বাজেটে কি ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রতিফলন?


অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট ২০১৪-১৫ দশম জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন। এ সংসদের ১৫৪টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় 'নির্বাচিত', আর বাকি আসনগুলোয় যে ভোট হয়েছে তাতে ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। সবচেয়ে বড় কথা দেশের অনেক রাজনৈতিক দল, ছোট-বড় কেউই অংশ নেয়নি। বড় দল বা সাবেক বিরোধী দল বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। কাজেই বাজেট ঘোষণার জন্য সরকারের জনসমর্থন আছে কিনা বিচার করলে, সেটা নেই। বাজেটে রাজস্ব আয়ের জন্য কর ধার্য করা হয়, জনগণ সেটা মেনে নিয়ে কাজ করে। এবার জনগণের মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। এ বাজেট কি আমাদের জন্য?

তবুও অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করেছেন তার নিয়ম রক্ষার জন্য। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। মোট আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। ঘাটতি ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। তিনি বাজেটের মাধ্যমে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা আসলেই বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা, তা সময়েই দেখা যাবে। প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে_ পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করা, রেলের উন্নয়ন করা, কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রবাসে শ্রমিক নিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া, স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা, পরিবেশ উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আকার বাড়ানো ইত্যাদি। এসব না বললেই নয়। নির্বাচনী ইশতেহারের কথা, এবার বলার সুযোগ হয়নি, তাই এখন বলা হচ্ছে। আমাদের দেশে 'গণতন্ত্র' এমন যে, সরকার জনসম্পৃক্ত কিছু করার আগে জনগণের সঙ্গে কোনো প্রকার মতবিনিময় করেন না। তারা যাদের সঙ্গে প্রয়োজন মনে করেন শুধু কথা বলেন, অন্যরা নানাভাবে সভা করে, পত্রিকায় লেখালেখি করে কিংবা সংবাদ সম্মেলন করে অর্থমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেন। যদিও এ দাবি গৃহীত হবে কি হবে না, বা না হলে কেন হবে না, তার কিছুই জানা যায় না। এ দেশ অনেক ছোট। এখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ খুব কঠিন নয়। কিন্তু জনগণের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব অনেক বেশি। এ দূরত্ব ঘোচাতে হলে রাজনীতিতে বিশেষ দলের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। নির্দলীয় অবস্থানে থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ কথা বলা অনেক কষ্টের। আমরা সেই কষ্টের মধ্যে আছি।

তবুও অর্থনীতিবিদরা কয়েক দিন উঠেপড়ে লেগেছিলেন বাজেট বিশ্লেষণ করার জন্য। দেখে মনে হয় বাজেট শুধু অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপার। টেলিভিশন দেখলে এবং পত্র-পত্রিকা পড়লে তাই মনে হয়। অর্থনীতিবিদরা বলবেন, বাজেট ভালো হয়েছে না মন্দ হয়েছে, ব্যবসায়ীরা বলেবেন তারা খুশি হয়েছেন না অখুশি হয়েছেন, তাতেই বাজেটের সত্যিকারের ব্যাখ্যা হয়ে গেল। জনগণ কী বলছে সেটা জানার দরকার নেই! তবে এবার বাজেটের সমালোচনায় অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে সাহিত্য করেছেন বেশি। কেউ বলেছেন উচ্চাভিলাষী, কেউ বলেছেন লক্ষ্যবিলাসী আবার রাজনীতিবিদরা তাল মিলিয়ে বলেছেন স্বপ্নবিলাসী। এ ধরনের সমালোচনার কোনো অর্থ অর্থমন্ত্রীর কাছে নেই, তা বোঝা গেছে বাজেটের পরে সংবাদ সম্মেলনে। তিনি বলে দিয়েছেন, 'উচ্চাভিলাষী বলেই ৫ বছরে বাজেট আমরা দ্বিগুণ করেছি। রাজস্ব আদায়ও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে বাস্তবতাসম্পন্ন উচ্চাভিলাষের কারণে। প্রস্তাবিত বাজেটও বাস্তবায়ন সম্ভব। অর্থায়নে কোনো সমস্যা হবে না। এ ধরনের উচ্চাভিলাষীর সার্থকতা আছে।' তবে বাজেটকে লক্ষ্যবিলাসী বলার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।' ব্যস শেষ।

অথচ বাজেট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানে। বাজেট পাস না হতেই কর আরোপিত দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। জনগণকে ব্যাখ্যা করা হয় না, কোনটা কেন বাড়ল। এ বাজেটে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতা ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে ভ্যাটের হার বৃদ্ধি ও ছোট-বড় সব খাতে একই হারে ভ্যাট আদায়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা এ সুযোগে সেবা ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভ্যাট সরাসরি যে ভোক্তা সেই দেয়, ফলে ভ্যাটের দায়ভার জনগণের ওপরই এসে পড়বে। কর আরোপ কি রাজস্ব আয়ের জন্য করা হচ্ছে নাকি দাম বাড়িয়ে কিছু দ্রব্যের ব্যবহার কমানোর ইচ্ছা সরকারের আছে, সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যারা তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের সঙ্গে আছি, আমরা দাবি করেছি বিড়ি-সিগারেট, জর্দা-গুলের ক্ষেত্রে কর বাড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। এবারের বাজেটে তামাক পণ্যের ওপর করারোপ করা হয়েছে কিন্তু সেটা যথেষ্ট হয়নি। তার কারণ এ শিল্পগুলো যারা চালান তারা সরকারের কাছে ধরনা দিয়েছে কর না বাড়ানোর জন্য এবং সরকার জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষার চেয়েও তাদের কথা রাখার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তামাকবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক তাইফুর রহমান তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, 'সব স্তরের সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে বিভিন্ন হারে : ৯.৫৭ থেকে ১৯.০৫ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে সিগারেটের দাম কিছুটা বাড়বে, তবে বিশেষ করে সস্তা দামের সিগারেটের দাম খুব একটা বাড়বে না, অর্থাৎ আগের মতোই সস্তা থেকে যাবে। এ ধরনের সিগারেটের দাম শলাকাপ্রতি বৃদ্ধি পাবে মাত্র ১৩ পয়সা। বিড়ির মূল্য (করসহ) বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ, যা বিড়ির অতি অল্প মূল্যের বিবেচনায় একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।' এখানে মনে হয়েছে একটি খেলা চলেছে, কে বেশি লবিং করতে পারে তামাক কোম্পানি নাকি তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলন? যার লবিং বেশি কার্যকর হবে, তার কথাই সরকার শুনবে। সরকারের কি নিজের দেখার দায়িত্ব নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে কী করতে হবে? তামাক চাষের ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য আগে রফতানি শুল্ক ছিল ১০ শতাংশ, সেটাও এখন উঠে গেছে। তামাক কোম্পানি গোপনে সেটা কমিয়ে ৫ শতাংশ করে দিতে পেরেছে। এবার বাজেটে তার উল্লেখ দেখলাম না। তাহলে তামাক রফতানির ওপর কোনো শুল্ক নেই? বেপরোয়াভাবে চলবে তামাক চাষ? খাদ্যের জমিতে? তবে একটি ভালো দিক হচ্ছে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর বৃদ্ধি করা হয়েছে জর্দা ও গুলের ওপর। এ দুটি তামাক পণ্যের ওপর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্কের হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। এর সঠিক বাস্তবায়ন হলে অনেক নারী তামাক পণ্যের ক্ষতির দিক থেকে নিজেদের সরিয়ে আনতে পারবেন, যদি দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যবহার কমে আসে। তামাকবিরোধী নারী জোট এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবে আশা করা যায়।

কৃষি খাত নিয়ে কেন জানি না কৃষিমন্ত্রী খুশি। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবনজীবিকার জন্য কৃষির সঙ্গে জড়িত। তারা একইসঙ্গে খাদ্যের জোগানদাতা। অর্থমন্ত্রী খুব সহজভাবে বলে দিলেন, 'কৃষি খাত ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত। এটি শিল্প খাতের মতো নয়।' এটা ঠিক যে, কৃষকরা সংগঠিত শিল্প-কারখানার মতো কাজ করেন না, কিন্তু কৃষকরা সরকারের নানা ধরনের নীতির কারণে উপকৃত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাজেটে কৃষকের সরাসরি উপকার হয় এমন কোনো বরাদ্দ নেই। যেমন কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা। যা আছে তা হচ্ছে কৃষি যন্ত্রাংশে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। ঋণের সুদ ১১ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করা হচ্ছে। তেলবীজ ও মশলা উৎপাদনে ঋণের সুদ ৮ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলে দিয়েছেন, 'কৃষি বাজেটে ত্রুটি নেই'। অথচ কৃষি বাজেট দেখলে মনে হবে এটা শিল্প বাজেট। এর সঙ্গে কৃষক লাভবান হবে নাকি কোম্পানি লাভবান, তাই দেখার বিষয়। বাজেটে উল্লেখ রয়েছে, কৃষিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করার জন্য বরাদ্দ থাকবে। এটাই কি কৃষি এবং কৃষকের জন্য জরুরি ছিল? কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির প্রযুক্তি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করার সুযোগ দিয়ে কৃষকের সর্বনাশ ঘটানো হচ্ছে কিনা, এ নিয়ে যখন প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি, এমন সময় কেন এ বরাদ্দ? এটা কি কৃষকবান্ধব হলো? কৃষিমন্ত্রী কি কৃষকের কথা ভাববেন না?

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার প্রতি বছর কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে, এবার হয়েছে ৪.৪ শতাংশ। যদিও টাকার অঙ্কে বেড়েছে। এবার ১১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা, গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ৬৭৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বরাদ্দকে অপর্যাপ্ত বলেছেন। অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব এ বরাদ্দকে 'স্বাস্থ্য খাতের প্রতি অবহেলা' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। স্বাস্থ্য খাতে সত্যিকারের উন্নতি করতে হলে বাজেটের ১০ শতাংশ হওয়ার কথা সেখানে আমরা অর্ধেকও অর্জন করতে পারিনি। এমন নয় যে, সরকারের টাকা নেই। যদি অন্য খাতে দেয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা থাকে তাহলে যেই খাতে বরাদ্দ বাড়ালে দেশের মানুষ সুস্থ থাকবে এবং কাজের সক্ষমতা বাড়বে সেখানে বরাদ্দ না থাকায় সরকারের আইকিউ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। মানুষকে সাধারণ চিকিৎসার জন্য নিজের গাঁইট থেকে খরচ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ গরু-ছাগল বিক্রি বা ঋণের টাকা ব্যবহার করবে চিকিৎসার জন্য, আর বড়লোকেরা যাবে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও ভারতে। এতে দেশের যে ক্ষতি হবে সেটার দিকে সরকারের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা দেশে চিকিৎসা নেন না। রাষ্ট্রপতি নিজেই যান সিঙ্গাপুরে চেকআপের জন্য। তাহলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের চেষ্টা সরকারের থাকবে কেন? শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যসেবা ক্রমশ নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দলীয়করণ করা হয়েছে। সঠিক দল না করলে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। তবে কি সরকার নিজেই চায় যে, চিকিৎসাসেবা মুনাফাভিত্তিক বেসরকারি খাতে চলে যাক? এমন প্রশ্ন আমাদের এখন করতে হচ্ছে!

বাজেটের সবকিছু নিয়ে এ অল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। শুধু বলব, বাজেটের মধ্য দিয়ে সরকার কি আরেকবার প্রমাণ করল যে, নির্বাচন জনগণের অংশগ্রহণে হয়নি?


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।