বাজেট ২০১৬-২০১৭: অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা এবং চাহিদা পূরণের জন্যে অর্থ বরাদ্দের দাবী


বাজেট ২০১৬-২০১৭-এ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ যাই হোক না কেন মানুষের স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তা এবং সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার করাই মূল লক্ষ্য। ২৭ এপ্রিল, ২০১৬ বিকেল ৩:০০টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভি আই পি লাউঞ্জে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনে স্বাস্থ্য আন্দোলন, উবিনীগ ও তাবিনাজ।

সভায় বক্তব্য রাখেন - ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, ট্রাস্টি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব, স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটি। ফয়জুল হাকিম, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ। ডা. লেলিন চৌধুরী, প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। চঞ্চনা চাকমা, হিল উইমেন ফেডারেশন। ডা. মো: ফারুক আহম্মেদ ভুঁইয়া, লাইন ডাইরেক্টর, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (প্রোগ্রাম), ডাইরেক্টর জেনারেল অব হেলথ্ সার্ভিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সাইদা আখতার কুমকুম, তাবিনাজ, ডা. সুব্রত কুমার সাহা, উপ-পরিচালক, DGHS, ইবনুল সাইদ রানা, নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও স্বাস্থ্য আন্দোলন, ডা. অধ্যাপক মোজাহেরুল ইসলাম, পাবলিক হেলথ্ ফাউন্ডেশান, ডা. প্রদীব কুমার সাহা, সরকারী পরিচালক, ডাইরেক্টর জেনারেল অব হেলথ্ সার্ভিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সীমা দাস সীমু,পরিচালক, উবিনীগ, পলাশ বড়াল, সদস্য স্বাস্থ্য আন্দোলন। মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক বক্তব্য পাঠ ও সঞ্চালনা করেন ফরিদা আখতার, যুগ্ম আহ্বায়ক, স্বাস্থ্য আন্দোলন।

স্বাস্থ্য সেবা শুধুমাত্র হাসপাতাল, ডাক্তার-নার্স, ওষুধ ও চিকিৎসা নয়। স্বাস্থ্য সেবার সাথে যুক্ত হয়েছে পুষ্টিহীনতা, খাদ্য বাহিত রোগ, জীবন যাপনের ধরণ, নগরায়ন, পরিবেশ, সড়ক দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া, রাজনৈতিক হানাহানি, কারখানায় আগুন, ট্রমাজনিত রোগ, অটিজম ও প্রতিবন্ধীতা ইত্যাদিসহ অনেক রোগ যা একজন সুস্থ মানুষকে পরক্ষণে অসুস্থ করে ফেলতে পারে। এর সাথে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা জড়িয়ে আছে।

এ বছর শেষ হচ্ছে দাতা গোষ্টির সাথে করা স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসুচি (২০১১-২০১৬)। এই কর্মসুচিতে দাতা গোষ্টি বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ করলেও তাদের বিবেচনায় ভৌগলিক অবস্থানের কারণে, জাতি ও পেশাগত ও সামাজিকভাবে পশ্চাদপদ অংশ, শ্রমজীবী মানুষ, প্রতিবন্ধীএবং বয়ষ্ক মানুষ যাদের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন তারাই বাদ পড়ে যাচ্ছে। একই সাথে এ বছর থেকে শুরু হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বছর, যার বেশ কিছু বিষয় স্বাস্থ্য বাজেটে গুরুত্বের সাথে প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। বিষয়গুলো শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, এর সাথে যুক্ত আছে অন্যান্য অনেক মন্ত্রণালয়। তাদের বাজেটে স্বাস্থ্যের প্রতিফলন কোথায়? যেমন জলবায়ু পরিবর্তন জনিত রোগের মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন; জিকা ভাইরাসের কোন ঝুঁকি বাংলাদেশে নেই এই কথা বলাই যথেষ্ট নয়। মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্যে অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে বাড়তি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উঠে আসছে। নগরের সমস্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে, শব্দ দুষণ, বায়ু দুষণ রোধের জন্যে কোন মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেবে?


২৭ এপ্রিল ২০১৬ স্বাস্থ্য আন্দোলনের মতবিনিময় সভা

২৭ এপ্রিল ২০১৬ স্বাস্থ্য আন্দোলনের মতবিনিময় সভা


উবিনীগ ও স্বাস্থ্য আন্দোলন সম্প্রতি কিছু চর এলাকায় মানুষের সাথে মত বিনিময় করে দেখেছে স্বাস্থ্য বাজেটের ব্যাপারে কারো কোন ধারণা নেই। তাদের কাছে স্বাস্থ্য সেবাই পৌঁছায় না। তারা বলেন, চরের গরিব মানুষদের কোন পাত্তা নেই হাসপাতালে। তাদের সামান্য চিকিৎসার জন্যে যাতায়াতে খরচ হয় দুই থেকে তিন গুণ। বড় রোগ হলেও ঘরে বসে থাকতে হয়। গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসারও কোন ব্যবস্থা নেই। সেখানে দাই মায়েরা সেবা দিচ্ছেন কিন্তু তারাও কোন সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

শ্রমিকদের কাজের ধরণ এমন যে তারা কাজের সময়ের আগে কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে সেবা নেবেন তার উপায় নেই, তাই বাধ্য হয়ে নিকটস্থ ফার্মেসী থেকে ওষুধ কিনে খেতে হয়, এতে রোগ সনাক্ত হয় না। আপাতত ব্যথা বা উপসর্গ দমন হয় মাত্র আর ভেতরে রোগ বাড়তে থাকে।

স্বাস্থ্য সেবায় বৈষম্য খুব প্রকটভাবে দেখা যায়। যেমন খুলনায় শুকর পালেন বা যাদের কাওরা বলা হয় তারা এই পরিচয় দিয়ে কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলে সেবা পান না। তেমন পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ও অচ্ছুৎ হিসেবে আচরণ করা হয়। প্রতিবন্ধীতার শিকার মানুষের জন্যে স্বাস্থ্য সেবা অন্য সবার মতোই। অন্ধ, বধির, হাত-পা অবশ হওয়া, মানসিক প্রতিবন্ধীতার চিকিৎসা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে পাওয়া যায় না, ফলে তাদের ছুটতে হয় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। এতে তাদের ভোগান্তি ও খরচ বাড়ে।

ফয়জুল হাকিম স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ দেয়াহচ্ছে এখানে প্রতিরক্ষা খাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শ্রমিকের জন্য কোন বরাদ্দ নাই। শ্রমিক যে বেতন পায় তা দিয়ে তার স্বাস্থ্য সেবা নেয়া সম্ভব না। তাদের পুষ্টির কি অবস্থা, তারা কোথায় থাকে তা দেখা হচ্ছে না ।

অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব, হত দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চরের মানুষের জন্য কিছু করতে পারবে না কারণ রাজনীতি হচ্ছে মূল কারণ। চিকিৎখাতে উন্নতি হয়েছে এটা ঠিক কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট না।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জনগণকে সাথে নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। জনগনের প্রতি ডাক্তারদের দরদ থাকতে হবে। ডায়াবেটিস কত খরচ হবে যত হাসপাতাল হবে তত রোগী বেশী হবে। কারণ ডায়াগনষ্টিক ব্যবসা ভাল হবে। ১০০০ টাকায় ডায়ালাইসিস করা যায় কিনা তার ব্যবস্থা করেতে হবে। খাবারে পরিবর্তন আনতে হবে তা হলে অসক্রামক রোগ কম হবে।

স্বাস্থ্য আন্দোলন এবার বিশেষ এলাকার অবহেলিত মানুষের দাবীগুলো তুলে ধরছে:

১. চর, পাহাড়ী এবং অন্যান্য দূর্গম এলাকায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নার্স যাতে তাদের কর্ম এলাকায় বসবাস করে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজ করার জন্য ডাক্তারদের যে সংগঠন আছে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনকে নজর রাখতে হবে।

২. উপজেলা এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী এবং নার্সদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিক যথাযথ নিয়মে খোলা রাখাতে হবে।

৩. সরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অপর্যাপ্ত ওষুধের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের পূর্ণমাত্রায় ওষুধ প্রদান করতে পারে না। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে প্যাথলজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি থাকতে হবে।

৪. চর এলাকার গর্ভবতী মা ও ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. চর এলাকার গুরুতর অসুস্থদের দ্রুত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁচ্ছানোর জন্য সরকারীভাবে দ্রুতগামী নৌযানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. চরাঞ্চলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষা প্রদানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৭. চরে উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন গর্ভবতী নারীদের জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ থাকতে হবে।

শ্রমিকদের বিশেষ দাবী

১. সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গার্মেন্ট শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সকাল ও সন্ধ্যায় অফিস সময়ের আগে একটি বিশেষ বিভাগ খোলা থাকতে হবে।

২. গার্মেন্ট শ্রমিকদের চিকিৎসা ভাতা দিতে হবে।

৩. গার্মেন্ট শিল্প এলাকায় অবস্থিত সরকারী চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ওষুধসহ সকল ধরণের রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। গার্মেন্ট কারখানায় কোন দূর্ঘটনার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যতদিন তারা সুস্থ না হয় ততোদিন বিনা পয়সায় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

কোন দেশ উন্নত হয়েছে কি না তার মানদন্ড হচ্ছে সকল শ্রেণীর মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা। বাংলাদেশের ধনীদের জন্যে বড় বড় হাসপাতাল থাকলেও তারা বিদেশ যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্যে। বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে কি না তার প্রমাণ দিতে হলে ডিজিটাল ও প্রযুক্তি নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নয়, উন্নত জনবল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত হলেই বলা যাবে এ দেশ সুখী দেশ। কারণ স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।