Search  Phonetic Unijoy  English 

স্বাস্থ্য আন্দোলন


Tuesday 29 May 12



print

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াও - স্বাস্থ্য আন্দোলন

স্বাস্থ্য আন্দোলন  বিগত তিন বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াবার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। প্রায় কোন সরকারের আমলেই স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৭% পর্যন্ত যায় নি। ২০০৭-০৮ থেকে ধরলে গড়ে ৬.৪% যা মোট জিডিপির মাত্র ১%। চলতি অর্থবছরের (২০১১-১২) জাতীয় বাজেটে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ তার চেয়েও কমে গিয়েছে, বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের ৫.৪% এবং মোট জিডিপির মাত্র ০.৯৮%। আন্তর্জাতিক বিধি অনুসারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য জিডিপির কমপক্ষে মাঝারি মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য জিডিপির ৫% বরাদ্দ প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ কোনো বছরই ১% এর বেশি দেয়া হয় না। বাজেটে স্বাস্থ খাতে বরাদ্দের এই ক্রমাবনতিতে স্বাস্থ্য আন্দোলন উদ্বগ পরকাশ করেছেন। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

বিগত বাজেটগুলোর পর্যালোচনা করে কয়েকটি দিক তুলে ধরা হয়:

১. বাজেট প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কারো অংশিদারিত্ব নেই এবং কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত হয় বলে সারা দেশে সকল এলাকার জন্য একই নীতি অনুসরণ করা হয়। এখানে অঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকারমূলক চাহিদাগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়না বলে বাজেট বরাদ্দের সুষম বণ্টন হয়না।

২. বিশেষ জনগোষ্ঠি, যেমন আদিবাসি, প্রতিবন্ধী এবং প্রাকৃতিক দুর্গত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সেবার বিশেষ কোন ব্যবস্থা আজও নেয়া হয় নি।

৩. দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার জন্য পর্যায়ক্রমে ১৮০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে চালু করা হয়েছে ১০,৭২৩টি। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রসূমহ মিলিয়ে আরো ৪৫০০টির অধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা পর্যায়ে ৪৩২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালু রয়েছে। এই সেবাকেন্দ্রগুলোকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়া হয় নি।

৪. বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫ কোটি মানুষের জন্য সরকারি ডাক্তার রয়েছে ১২ হাজার, পদ রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার। ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান সব মিলিয়ে শূন্য পদের সংখ্যা ২৬ হাজার। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে এক লাখ মানুষের জন্য ১০ জন প্রশিক্ষিত ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে এক জনের বেশি ডাক্তার নেই। এখনো বাংলাদেশের ৪,৭১৯ জনের জন্য এক জন ডাক্তার ও ৮,২২৬ জনের জন্য একজন করে নার্স রয়েছে। স্বাস্থ্য জনবল বাড়াবার জন্যে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. প্রতি বছর মোট স্বাস্থ্যসেবা চাহিদার মাত্র ২৫-৩০% সরকারি খাত থেকে এবং ৭৫-৮০% বেসরকারি খাত হতে পূরণ হয়। এইভাবে চলতে থাকলে সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষ, যারা এখনো সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল তারা বঞ্চিত হবে। সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে জনগণের চাহিদা মেটাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. দেশে চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিক্সদের চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষা ও চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উপযোগি একটি দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী গড়ে তোলা দরকার। সরকারের কর্মপরিকল্পনায় উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ধাত্রী সংখ্যা ২০১৪ সালের মধ্যে বর্তমানে ৬০২৯ জন থেকে ৯০২৯ জনে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নিয়োজিত সরকারি/বেসরকারি সকল স্তরের চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কোর্স ইত্যাদি প্রদানের কথা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে উল্লেখ করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতে দেখা যায় নার্সদের দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের তেমন কোনো সুযোগ নেই। অথচ গুণগত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া খুবই জরুরি।

৭. তৃণমূল পর্যায়ে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির সহজলভ্য স্থান হচ্ছে থানা স্বাস্থ্য করপ্লেক্স। এই হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপযুক্ত সেবা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক এ্যাম্বুলেন্স, জরুরী রোগী ও প্রতিবন্ধী রোগীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা খুব জরুরী হলেও এগুলো সঠিকভাবে থাকে না।

৮. জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীদের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঔষধপত্র কেনা এবং অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে দালালদের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত ফি প্রদান করতে হয়। এছাড়া ওয়ার্ডবয়, আয়াদের সেবার জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য হতে হয়। এতে করে রোগীদের ভোগান্তি অনেক বেড়ে যায়। অন্ত: বিভাগের রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়ে টাকা দিতে হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ না থাকায় জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা সেবা না পেয়ে উন্নততর চিকিৎসার জন্য সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর শরণাপন্ন হয়।

৯. স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন এবং একই সাথে তামাকজাত পণ্য যেমন সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল ইত্যাদির ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট অ-সংক্রামক রোগের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য উচ্চ হারে কর আরোপ করে রাজস্ব আয় বাড়ানো যেতে পারে এবং সেই রাজস্ব আয় সরাসরি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। এর ফলে মানুষের জীবন বাঁচবে।

বাজেট বরাদ্দের সাথে সরকারের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি এবং জনগণের চাহিদা প্রাধান্য পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সবগুলো বিষয়কে বিবেচনা করা হয় না। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক এবং অগণতান্ত্রিক। এখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সুষ্ঠু পরিকল্পনা জনগণের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ স্বাস্থ্য অর্থায়নের বিষয়টিকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (কর্মকৌশল ২০)। এখানে সম্পদের ঘাটতি পূরণের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানসমূহে চাকুরীজীবীদের জন্য বীমা করা এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গোষ্টির স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতি দরিদ্র জনগোষ্টির জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য সেবা কার্ডের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য নীতিতে স্বাস্থ্য অর্থায়ন নিয়ে এই পরিকল্পনা দরিদ্র জনগোষ্টির বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আমরা দাবী করছি, স্বাস্থ্য নীতি ও জাতীয় বাজেটে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে প্রয়োজনীয় সকল খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হোক।

স্বাস্থ্য আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবী:

ক। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমপক্ষে ৭% করতে হবে।

খ। এলাকা ভিত্তিক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বন্টন করতে হবে।

গ। গরিব মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার জন্য গ্রাম ও শহরের সরকারী স্বাস্থ্য সেবা উন্নত করতে হবে।

ঘ। তামাক পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধ্বি করে সেই বাড়তি রাজস্ব স্বাস্থ্য সেবা খাতে ব্যবহার করতে হবে।

সবশেষে স্বাস্থ্য আন্দোলনের দাবী: জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ চাই।

স্বাস্থ্য আন্দোলন আয়োজিত 'জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ চাই” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন ২৯ মে সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-তে অনুষ্ঠিত হয়। এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. রাশিদ-ই-মাহবুব, সৈয়দ মাহবুব আলম, মাহমুদা খাতুন, শাহীনুর বেগম, শারমিন আকতার রিনি, মাকসুদা খাতুন। সঞ্চালনা করেন ফরিদা আখতার এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আমিনুর রসুল।


Related Articles


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Comments Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : স্বাস্থ্য, বাজেট,

View: 3269 Bookmark and Share


Home
EMAIL
PASSWORD