বিটি বেগুনের পর জিএম আলু! বেগুন তো গেল, এখন কি আলুও দুষিত হবে?


একের পর এক জিএম ফসলের প্রবর্তন করে এদেশের গরিবের পেটে লাথি মারার মতো কাজ শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের খাবারের তালিকায় কী থাকে? তারা মাছ মাংস খেতে পারে না দামের কারণে, মাসে একদিন কি দুদিন বড় জোর খাওয়া হয়। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকে সহজলভ্য সব্জি। বেগুন ভাজি বা আলু বেগুনের সব্জি, আলু ভর্তা, ডাল ও ভাত খেয়েই সাধারণ মানুষের জীবন চলে। দ্রুত রান্নার সুবিধার জন্য শহরের বসবাসকারী শ্রমিকেরা এই খাদ্য খেয়েই তাঁরা কারখানায় যান কাজ করতে। বেগুন ও আলুর মধ্যে পুষ্টিগুন ও বিদ্যমান। নারীদের জন্যে বিশেষ করে এই সব্জি খুব উপকারী। সবমিলিয়ে বেগুন ও আলু মানুষের অতি প্রিয় সব্জি – ধনী গরিব সবাই নানাভাবে এই সব্জি খান। অন্যদিকে কৃষকদের মধ্যে ক্ষুদ্র কৃষকরাই বেগুন ও আলু উৎপাদন করে থাকেন। এমনকি যার চাষের জমি নাই শুধু ভীটেবাড়ী আছে, তারাও দুএকটি বেগুন গাছ লাগিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারেন। আলু চাষের জমিতে হলেও হলেও গ্রামের গরিব মানুষ (বিশেষ করে নারী ও শিশুরা) মাঠ থেকে আলু এবং শাক তুলে নিতে পারেন, কিংবা তোলার পরে মাঠে যে আলু থাকে তা তোলার অধিকার তাদের থাকে। রবি মৌসুমে এই দুটি ফসল কৃষকের আয়ের উপায়। বেগুন বর্ষা মৌসুমে যখন অন্য সব্জি কম থাকে তখনও হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়, বেগুন ও আলু এশিয়ার প্রায় সব দেশে সাধারণ মানুষের খাদ্য। একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রায় সব দেশের মানুষের খাদ্য। বিশ্বের অনেক দেশেই আলু মূল খাদ্য। বাংলাদেশেও একসময় আলুর ব্যবহার বাড়াবার জন্যে শ্লোগান উঠেছিল “বেশী করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান”। বাণিজ্যকভাবেও এর বাজার সারা বিশ্ব জুড়ে রয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে এমন দুটি সব্জি ফসলে বিজ্ঞানের নামে জেনেটিকালী মডিফাই করা হচ্ছে। বেগুন এদেশের আদি ফসল। শত শত জাত পাওয়া যায় সারা দেশে। দেশীয় বেগুনে পোকার আক্রমণ হাইব্রিড ও উফশীর তুলনায় অনেক কম হয়। উফশী ও হাইব্রীডে বাণিজন্যক চাষে পোকার আক্রমণের কারণে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যার বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন বলে আসছেন। কিন্তু সে ব্যাপারে কোন উদ্যোগ না নিয়ে বেগুনে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের নামে মাটির ব্যাক্টেরিয়ার জিন, ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস (bacillus thuringenesis সংক্ষেপে বিটি) ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিসটাল জিন বেগুনে সংযোজন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হিশেবে বলা হয়েছে বেগুনের ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এভাবে বেগুনকে জিএম খাদ্য বানানো হয়েছে। জিএম খাদ্যের উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি আছে বলে বিটি বেগুনের চাষের অনুমোদনের আগে ও পরে ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ হয়েছে; পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। সেই বিষয়ে সম্পুর্ণ নিশ্চিত না হতেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) ঘোষণা দিয়েছে দুটি আলুর জাতের মধ্যে লেট ব্লাইট প্রতিরোধক জিন ঢুকিয়ে late blight resistance gene (Rb) potato বানানো হচ্ছে। এবার আলুও জিএম হয়ে গেল! বারি ঘোষণা দিয়েছে যে এর কনফাইন্ড ট্রায়ালের অনুমোদন পাওয়া গেছে। অন্য যে কোন ফসলের মতো আলু potato (Solanum bulbocastanum) তেও নানারকম রোগ বালাই হয়। এর মধ্যে একটি ছত্রাক (fungus) থেকে late blight নামক রোগ হয় যা আলুর ফসলে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে পারে। যদিও আলুর জন্যে এটাই একমাত্র সমস্যা নয়। বাংলাদেশের আলু চাষীরা লেট ব্লাইটের আক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আলু বাজারজাতকরণের সমস্যা। যেমন এ বছর (২০১৩-১৪) ৮৫ লাখ টন উৎপাদন লক্ষমাত্রার বিপরীতে আলু উৎপাদন হয়েছে ৮৬ লাখ টনেরও বেশি। অনেক স্থানে এখনো আলু তোলাই হয়নি। এই খবর প্রতিদিন পত্রিকায় আসছে, কৃষকেরা বেশী ফলনের আনন্দ করছেন না, বরং মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন কারণ তাঁদের আলু বিক্রি করতে হচ্ছে কেজি প্রতি দেড়-দুই টাকায়। (প্রথম আলো, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। প্রথম আলোতে কার্টুন দেয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরি আলুর শিলা-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে ছাতা নিয়ে বসে আছেন, আর কৃষকের মাথায় আলুর শিলা-বৃষ্টি হচ্ছে। এর সাথে তো লেট ব্লাইটের কোন সম্পর্ক নেই। এতে আরও বোঝা যায় আলু উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখন ফলনেরও কোন সমস্যা নেই। তাহলে লেট ব্লাইট প্রতিরোধের নামে জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং করার প্রয়োজন হোল কার স্বার্থে? কৃষকের স্বার্থে নিশ্চয় নয়। কৃষকের স্বার্থে হলে বাজারজাতের সমস্যা আগে সমাধান করা উচিত ছিল। তা না করে নতুন প্রযুক্তি আনার দরকার কি? কৃষকরা কি দাবী তুলেছিল? আমাদের জানা মতে এমন কোন দাবী ওঠে নি। অর্থাৎ কৃষকের নয়, কিংবা ভোক্তার চাহিদার কারণে নয়, কম্পনির স্বার্থেই আলু ও বেগুনে জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং করা হচ্ছে। বেগুনের মতো আলুও যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএস আইডি এর সহযোগিতায় কৃষিতে বায়োটেকনোলজির প্রকল্প ABSPII এর অধীনে করা হচ্ছে। বিটিবেগুন তিনটি দেশে (ভারত, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশ) গবেষণা করা হয়েছিল, যার মধ্যে দুটি দেশে নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে, আলুও তিনটি দেশে হচ্ছে (ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ) হচ্ছে। এভাবে ইওরোপ ও আমেরিকায় পরিত্যক্ত প্রযুক্তি এশিয়ার দেশগুলোতে পাচার হয়ে আসছে। কারণ এখানে সরাসরি অধিক সংখ্যক ভোক্তাদেরও পাওয়া যাবে এবং এখানে আইনী কাঠামো দুর্বল।

বাংলাদেশের জন্যে বেগুন ও আলুতে জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ফলে কোন অর্থনৈতিক লাভ নেই। এই দুটি সব্জিকে জেনেটিক ইঞ্জীনীয়ারিং করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজার বাড়বে না বরং সংকুচিত হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশী, কারণ বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে যারা সব্জি আমদানী করে তারা জিএমও নয় এমন খাদ্যের জন্যেই কেনে। এদেশ অতি আধুনিক জিএমও ফসলের উৎপাদনের জায়গা নয়, কাজেই এই ফসলে জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং আমাদের সব্জি রপ্তানী বাজারকে হুমকির মধ্যে ফেলবে, যার ইঙ্গিত ইতিমধ্যে ইওরোপের দেশগুলোর ভোক্তা সংগঠন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশে জিএমও ফসল হলে লেবেল লাগাবার দাবী জানিয়েছে। অর্থাৎ যারা জিএম খাদ্য খেতে চান না, তারা যেন জানতে পারেন কোনটি জিএমও এবং কোনটি জিএমও নয়।

বাংলাদেশে বিটিবেগুন ছাড় দেয়ার পর লন্ডনের ‘জিএম ফ্রিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)কে একটি ইমেইল বার্তা পাঠিয়ে এই বেগুন ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২২.১.২০১৪)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হেলেনা পলের সই করা চিঠিতে বলা হয়, বিটি বেগুন ইউরোপে রপ্তানি হলে ওই মহাদেশে বাংলাদেশি সবজির বাজার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর উত্তরে ইপিবির বক্তব্য হচ্ছে, “আমরা পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক দেশের নীতিমালা অনুসরণ করি। তাই কোনোভাবেই ইউরোপ কেন- কোনো দেশে বিটি বেগুন যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।” ইপিবির ভাইস-চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসুর বরাতে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম –এর প্রতিবেদনে বলা হয় গত অর্থবছর (২০১২-১৩) প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর আগের বছর তা ছিল ৬২০ কোটি টাকার। চলতি বছর (২০১৩-১৪) সবজি রপ্তানি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইপিবি কর্মকর্তা। অর্থাৎ আমাদের রপ্তনীর পণ্যের মধ্যে সব্জি একটি সম্ভাবনাময় পণ্য হিশেবে ক্রমে গড়ে উঠছে। অথচ সরকারের একটি দায়িত্বহীন ও বাড়াবাড়ি সিদ্ধান্তের জন্যে এই সম্ভাবনাময় বাজার নষ্ট হতে যাচ্ছে। আমাদের এখান থেকে যতোই বলা হোক যে বিটিবেগুন রপ্তানি হবে না, ইওরোপের আমদানিকারকরা তা বিশ্বাস করবে না। এবং আরো বেশী অবিশ্বাসের কারণ হবে যখন তারা দেখবে শুধু বেগুন নয় একের পর এক অন্য খাদ্য ফসলও জিএম হচ্ছে। যেমন আলু। বাংলাদেশ নিজেকে জিএম ফসলের দেশ হিশেবে পরিচিত করছে। জিএম খাদ্য নিরাপদ খাদ্য বলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত নয়। বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী জিএম খাদ্যের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জিএম ফসল উৎপাদন করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন কারী দেশ হিশেবে প্রমাণ করবে?

এদেশের সাধারণ কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিরোধী এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে সরকার বিরত থাকবেন আমরা এই আশা করছি।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।