নিদান-সিদানের গাছ বনাম ইউনাইটেডের ডেড বডি!


অনেক দিন আগে আমরা একটি গবেষণা করেছিলাম, যেখানে দেখতে চেয়েছিলাম বাড়ির বসতভিটায় যে গাছপালা লাগানো হয় তার কী কী কারণ আছে। বিশেষ করে নারী যখন সে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় তখন কী কারণ থাকে। অনেক কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে এসেছিল 'নিদান-সিদানের' গাছ। টাঙ্গাইলের কৈজুরী গ্রাম থেকে এ তথ্য পেয়েছিলাম আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে। এর অর্থ ব্যাখ্যা করে গ্রামের মহিলারা বুঝিয়েছিলেন গরিব মা যদি দেখে তার ছেলেরা তাকে মরে যাওয়ার পর দাফন-কাফন করতে পারবে না, তাহলে এ গাছটি কেটে পাড়া-প্রতিবেশীরা অন্তত তার দাফনের ব্যবস্থা করবে। এ নিদান-সিদানের গাছের কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম। মরে যাওয়ার পর কবর দেয়া সন্তানের কর্তব্য, এমনকি সেটা সমাজেরও কর্তব্য। যে মারা যাবে তাকে এ নিয়ে ভাবতে হয় এ বিষয়টি আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। মরার আগেই সে ব্যাপারে ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন সে অসহায় নারী।

মৃত্যুর পর সুষ্ঠুভাবে দাফন-কাফন হতে পারা, একটি কবর থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। যে মরে সে তো এ ব্যাপারে নিরুপায়; কিন্তু স্বজনরা এ বিষয়ে খুব সতর্ক থাকেন। বাবা-মা, সন্তানের মৃত্যু কষ্ট দেয়; কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হয় যদি মৃতদেহ দেখা না যায়, কবর দেয়া বা সৎকার করা না যায়। বাংলাদেশে এ ভাগ্য সবার জুটবে কিনা সে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। রানা প্লাজা ভবন ধসের পর দিনের পর দিন শ্রমিকের স্বজনরা প্রথমে জীবিত পাওয়ার আশায় ভিড় করেছিলেন, দিন যত পার হয়েছে ততই তারা শুধু লাশের জন্য আকুতি জানিয়েছেন। লাশটি পেলে বাড়ি নিয়ে দাফন করবেন। শোনা যায়, এখনও অনেকেই ছবি নিয়ে এসে রানা ভবনের বিধ্বস্ত জায়গাটিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। কীসের আশায় জানি না, কিন্তু তারা সেখানে আসেন। যতদিন লাশ না পাবে এ আসার তাগিদ থেকেই যাবে। কিছুদিন আগে পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর পদ্মার পাড়ে মানুষের ভিড় ছিল শুধু বেঁচে থাকা যাত্রীর জন্য নয়, একটি লাশের জন্য। তারপর সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিল আর খোঁজা হবে না, তখন স্বজনদের হতাশা অনেকগুণ বেড়ে গেল। তারা জানে তাদের ছেলে, মেয়ে বা স্ত্রী, স্বামী, মা বা বাবা বেঁচে নেই, কিন্তু লাশটা না পাওয়ার কারণে সে দুঃখ শতগুণ বেড়ে গেল। দাফন-কাফন করা গেল না, কবর দেয়া গেল না। লাশগুলো যেখানে ভাটিতে ভেসে উঠেছে, সেখানে স্বজনরা পেয়ে ধন্য হয়েছে, নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেছে। অনেক লাশ এমন জায়গায় উঠেছে যেখানে লাশ চেনার মানুষ ছিল না, তারা অজ্ঞাত লাশ হয়ে গিয়ে দাফন হয়েছে। আর বাকিদের তোলার উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়ে পদ্মা-মেঘনা নদী গণকবরে পরিণত হয়েছে। আশাহত হয়েছে শত শত লাশের স্বজন।

এ তো গেল বিশেষ পরিস্থিতির কথা। দুর্ঘটনার কথা। মানুষের মৃত্যু নানাভাবে হয়; কিন্তু মৃত্যুর পর লাশ পাওয়ার অধিকার স্বজনদের আছে এবং মৃতের অধিকার আছে সুষ্ঠুভাবে এবং সময়মতো দাফন বা সৎকারের। হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনা ও লাশ পাওয়া নিয়ে যে ঘটনা সম্প্রতি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ঘটে গেল তা অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এখানে রোগী মারা যাওয়ার ৩৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাশ দেয়া হয়নি, শুধু বিল পরিশোধ করতে না পারার জন্য। পত্র-পত্রিকার খবরে বিষয়টি এসেছে যেহেতু স্বজনরা লাশ নিতে না পেরে বাধ্য হয়ে গুলশান থানার পুলিশকে জানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা নিশ্চয় এটাই প্রথম নয় এবং শুধু একটি হাসপাতালে হয়েছে তাও নয়। অন্যান্য বড় প্রাইভেট হাসপাতালেও মৃতের স্বজনদের ওপর লাশ নেয়ার আগে বিল পরিশোধের চাপ দিতে দেখা গেছে। যে বিশাল অঙ্কের বিল করা হয় তার কতটুকু যৌক্তিক ছিল তা প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই বিল পরিশোধ করেই স্বজনরা কাঁদতে কাঁদতে লাশ নিয়ে যান সুষ্ঠুভাবে দাফন করার জন্য।

ইউনাইটেড হাসপাতালের ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার কারণে লাশ নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে কী হয় তার একটি নমুনা পাওয়া গেল। মগবাজারের দিলু রোডের বাসিন্দা ও শেয়ার ব্যবসায়ী এমডি আসলামকে ফুসফুসে সমস্যাজনিত কারণে ৩ জুলাই ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন থেকেই তিনি হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে চিকিৎসায় কোনো উন্নতি না হয়ে বরং ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৩টায় তার মৃত্যু হয়। কিন্তু এরপর থেকে ৩৫ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তার মরদেহ স্বজনদের হাতে তুলে দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দফায় দফায় বিভিন্ন পর্যায় থেকে চেষ্টা-তদবির করেও কোনো লাভ হয়নি। মৃতের স্বজনরা হন্যে হয়ে ঘুরেও টাকা জোগাড় করতে পারেনি। ৩১ লাখ টাকার মধ্যে রোগীর স্বজনরা ১২ লাখ টাকার মতো পরিশোধ করতে পেরেছে। বকেয়া রয়েছে ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা, তাই লাশ পাচ্ছে না। লাশ দিয়ে দিলে স্বজনরা বিল পরশোধ করবে না এ আশঙ্কা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তাই লাশ আটকে রাখা হয় হিম ঘরে। কী দুর্ভাগ্য!

প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল এবং একেকটি হাসপাতালে একই রোগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রেটে চিকিৎসা দেয়া হয়। এটা যেন হোটেলের মতো। হোটেলের যেমন 'তারা' অনুযায়ী রুম ভাড়া হয়, ঠিক তেমন নীতি মেনে প্রাইভেট হাসপাতাল রুমের সৌন্দর্য, হাসপাতালের শানশওকত, ডাক্তারের ডিগ্রি, দেশি না বিদেশি ইত্যাদি দেখে টাকা দিতে হবে। এটাই হাসপাতালের ফি। এর মধ্যে রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য কত টাকা খরচ করা হয়েছে আর কত টাকা হাসপাতাল পরিচালনার জন্য খরচ হচ্ছে তার কোনো জবাবদিহি এখানে নেই। এ ঘটনায় ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। তারা বলছেন, 'আমরা কখনোই টাকার জন্য কারও লাশ আটকে রাখিনি। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই একটি ব্যবস্থাপনা থাকবে। তা না হলে হাসপাতাল চলবে কী করে? হাসপাতাল তো বন্ধ করে দিতে হবে।' (কালের কণ্ঠ, ২১ আগস্ট, ২০১৪)। লাশ ৩৫ ঘণ্টা হিম ঘরে অহেতুক রেখে দিয়ে বিল পরিশোধের জন্য চাপ দেয়ার পরও কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন তারা লাশ আটকে রাখেননি, তারা বকেয়া পরিশোধের কথা বলেছেন। বকেয়া বিল ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা পরিশোধ না করলে লাশ দেয়া হয়নি বলেই তো শেষ পর্যন্ত স্বজনদের থানায় যেতে হয়েছে এবং মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার কারণে ইউনাইটেড শর্ত দিয়ে এবং বিল না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়ে লাশ দিয়েছে।

সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা কমিয়ে ১৫ লাখ টাকা ধার্য করেছে। ধন্যবাদ। ছয় কিস্তিতে এ বিল পরিশোধ করা হবে বলে লিখিত দিতে হয়েছে পরিবারকে। তবুও ভালো, শেষ পর্যন্ত লাশটি দাফন করার জন্য পরিবার পেয়েছে এবং মগবাজারে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। মৃতের পরিবারগুলো ধারদেনা করে কোনোভাবে শোধ করে দিয়ে লাশ নিয়ে যায় বলে কেউ জানতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাইভেট হাসপাতালে যে বিশাল অঙ্কের বিল তৈরি হয়, তা কি আসলে যৌক্তিক? হাসপাতাল নিজেদের ইচ্ছায় যে খরচ করছে তার জন্য রোগীকে চাপ দেয়া হবে কেন? বিল বাড়তে বাড়তে ৩৫ লাখ হয়ে যায় এটা কী সোজা কথা? বাংলাদেশে কত পরিবার আছে যে এমন খরচ বহন করতে পারবে? সেটা যে পারছে না তার প্রমাণ মগবাজারের এই আসলাম। এত টাকা খরচ করেও রোগী বাঁচেনি। তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে আশ্বাস দিয়ে এত বড় খরচ রোগীর কাঁধে চাপিয়ে দিলেন, তারপর এক টাকাও কমাতে রাজি না হওয়া, পরে অনেক দেনদরবার করে বকেয়া বিল ১৫ লাখ টাকায় রফা হওয়া কি আদৌ ঠিক? এর মধ্যে হাসপাতাল কতখানি দায়িত্ব নিল রোগীর সেরে না উঠে হিম ঘরে লাশের আটকে থাকার জন্য? হাসপাতাল কি একবারও ব্যাখ্যা করেছে কেন চিকিৎসা সফল হলো না? তার বয়স এত বেশি ছিল না যে, তিনি চিকিৎসার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। পরিবারের কাছে তাকে সুস্থভাবে ফিরে পাওয়ার জন্য টাকা বড় কথা ছিল না, তাই হয়তো তারা রাজি হয়েছে; কিন্তু হাসপাতাল কি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছে? পারেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাদের বিল পরিশোধের ব্যাপারে একটুও ছাড় দিতে রাজি ছিল না। দামি প্রাইভেট হাসপাতালে আসার পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল ভালো ও উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা। সেখানে সুস্থ না হয়ে লাশ হয়ে যাবেন এমন কথা নিশ্চয় ছিল না এবং সবচেয়ে বড় কথা লাশ জিম্মি করে রেখে টাকা আদায়ের এ নীতি চিকিৎসার নৈতিক দিক লঙ্ঘন করে কিনা তা আমাদের দেখতে হবে। আমি দাবি করছি না, যত ভালো চিকিৎসাই দেয়া হোক না কেন, কোনো রোগী মারা যাবে না। বাঁচা-মরার ব্যাপারে এমন দাবি অবশ্যই করা যাবে না। কিন্তু যে চিকিৎসা এত ব্যয়বহুল সেখানে শেষ পর্যন্ত রোগী মারা গেলে এবং চিকিৎসা খরচ সম্পূর্ণ শোধ করার ক্ষমতা না থাকলে হাসপাতাল কি কোনো দায়িত্ব নেবে না? কোনো ধরনের ছাড় দেবে না?

গ্রামের মহিলা তার নিজের মৃতদেহ যেন ঠিকমতো দাফন-কাফন হয় তার জন্য চেষ্টা করতে পারে, নিদান-সিদানের জন্য গাছ লাগাতে পারে। অথচ দামি প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে সুস্থ না হয়ে ডেড বডি হয়ে গেলে স্বজনদের সে ডেড বডি পাওয়ার অধিকার নেই, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সময় হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের এমনই দুর্ভাগ্য যে, জীবিত মানুষের অধিকার যেমন পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে, মরা মানুষ কাফন পরে কবরে যাওয়ার অধিকারটুকুও পাচ্ছে না।

আশা করি, ছয় কিস্তিতে বিল পরিশোধ করার পর ব্যাপারটি চাপা পড়ে যাবে না, প্রাইভেট হাসপাতালে ডেড বডি স্বজনদের দেয়ার বিষয়টিও নিষ্পত্তি করতে হবে।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।