনিক মারা গিয়েছিল, কাজেই কিছু করার ছিল না। ট্রাকের বিরুদ্ধেও কিছু করা যায় নি, কারণ সে ট্রাক কেউ দেখে নি, শুধু এলাকার কিছু লোক দেখেছে। তাদের কাছে ট্রাকের কোন নম্বর নেই। আমি যতোবার কোন দুর্ঘটনার কথা শুনি বা পড়ি তখন নিজেদের এই হারানোর কথা না ভেবে পারি না।

হাইওয়ে দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি রাস্তায় বাস-ট্রাক উলটে আছে। হয়তো রাতে দুর্ঘটনা হয়েছে, কিংবা ভোরে। কখনো দেখা যায় রাস্তায় তখনো মৃতদেহ সাজানো আছে, কাপড়ে ঢাকা। মহিলা ও শিশুর লাশ, কিংবা কোন গরিব দিন মজুরের লাশ। আমরা দেখি, আফসোস করতে করতে পাশ দিয়ে চলে যাই। আসহায় লাগে, কিছু করতে পারি না। যারা আহত অবস্থায় থাকে তাদেরকে হয়তো আশে পাশের কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের চিকিৎসা কি হয়েছে? আহত-নিহতের পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯,৭১০ জন মারা গেছে, গুরুতর আহত হয়েছে ২২৪৮৫ জন। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত ৫ বছরে ২৫০০ মানুষ মারা গেছে, হতাহতের সংখ্যা প্রায় অর্ধ লক্ষ (সকালের খবর, ১৪ আগস্ট, ২০১১)। কথা হচ্ছে, যারা দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছে যাকে বলা হয় ‘স্পট ডেড’, তাদের জন্য সড়কের বেহাল অবস্থা, ড্রাইভারের গাফিলতির কথা বলে আমরা প্রতিকার চাইতে পারি, যদিও স্বজন হারাদের ব্যথা এতোই গভীরে যায় যে তাঁরা শেষ পর্যন্ত মরা মানুষটিকে পোস্ট মর্টেমও করতে দিতে চান না, মামলা করা তো দূরে থাক! কী হবে তাঁকে আরও কষ্ট দিয়ে। কিন্তু যারা আহত (তাদের সংখ্যাই বেশী), তাঁরা যেন ‘মরে নাই’ বলে অপরাধ করেছেন। না মরলে কান্না নেই, মিডিয়ার দৌড় ঝাঁপ নেই, তাদের প্রতি কারো সমবেদনা নেই।

আহতদের সাধারণত মহা সড়কের কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেগুলো উপজেলা পর্যায়ে হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র আর জেলা পর্যায়ের হলে সদর হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। আজকাল রাস্তার ধারে ছোট শহরগুলোতে প্রাইভেট ক্লিনিকও থাকে। সেখানেও আহতরা চিকিৎসার জন্য ছোটেন। কিন্তু সরকারী হাসপাতাল হলে কি সে সময় কোন ডাক্তার থাকেন? বা প্রাইভেট ক্লিনিক হলে বিনা পয়সায় চিকিৎসা কি পাওয়া যায়? হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসার ক্ষেত্রে কি ঘটলো তা আর জানা যায় না।


Hospital


গত ১৩ আগস্ট, মানিকগঞ্জে প্রখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা তারক মাসুদ ও এটিএন নিউজ-এর প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরসহ ৫ জনের তাৎক্ষ্ণিক মৃত্যু ও মারাত্মক আহত মামুন আল ঢালী এবং সাধারণ আহত ক্যথরীন মাসুদ ও দিলারা বেগম জলির ঘটনা থেকে দেখা যাক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আহতদের কতখানি সেবা দিতে সক্ষম। দিলারা বেগম জলি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে বসে প্রথম আলোকে দেয়া একটি সাক্ষাতকারে (১৫ আগস্ট, ২০১১) বর্ণনা দিয়েছেন, ‘এ পথ দিয়ে কত প্রাইভেট কার, মাইক্রবাস গেল। আমি আর ক্যাথরিন কত অনুরোধ করলাম তাদের দাঁড়ানোর জন্য, কেউ দাঁড়াল না। পরে একটা বাস থামল। কয়েকজন তরুণ আমাদের ওঠালেন। মানিকগঞ্জ সদর মোড়ে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হোল। বাসে থাকা দুজন তরুণের সহযোগিতায় আমরা একটা ব্যটারীচালিত অটোরিক্সা নিয়ে হাসপাতালে যাই। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, মামুনের সামনের দাঁত প্রায় ভেঙ্গে গেছে। চোয়াল থেতলে গেছে। চিকিৎসকেরা বারবার বলছেন, ওনাকে ঢাকায় নিয়ে যান দ্রুত। অবস্থা খুব খারাপ। আমি এম্বুলেন্স নিয়ে মামুনসহ ঢাকার দিকে রওয়ানা দিই। ক্যথরিন এম্বুলেন্স নিয়ে তারেকদের কাছে যায়।’ জলির পক্ষে এর বেশী বলা সম্ভব ছিল না। এমন একটি দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করে এর বর্ণনা দেয়া নিজের ওপর যন্ত্রণা কি হতে পারে তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে।

চিকিৎসা না পেলেও জলি ও ক্যাথরিন ঢাকা আসার জন্য এম্বুলেন্স পেয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা এসে মাথায় চোট পাওয়া ক্যাথরিন যানজটে আটকা পড়ে এম্বুলেন্স থেকে নেমে রিক্সায় স্কয়ার হাসপাতালে গেছেন, ঢালী আল মামুনকে নিয়ে জলির এম্বুলেন্স ছাড়া যাওয়া সম্ভব ছিল না।

একই দিনে বেলা ৪টায় আরও একটি বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটেছিল। পাবনা-নগরবাড়ী মহা-সড়কের সাঁথিয়া উপজেলার গাংহাটি ক্লাব এলাকায় যাত্রীবাহী একটি বাস খাদে পড়ে পাঁচ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছে। আহতদের পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারী ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার সাথে এইটুকু চিকিৎসা কেন্দ্রিক খবর প্রায় সময় থাকে কিন্তু আহতরা আসলে চিকিৎসা পেয়েছেন কিনা তা তো আর জানা যায় না। যারা সাধারণ যাত্রী তাঁরা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হলে কি বিনা পয়সায় কিংবা কম পয়সায় চিকিৎসা পান কিনা আম রা জানি না। তাঁদের কাছে বেশী টাকাও সব স ম য় থাকে না। তাহলে কি হয়? হাজার হাজার আহতদের যে পরিসংখ্যান আমরা আগে পেলাম, তাদের কত জন শেষ পর্যন্ত সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছেন আমরা কি সে খবর রাখছি?

প্রথম আলোতে শেখ সাবিহা আলমের প্রতিবেদন (১৬ আগস্ট, ২০১১) এই বিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছে। সবচেয়ে দুঃখ লেগেছে নারায়ণ চন্দ্র মজুমদার নামক একজন আহতের ডান পা কাটা গেছে, পচন ধরেছে অন্যটিতে। অর্থাৎ আহতদের একটু খোঁজ খবর নিলেই বেরিয়ে আসছে এমন দুঃখজনক তথ্য, যা মৃত্যুর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি নিজেকে দুর্বিসহ জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

সরকারী হাসপাতালে ডাক্তারের অনুপস্থিতি এবং নিয়োগ না থাকা সড়ক দুর্ঘটনার খবরের মতোই নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে। উবিনীগের নিয়মিত পত্রিকা পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু শিরোনাম তুলে ধরছি। ভন্ডারিয়ার সব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক সংকট (নয়া দিগন্ত, ১৭ এপ্রিল, ২০১১), চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তার সংকট তীব্র (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ এপ্রিল, ২০১১), চিকিৎসক সংকট নিয়ে চলছে ঈশ্বরদীর হাসপাতাল (সকালের খবর, ৩ জুলাই, ২০১১) হাসপাতালে না গিয়ে ৯ জন চিকিৎসক বেতন তুলছেন (প্রথম আলো, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১১), ২৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় ১০ চিকিৎসক (যুগান্তর, ২৯ মে, ২০১১), ভাড়া করা ডাক্তার দিয়ে চলছে কাউনিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (আমার দেশ, ৫ জুন, ২০১১), রাজিবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক নেই আট দিন (কালের কন্ঠ, ২৫ জুন, ২০১১), ডাক্তারের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা (সকালের খবর, ৩ জুলাই, ২০১১) ... ইত্যাদী। বলা বাহুল্য, আমি এখানে মাত্র এক চিমটি তথ্য বা শিরোনাম তুলে ধরে একটু ধারণা দিচ্ছি, এটা বোঝানোর জন্যে যে স্বাস্থ্য সেবা যারা দেবেন তারা আদৌ কর্মস্থলে আছেন কিনা। যদি এই তাদের অবস্থা হয়, তাহলে সময়ে-অসময়ে সড়ক দুর্ঘটনা হলে আহতরা এসে কি আদৌ কোন চিকিৎসা পাবেন? দুর্ঘটনা তো আর অফিস টাইম ধরে হবে না! 

ডাক্তার ও এলোপ্যথিক ওষুধ কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই সরকারের স্বাস্থ্য সেবার এক্ মাত্র ধরণ। সরকার উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করে দিয়েছে। দাতা সংস্থাও অর্থ ঢেলেছে প্রচুর। উপজেলা পর্যায়ে সুনির্মিত বিল্ডিং বলতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রই প্রধানত চোখে পড়ে। এই পর্যন্ত পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে ৪২১ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১৫৮৯৮ বেডে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখানে কত জন ডাক্তার উপস্থিত আছেন এবং চিকিৎসা দেয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন? এই প্রশ্নে উত্তর খুঁজলে মুখের হাসি মিলিয়ে যাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে (HRD Data Sheet -2011) দেশে চিকিৎসকদের প্রাপ্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা লাভ করা যায়। মোট ৫৩,০৬৩ জন রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট ডাক্তারের মধ্যে দেশে কর্মরত আছেন ৪৩, ৫৩৭ জন। এই সব ডাক্তারের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে ৩৫% এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছেন ৩%, মোট ৩৮% ডাক্তার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন। আর বেসরকারীভাবে ডাক্তারী পেশা চর্চা করছেন ৫৮% । ডাক্তারদের স্ব স্ব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক গড় মিল। অনুমোদিত পদে ডাক্তারদের নিয়োগ সব পর্যায়ে শুন্য পদের সংখ্যাই অনেক বেশী। যেমন মহা পরিচালক, উপ-পরিচালক, পরিচালক অনুমোদিত ১৬% পদ, সিভিল সার্জেন ও সহকারী পরিচালক ৫৬% পদ, মেডিকেল অফিসার ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ২৮% পদ শুন্য রয়েছে। (এই শতকরা হিসাব HRD Data Sheet -2011 এর ৭ ন ং ছক (Doctor’s Staffing Position) থেকে করা হয়েছে) তদুপরি নিয়োগপ্রাপ্তরাও হাসপাতালে থাকছেন না। তাহলে রোগীরা গিয়ে কার কাছ থেকে চিকিৎসা নেয়? আমার কাছে মনে হচ্ছে সড়ক ঠিক করলেই নিশ্চয়ই রাতারাতি দুর্ঘটনা তো আর কমবে না, সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্তত যারা প্রাণে কোন মতে বেঁচে গিয়েছেন, তাৎক্ষনিক চিকিৎসা লাভ করে তাঁদের বাকী জীবনটা যেন স্বাভাবিক হতে পারে তার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও উন্নতি বা সংস্কার একান্তভাবে দরকার।

আরও একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। গত কয়দিনে মৃত্যু শুধু মাত্র সড়ক দুর্ঘটনাতেই ঘটে নি, হাসপাতালের অবহেলার কারণেও হয়েছে। সরকারী হাসপাতালের অব্যস্থাপনার কথা অনেক ফলাও করে বলা হয়, কিন্তু বেসরকারী হাসপাতালের কথা শোনা যায় না। অথচ এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে খোদ ঢাকা শহরের অভিজাত বেসরকারী হাসপাতালে। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, লোকসংগীত গবেষক ও শিল্পী অধ্যাপক মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেছেন। আত্মীয় স্বজন অভিযোগ করেছেন যে তিনি ডাইরিয়া আক্রান্ত হয়ে পানিশুন্যতায় ছিলেন কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার পর ভর্তির প্রক্রিয়ার বিলম্বের কারণে তিনি মারা যান। প্রাইভেট হাসপাতালে ভ র্তির প্রক্রিয়ার সাথে টাকা জমা দেয়ার সম্পর্ক জড়িত। রোগীর জীবন সেখানে মুখ্য নয়। এদিকে গত ১৫ অগাস্ট বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বৈশাখীতে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার কারণে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ব্যাখ্যায় রাজধানীর এই দুই বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবএইড ও ইবনে সিনার শীর্ষ কর্মকর্তাদের তলব করেছে হাইকোর্ট।

বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবা তো নয়, পাক্কা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলছে দাপটের সাথেই। এদের ওপর সরকারের কোন প্রকার নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা নাম করা সরকারী ডাক্তারদের ব্যবহার করে মুনাফার হার বৃদ্ধি করছেন কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই জরুরী সেবার কোন ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে বেসরকারী হাসপাতালে রোগী মরণাপন্ন হলে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সরকারী হাসপাতালে। ১৯৮২ সালে প্রণীত বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবা অধ্যাদেশ ১৯৮৪ সালে হালনাগাদ করা হয়, কিন্তু এরপর ২০০০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত হালনাগাদের পদক্ষেপ নেয়া হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখে নি। ( সমকাল, ৫ এপ্রিল, ২০১১)। কাজেই নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলছে এই ব্যবসা।

সড়ক দুর্ঘটনা ও রাস্তার বেহাল দশা দেখে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগাযোগ মন্ত্রীকে সড়ক মেরামতের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়ার কারণে তোড়জোর কাজ শুরু হয়েছে। একইভাবে তিনি চিকিৎসকদেরও গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘একজন ডাক্তার তৈরী করতে সবচেয়ে বেশী খরচ হয় আর জনগণই এই খরচের যোগান দেয়। এ কারণে চিকিৎসকদের অবশ্যই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্ব স্ব কর্মস্থলে থেকে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। গ্রামে থেকে চাকরী করতে ভাল না লাগলে চাকরি ছেড়ে দিন। সরকারের চাকরি করবেন আর কর্মস্থলে থাকবেন না, সেবা দেবেন না তা হতে পারে না’ (ইত্তেফাক, ১৩ মার্চ, ২০১১)। মে মাসে প্রধান মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী সভার বৈঠকে ‘ডাক্তার হতে হলে গ্রামে এক বছর ইন্টার্নি করতে হবে, অন্যথায় ডাক্তারি সনদ দেয়া হবে না, এমন বিধান রেখে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ অনুমোদন দেয়া হয়েছে (ইত্তেফাক, ৩১ মে, ২০১১)। এই কথা মানা হচ্ছে না জেনেও এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা প্রধান মন্ত্রী নিজে স্ব-উদ্যোগী হয়ে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন?

চারিদিকে যখন এতো ধরণের অন্যায়ভাবে জীবন শেষ হতে দেখছি, তখন মনে হয় শুধু কি আমরা সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের আশায় বসে থাকবো? আমরা কি কিছু করতে পারি না? এভাবে আর কত দিন চলবে?


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।