নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে শিক্ষকদের ভূমিকা


টাঙ্গাইল জেলার রিদয়পুর বিদ্যাঘরে উবিনীগ ও দেলদুয়ার উপজেলা পরিষদ আয়োজিত নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে শিক্ষকদের ভূমিকা শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেলদুয়ার উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ সহকারী ৩জন উপজেলা শিক্ষা অফিসার, দেলদুয়ার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ এস এম ফেরদৌস আহমেদ, নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষক অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরহাদ মজহার, ড. রোকেয়া খানম,ন্যাশনাল এ্যাডভাইজার, এফএও নিরাপদ খাদ্য প্রকল্প, ড. এম এ সোবহান, সভাপতি, বীজবিস্তার ফাউনডেশান, উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম জনি। এছাড়াও উবিনীগ টাঙ্গাইল কেন্দ্রের সমন্বক রবিউল ইসলাম চুন্নু, উবিনীগের কর্মী ফাহিমা খাতুন লিজা, আজমিরা খাতুনসহ মোট ৬৮জন উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে নারী ২০জন এবং পুরুষ ৪৮জন।

স্বাগত বক্তব্যে রবিউল ইসলাম চুন্নু বলেন, নিরাপদ খাদ্য আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আজকে এখানে আপনারা যারা উপস্থিত হয়েছেন বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের এই বিষয়ে অনেক কিছু শিক্ষা দিতে পারেন। আপনারাই মানুষ গড়ার কারিগর। শিশুদেরকে আপনারা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারেন।

এরপর নয়াকৃষির কৃষকরা তাদের গান পরিবেশন করেন। গানের কথা

ও আমার শিক্ষক ভাই বোনরে
ও আমার প্রানের ভাই বোনরে
ওরে মানুষ গড়ার কারিগর তোমরা দেশ-দশের কাছে ॥

এরপর জাহাঙ্গীর আলম জনি বলেন, উপজেলা দেলদুয়ার শিক্ষা অফিসার আগের সভায় নিরাপদ খাদ্যের ধারনা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে দেওয়ার কথা বলেন। তার প্রস্তাবণার প্রেক্ষিতে আজকের এই সভা। এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আজকের এই সভা আমাদের জন্য শিক্ষার উৎস হতে পারে। নিরাপদ খাদ্য আমার নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে পারি। প্রধান শিক্ষকদের সহকারী শিক্ষকদের শিশুদের, সরকারী-বেসরকারী স্কুল-মাদ্রাসা, কিন্ডার-গার্ডেন সবাইকে জানাতে হবে।

এরপর ড. এম এ সোবহান বলেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে নিরাপদ খাদ্য উপজেলা ঘোষনার মাধ্যমে আপনাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। এটা টাঙ্গাইল বা বাংলাদেশের বিষয় নয় সারা পৃথিবীর বিষয়। আমরা এখন নিজেরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে খাদ্য বিদেশে রপ্তানী করছি। এখন আমাদের খাদ্য নিরাপদ করার ভাবনা শুরু হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে যে পেষ্টিসাইড আগাছানাশক ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে ফসল এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। পোকা পরাগায়নের কাজ করে। শত্রু পোকা মারতে গিয়ে বন্ধু পোকা মেরে ফেলা হচ্ছে। ফলে তরমুজের ফুল হয়, ফল হয় না। আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে।

ড. রোকেয়া খানম বলেন, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর আপনারা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সরকার খাদ্যের নিরাপত্তার কথা বলেছেন। এখন নিরাপত্তার সাথে নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্যের কথা বলা হচ্ছে এবং জাতীয় পর্যায়ে কাজ করছে। সরকার ৩টি বিভাগ নিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থ্য সেবা, পরিবার পরিকল্পনা, জাতীয় পুষ্টি সেবা। উদ্দেশ্য হলো সুস্থতা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মৃত্যুর হার কমে আসবে। খাদ্যে বিষ ঢুকে গেছে। আম দেশী ফল, মাছ আমিষ খেতে ভয় পাচ্ছি সুতরাং খাবার ভেজাল হয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার বাসন, খাবার ঢেকে রাখা, খাবার ভাল করে সিদ্ধ করে রান্না, খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবেশনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভাবে খাবার অনিরাপদ হতে পারে। দুষিত হতে পারে। শিশু মৃত্যু হতে পারে। মানুষ যত বেশি মুনাফার দিকে যাচ্ছে তত খাবার অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আপনারা এখানে আজ নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে ভূমিকা তুলে ধরবেন। আশা করি আপনারা এগিয়ে আসলে আপনারা যে ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।


ফরহাদ মাজহার


ফরহাদ মজহার বলেন, এই উপজেলা আর্ন্তজাতিকভাবে নজরে পড়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান সরকারের সাথে কাজ করছে। আমরা গ্রামে নয়াকৃষি কৃষকদের সাথে কাজ করছি। আমরা সবাই মিলে কাজ করব। আপনারা এখানে অনেক গাছপালা দেখেছেন। এগুলি পরিকল্পনা করে লাগানো। গাছের সাথে অন্য গাছের, লতার, মানুষের সম্পর্ক। শক্তির উৎপাদন প্রকৃতির মধ্যে ঘটে। আগে আমাদের দেশে ১৫ হাজার জাতের ধান ছিল। আধুনিকতার নামে সেগুলি ধ্বংস করা হচ্ছে। আমার কাছে ২৫০০ জাতের ধান আছে। ধানের নাম সরসরি, পাকড়ি ধানের মধ্যে জ্ঞান চর্চা। কিন্তু এখান আর জ্ঞান চর্চা হয় না। কৃষি মানে নয়াকৃষি। আমরা অনেক আগে শুরু করেছি। এখন পানি বীজ নিয়ে বাণিজ্য করা হচ্ছে। সার-বিষের কারনে পানিতে আর্সেনিক ধরা পড়েছে। পানি অনিরাপদ হয়ে গেছে। বিষ দিয়ে ঘাস মেরে ফেলেছেন। খারাপ আইসক্রীম, পটেটো না খাওয়া বাচ্চাদের শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নয়াকৃষি আপনাকে করতেই হবে। জৈব সার দিয়ে ফসল ফলাতে হবে।

এরপর শিক্ষকদের দলীয় আলোচনায় নিচের বিষয়গুলি তুলে ধরেন

  • উঠান বৈঠকে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে জ্ঞানদান

  • গ্রামে সভা ও মজলিশে আলোচনা করা

  • সহপাঠক্রমিক কার্যাবলীতে আলোচনা

  • সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গঠন

  • জাঙ্ক ফুড/খোলা বাসি খাবার বর্জন

  • বিজ্ঞান ক্লাসে আলোচনা ও শিখনফল অর্জন নিশ্চিত

  • ওয়াশরুমে সাবান সরবরাহ নিশ্চিত করা

  • বিতর্ক, কুইজসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতায় এই বিষয় অন্তভূর্ক্তিকরণ

  • বিভিন্ন ফল-মূল, শাক-সবজীসহ সকল খাদ্য সঠিকভাবে ধুয়ে সঠিকভাবে প্রস্তুত করে পরিবেশন

  • কৃষকদের চাষাবোদে সচেতন করা

  • নিরাপদ পানির ব্যবহার

  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা

  • প্রতি বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সাবার দিয়ে হাত ধোয়া

  • বিদ্যালয়ে জৈব সার তৈরী ও ব্যবহার অনুশীলন

  • গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা

  • বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলোচনার মাধ্যমে

  • শিক্ষকগণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বন্টন

  • ক্ষুদে ডাক্তারদের দায়িত্ব অর্পন ও ষ্টুডেন্ট কাউন্সেলিং

  • নয়াকৃষককে সম্পৃক্ত করা

  • পারিবারিক অভ্যাস গঠন

  • আত্নীয়দের সচেতন করা

  • ধর্মীয় উপাসনালয়ে আলোচনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণ

  • মেলা করা

  • শিক্ষার্থীদের নিয়ে র্যা লী, শ্লোগান, ফেস্টুন দ্বারা সচেতন করা


শিক্ষক

 

অংশগ্রহণকারী

অংশগ্রহণকারী


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।