ঘরে বাস করে সেই ঘরের খবর নাই


এবার গৌরপূর্ণিমায় ছেঁউড়িয়ায় সাধুসঙ্গের স্মরণে নবপ্রাণ আখড়াবাড়ীর অনুষ্ঠানের শিরোনাম, 'ঘরে বাস করে সেই ঘরের খবর নাই'। যে ঘরে আমরা বাস করি সেই ঘরের কোন খবর আমাদের নাই।

সবাই নবপ্রাণ আখড়াবাড়ির অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত।

ছেঁউড়িয়ায় নবপ্রাণ আখড়াবাড়িতে ভাবান্দোলন নিয়ে চৈত্রের ৩, ৪ ও ৫ (মার্চের ১৭, ১৮ আর ১৯)  তারিখের সভা শেষ হয়েছে। নদিয়ার ভাবচর্চার ধারার মধ্যে গড়ে ওঠা যে সকল প্রতিজ্ঞা, প্রত্যয় ও ধারণা চিন্তার নতুন দিগন্ত চিহ্নিত ও আবিষ্কার করবার সহায়ক তার কয়েকটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের সবাইকে নবপ্রাণ আখড়াবাড়ির পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাঁদের অংশগ্রহণ এবং প্রশ্ন আলোচনাকে প্রাণবন্ত করেছে। এখন আমরা ছেঁউড়িয়ায় ২২ তারিখে  গৌর পূর্ণিমায় ফকির লালন শাহের প্রবর্তিত সাধুসঙ্গের স্মরণে উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। পাশাপাশি লালন একাডেমি ২৩, ২৪ ও ২৫ ‘লালন স্মরণোৎসব’ হিসাবে পালন করছে। সবাইকে আমন্ত্রণ।

ফাল্গুনি পূর্ণিমার এই উৎসব ‘দোল পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত। কিন্তু ফকির লালন শাহ যে বিশেষ কারণে সাধুসঙ্গের জন্য এই দিনটি বেছে নিয়েছিলান সেটা গোপীগণের সঙ্গে ফাল্গুনি পূর্ণিমায় কৃষ্ণের রঙ খেলার জন্য নয়।দোল উৎসব যাঁদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ তাঁরা তা অবশ্যই পালন করবেন। সবাইকে তাই প্রাণ থেকে দোলের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

ফকির লালন শাহ কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব পালন করবার জন্য ফাল্গুনি পূর্ণিমার এই দিনটি সাধুসঙ্গের জন্য বেছে নেন নি। এই দিকটি মনে না রাখলে নদিয়ায় দিনটির তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ঠিক যে ফকির লালন শাহ নদিয়ায় ভাবচর্চার আনন্দঘন মুহূর্ত হিসাবে এই দিনটিকে বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা রঙ খেলবার জন্য নয়।

এখানে উল্লেখ করে রাখা দরকার লালন দোল, রাসলীলা বা গোপীভজনা নিয়ে কখনই কোন কালাম রচনা করেন নি। তাহলে তিনি কেন দিনটি বেছে নিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা ও জেনে রাখা দরকার। নইলে নদিয়ার ভাবচর্চার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হারিয়ে যায়, এবাং যাচ্ছেও বটে। অন্যদিকে সেই তাৎপর্যকে সামনে না এনে তাকে স্রেফ ‘লালন স্মরণোৎসব হিসাবে পালন করবারও কোন যুক্তি নাই। এতে দিনটির গুরুত্ব আরও অদৃশ্য হয়ে যায়। লালন একাডেমি  সাম্প্রদায়িক বিবেচনা থেকে, দিনটি 'দোলপূর্ণিমা' হলেও একে দোল উৎসব হিসাবে বলে না। অথচ এতে 'দোল উৎসব' বলার ক্ষেত্রে নদিয়ার ফকিরদের কোন আপত্তি নাই। নবপ্রাণ আখড়াবাড়িতে আমরা একে 'দোল উৎসব' বলে থাকি। তবে লালন কেন এই দিনটি বেছে নিয়েছিলেন সেটা সবাই জানুক ফকিররা সেটা চান অবশ্যই। কারণ তার বিশেষ মানে আছে। কারন লালনের প্রবর্তিত এই সাধুসঙ্গ নদিয়ার ফকিরেরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে থাকেন।  এটা তাঁদের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান।

লালন নিজে যে সাধুসঙ্গের প্রবর্তন করেছেন সেই সঙ্গ চালিয়ে যাওয়া নদিয়ার ফকিরদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সেই দিক বিবেচনা করে উৎসবের অংশ হিসাবে দিনটিকে অন্তর্ভুক্ত রেখেও সাধুসঙ্গের দিনটিকেবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে  লালন স্মরণোৎসব থেকে ভিন্ন ভাবে পালনের কথা উঠেছে। আশা করি লালন একাডেমি দিন্টির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।

ফকির লালন শাহ এই দিনটি বেছে নিয়েছিলেন নদিয়ার ‘ফকির’ নিমাই বা শ্রীচৈতন্যকে স্মরণ করবার জন্য। ফাল্গুনি পূর্ণিমার এই তিথিতেই চৈতন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ফকির কথাটা উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখলেও খুব সজ্ঞানেই শব্দটি ব্যবহার করছি। নদিয়ায় যিনি কুলের গৌরব বা জাতের অহংকার ত্যাগ করে নিম্নবর্গের মানুষের কাতারে নেমে এসে উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন তিনি ফকিরই বটে। বর্ণাশ্রম বা জাতপাতের বিরুদ্ধে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের আরম্ভ বা সন্ধিক্ষণ হিসাবে নিমাইয়ের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সে কারণে অসাধারণ। নদিয়ার এই ‘ফকির’ সম্পর্কে লালনের বিখ্যাত একটি গান উল্লেখ করছি।

এমন বয়সে নিমাই
ঘর ছেড়ে ফকিরী নিলে
ধন্য মায়ের নিমাই ছেলে
ধন্য মায়ের নিমাই ছেলে।।

ধন্যরে ভারতী যিনি
সোনার অঙ্গে দেয় কৌপিনী।
শিখাইলে হরিধ্বনি
করেতে করঙ্গ দিলে।।

ধন্য পিতা বলি তারে
ঠাকুর জগন্নাথ মিশ্রে।
যার ঘরে গৌরাঙ্গ হরি
মানুষ রূপে জন্মাইলে।।

ধন্য রে নদীয়াবাসী
হেরিল গৌরাঙ্গশশী।
যে বলে জীব সেই সন্ন্যাসী
লালন কয় সে প’লো  ফে'রে।।

খুবই কম বয়সে যে জননীর সন্তান ‘ফকিরী’ নিলো লালন সেই শচিমাতার জয়গান গাইছেন। গাইছেন ভারতী গোঁসাইয়ের যিনি নিমাইকে ‘কৌপীন’ দিয়ে ঘরছাড়া ফকির করেছেন; তার হাতে করঙ্গ তুলে দিয়েছেন। লালন জয়গান গাইছেন পিতা জগন্নাথ মিশ্রের যেখানে কৃষ্ণ মানুষের রূপ নিয়ে নদিয়ায় আবির্ভূত হয়েছেন। সর্বোপরী জয়গান গাইছেন নদিয়াবাসীর। একমাত্র নদিয়াতেই এই অভূতপূর্ব ফকির ও ফকিরীর আবির্ভাব ভাবগত ও ঐতিহাসিক উভয় ভাবেই সম্ভব হয়েছে।

পুরানের কৃষ্ণ একমাত্র নদিয়াতেই জগন্নাথ মিশ্রের ঔরসে আর শচিমাতার গর্ভে ‘নিমাই’ নাম নিয়ে মানুষের রূপ নিয়ে আবির্ভূত হতে পেরেছে। গৌরাঙ্গ হিসাবে কৃষ্ণ এখন আর শুধু পুরাণের চরিত্র মাত্র নন, বরং ইতিহাসের কর্তা, নিমাই।  যিনি গৌরবর্ণ ছিলেন বলে নদিয়াবাসী নাম দিয়েছিলো ‘গৌরাঙ্গ’ বা ‘গোরা’ আর ভারতী গোঁসাই যার নাম রেখেছিলেন ‘কৃষ্ণচৈতন্য’ (সংক্ষেপে চৈতন্য) – তিনি একই সঙ্গে পুরান এবং ইতিহাস। 

গৌরাঙ্গ বা গৌরের জন্মতিথি – অর্থাৎ ফাল্গুণি পূর্ণিমা  নদিয়ায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে পুরান আর পুরানের গল্প না থেকে ইতিহাসের অন্তর্গত হয়েছে। যা বঙ্গে জাতপাত বিরোধী ও নারীপুরিষ ভেদ বিরোধী লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।  নদিয়ার ফাল্গুনি পূর্ণিমা তাই শুধু দোল হয়ে থাকে নি। সেটা হয়ে উঠেছে গৌর পূর্ণিমা। কারণ পূর্ণিমার চাঁদ এই তিথিতে গৌর হয়ে মর্ত্যে অবতরণ করেছে। নদিয়ার এই ফকিরের জন্মতিথি সে কারণে  মহোৎসব বটে। পুরান ও ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণকে অমর করে রাখবার জন্যই  লালন দুনিয়ার সকল সাধকদের নিয়ে এই দিনটিতে সাধুসঙ্গের প্রবর্তন করেছেন।

বৈষ্ণবদের কাছেও ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমা খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন। পুরানের গল্প অনুযায়ী এই দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে শ্রীমতি রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। এই কাহিনী থেকেই দোলে আবীর বা রঙ খেলবার উৎসবের উৎপত্তি হয়। দোল উৎসব হয় বলেই ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আর, ফাল্গুনি পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীগৌরাঙ্গের জন্ম হয়েছিল বলে নদিয়ার ফকিরদের কাছে তা গৌরপূর্ণিমা। একটি পুরানের কাহিনী অবলম্বনে, আর অপরটি একজন ঐতিহাসিক ব্যাক্তির আবির্ভাব উপলক্ষে। যার আবির্ভাবের তাৎপর্য পুরানের কাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিন্তু যিনি পুরানের চরিত্র নন, মর্ত্যে ইতিহাসের নায়ক।

তাহলে পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রীচৈতন্যের জন্ম হয়েছে বলে নদিয়ায় তা 'গৌরপূর্ণিমা' নামে পরিচিত। গোপীলীলার রঙ উৎসব নাকি ঐতিহাসিক শ্রী গৌরাঙ্গের জন্ম – কোন সত্যটির ওপর আপনি জোর দেবেন তা দিয়ে আপনি নদিয়ার ভাবের পরিমণ্ডলে কতোটা বাস করেন তা বোঝা যায়। শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূর সূত্রে বৃন্দাবন ও নদিয়ার সঙ্গে মৈত্রী তো আছেই। কিন্তু নদিয়া বৃন্দাবন নয়। নদিয়ার কাছে কৃষ্ণ বহু গোপীর সঙ্গে লীলা করেছেন পুরানের এই দিকটি গৌণ ও অবান্তর, কারণ নদিয়া যুগলের সাধক, বহুগামিতার বিরোধী। প্রকৃতি পুরুষের পারস্পরিক আস্বাদন ও ঐক্যই তার সাধনার প্রধান দিক। এই দিকটি মনে রাখলে ‘নদিয়ার ভাব’ কথাটার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হবে।

শ্রীকৃষ্ণ ঐতিহাসিক চরিত্র নন, পুরাণের চরিত্র। প্রেম সম্পর্কে বাংলার ভাবনা, কল্পনা, চিন্তা, সংকল্প ইত্যাদির কেন্দ্রীয় চরিত্র রাধা ও কৃষ্ণ। কিন্তু নদিয়ার অভিমান হোল শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার সঙ্গে প্রেম করেছিলেন পুরুষের মতো, ফলে রাধা তাঁকে কিভাবে ভালবেসেছিল তা তিনি আস্বাদন করেন নি।ফলে ভগবান হিসাবে কৃষ্ণও পুরানে অপূর্ণ থেকে গিয়েছেন।  নারী কিভাবে ভালবাসে সে সম্পর্কে তাঁর কোন অভিজ্ঞতা তাঁর নাই। তাই তাঁকে মানুষের শরীর নিয়ে শ্রীগৌরাঙ্গ হয়ে আবা্র ইহজগতে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। পরম নিজে প্রকৃতি হয়ে নিজেকে নিজে আস্বাদন করবার ইচ্ছায় পুরানের গল্প না থেকে জাগতিক ও ঐতিহাসিক ‘বর্তমান’ হয়ে হাজির হয়েছিলেন।

তদুপরি এই সত্যও নদিয়া কায়েম করতে চায় যে কলিযুগে মানুষই অবতার। মানুষের বাইরের পুরানের কোন অবতার নদিয়া মান্য করে না। পরম বলি কি পরমেশ্বর -- মানুষের মধ্য দিয়েই তিনি বর্তমান হয়ে ওঠেন।

‘নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে
দিব্যজ্ঞানী হয় তবে জানতে পায়
কলিযুগে হলেন মানুষ অবতার।

মানুষগুরু নিষ্ঠা যার, ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।।

পুরানের ব্যাখ্যায় নদিয়া এখানে আলাদা ও স্বতন্ত্র। এই দিকগুলো ভালোভাবে না জানলে দোল বা গৌর পূর্ণিমায় নদিয়ার সাধুসঙ্গের তাৎপর্য কিছুই বোঝা যাবে না। লালনের গানও ভালভাবে বোঝা কঠিন হবে।

নদিয়ার কাছে ‘অনুমান’ নয় ‘বর্তমান’ই আরাধ্য। বর্তমান থাকা ও বর্তমান হয়ে ওঠা – এটাই নদিয়ার সাধনার গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষের কর্তারূপের মধ্য দিয়েই মানুষ ‘বর্তমান’ হয়। জীব হিসাবে তার যে রূপ সেটা জীবের রূপ মাত্র।অন্যান্য জন্তুজানোয়ার বা জীবকুলের সঙ্গে জান্তব মানুষের বিশেষ কোন ফারাক নাই। মানুষ সমাজে ও ইতিহাসে কী করে, বা কী কাজের ফল সমাজকে দেয় ও ভবিষ্যতের জন্য রেখে যায় – তার দ্বারাই ‘মানুষ’টিকে আমরা চিনি। তাই 'কর্তারূপ'-এর অন্বেষণই মানুষের আরাধ্য। বর্তমানের কর্তব্য নির্ধারণই মানুষের কাজ।

নদিয়ার ভাবের প্রাচুর্য ওখানে যে গৌর হয়ে যিনি বঙ্গে লীলা করে গিয়েছেন তিনি একই সঙ্গে পুরান ও ইতিহাস। পুরানের চরিত্রই ইতিহাসের চরিত্র হয়ে উঠেছে। চৈতন্য কোন বইপত্র তত্ত্বকথা প্রচার করেন নি।তাঁর ভাবচর্চার মধ্যে মূর্ছা যাওয়া নিয়ে তর্ক করা যায়, কিন্তু ভাব ও শরীরের মধ্যে তিনি কোন ফারাক রাখতে চান নি।বাংলার এই এক অসাধারণ ভাবগত ঐশ্বর্য যার তুলনা মেলা ভার।

পুরান ও ইতিহাসের এই স্মমিলনের সাহস সম্ভবত আর কোন সংস্কৃতিতে দেখা যায় না। গৌরাঙ্গ বহিরঙ্গে রাধা অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ হয়ে লীলা করে গিয়েছিলেন। গৌরপূর্ণিমার দিনটি সেই ভাবের স্মরণে।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।