তামাক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক সভা


বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ‘ফেইম ওয়ার্ক কনভেনশান অন টোবাকো কন্ট্রোল’-এর সদস্যভূক্ত দেশগুলোর সাত নম্বর সভা হচ্ছে দিল্লীতে। উবিনীগের পক্ষ থেকে ফরিদা আখতার সেখানে এবার অংশগ্রহণ করছেন।

এফটিসিটি তামাক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক কনভেনশান করেছে। যার অধীনে বিভিন্ন দেশে আইন ও নীতি প্রণীত হয়েছে। কিন্তু তামাক নিয়ন্ত্রনের আইন ও নীতির বাস্তবায়ন সন্তোষজনক হচ্ছে না এবারকার সভায় বাস্তবায়নের দিকটা অগ্রাধিকার পাবে। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে সব সমস্যা হচ্ছে সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখা হবে।

উবিনীগ নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষকদের সঙ্গে তামাক চাষের ক্ষেতগুলোকে কিভাবে খাদ্য উৎপাদনের জমিতে আবার ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে লড়ছে দীর্ঘদিন ধরে। কিভাবে সফল ভাবে সে্টা সম্ভব সেটা বাস্তবে করিয়েও দেখিয়েছে। ফলে নয়াকৃষি কিভাবে তামাক চাষ বাদ দিয়ে কৃষকদের আবার ফসল উৎপাদনে আকৃষ্ট করেছে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উৎসাহ অনেক বেড়েছে। কথা বলা সহজ কিন্তু বাস্তবে করে দেখানো কঠিন কাজ। তামাক কোম্পানিগুলো, বলা বাহুল্য, এই সাফল্যের কথা প্রচারিত হোক চায় না। তবে এই কাজের সাফল্যের একটা দিক হচ্ছে তামাক নিয়ন্ত্রণের ফ্রেইম ওয়ার্ক কনভেনশানের ১৭ ও ১৮ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা উবিনীগ ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজের কারনে এখন অনেক সহজ হয়েছে।

সতেরো অনুচ্ছেদ তামাকের বিকল্প হিসাবে অন্যান্য ফসল চাষের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় আছে স্বীকার করে। অর্থাৎ যেখানে অর্থনৈতিক বিকল্প রয়েছে সেখানে রাষ্ট্র সহায়তা দিতে এফসিটিসির চুক্তি অনুযায়ীও প্রতিশ্রুতি বদ্ধ। নয়াকৃষি কৃষকরা দেখিয়েছে তামাক চাষ না করেও কৃষকরা খাদ্য উৎপাদন করে অধিক কিম্বা নিদেন পক্ষে সমান আয় করতে পারেন। যেখানে বিকল্প রয়েছে, তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ফ্রেইম ওয়ার্ক কনভেনশান অনুযায়ী সেখানে তামাক চাষের কোন যুক্তি নাই। যদি করা হয় তবে সেটা হবে আন্তর্জাতিক চুক্তির বরখেলাফ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও কাজ হবে এই ক্ষেত্রে কৃষকদের সহায়তা করা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফরিদা আখতার এই কথাটাই জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করবেন। আর্টিকেল ১৭ অনুযায়ী যারা তামাক চাষ করে বা তামাক উৎপাদন করে তাদেরকে অলটারনেটিভ এমপ্লয়মেন্ট বা বিকল্প কাজের সুযোগ করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তার জন্য এফটিসিটিতেই সরকারগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। সরকারগুলো সেটার প্রেক্ষিতেই আইন করুক বা পলিসি করুক। এই দায় তাদের পালন করতে হবে। এটা না করলে সরকার এফটিসিটির বিরোধী হয়ে যাবে।

অনুচ্ছেদ ১৮ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত। তামাক চাষ যেভাবে কনভেনশানের ভাষায় চাষীদের ‘সিরিয়াস রিস্ক’-এর দিকে ঠেলে দেয় সেটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তামাক কৃষকদের জন্য যে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে তার বিরুদ্ধে এখন মানবাধিকার কর্মীরাও সোচ্চার। বৃটিশ আমেরিকান টোবাকো কম্পানিসহ দেশি বিদেশী তামাক কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে কৃষকদের শরীর ও স্বাস্থ্য কিভাবে ধ্বংস করছে তা এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসই বলতে হবে। একই সঙ্গে ঘটায় পরিবেশ ও প্রকৃতির বিনাশ। এই বিষয়গুলো নিয়ে উবিনীগের সঙ্গে কৃষকরা দীর্ঘদিন ঘরে গবেষণা করছেন। সেই গবেষণার কিছু ফল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। নীতি নির্ধারকরা গবেষণা লব্ধ প্রমাণ পেয়ে এখন আগের চেয়ে তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে আরও অনেক নিশ্চিত হয়েছেন। আর্টিকেল ১৮ অনুযায়ী তামাক উৎপাদন বা চাষ যেহেতু পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে অতএব কিভাবে তা বন্ধ করা যায় তার নীতি ও উপায় এখন সরকারকে বের করতে হবে।


cover

পরিবেশ, প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যের ওপর উবিনীগের গবেষণা সহজ ভাবে তুলে ধরার জন্য শুধু ছবি দিয়ে প্রকাশ করা এই বইটি খুবই কাজের। এর দাম ২৫০/= টাকা। তবে রাজনৈতিক ও সমাজ কর্মীদের জন্য ১৭০/= টাকা। বইটি পেতে হলে ০১৭৩০০৫৭০০ ৯ এই নাম্বারে টাকা পাঠান এবং আপনার ঠিকানা দয়া করে এসএমএস করুন। আমরা পাঠিয়ে দেবো।


এফটিসিটি কনভেনশানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ৭ নম্বর সভা তাহলে অনুচ্ছেদ ১৭ ও ১৮ র দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন ছিল যে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অতএব সেটা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আর্টিকেল ১৮ বলছে যে, তামাক চাষও যদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় মানে তাহলে সেটাও তামাক চাষ বন্ধ করার কারন বটে। যাঁরা স্বস্থ্য  নিয়ে এবং প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন তাদের জন্য এই দুইটি অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় যে বিষয়টি এবার সামনে আসবে মনে করা হচ্ছে সেটা হোল অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা। যেমন ধরা যাক বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত স্পন্সর বাইরে থেকে এটা বাহাবা পাবার মতো কাজ। কিন্তু পেছনে দেখা যায় স্পন্সর করছে তামাক কম্পানি। এটা শিল্পের জন্য দরদ নয়, বরং তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা প্রমোশানের কাজ মাত্র। এই ধরনের কাজে টাকা পয়সা তারাই জোগাড় করে। তামাক কম্পানির এই ঘড়াপথে তামাকের প্রচার বা প্রমোশান আসলে অবৈধ কাজ, কিন্তু কিভাবে এদের এই প্রকার অবৈধ বাণিজ্যিক তৎপরতা বন্ধ করা যায় সেইসব নিয়ে এবার আলোচনা হবে। বিষয়টা সামনে এসে গিয়েছে। নীতি নির্ধারকরা একে কতোটা আমলে নেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

২০০৫ সালে যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন হলো, বাংলাদেশে প্রথম এফটিসিটি আইন হয়েছে ২০০৩ সালে এবং ২০০৫ সালের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে আইন করা হয়েছে। এটা বিএনপির আমলে। ড. মোশারফ হোসেন তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রী। তিনি এফটিসিটি’র সময়ে চেয়ার করে ছিলেন। সে সময় তাৎক্ষণিক আইনটা করা হয়েছিল। তাৎক্ষণিক করার ফলে কিছুটা দূর্বলতা ছিল। কিন্তু করতে পারাটা ভাল উদ্যোগ

আর্টিকেল বা অনুচ্ছেদ ১২তে আছে বিকল্প ফসলের জন্য সহজ সর্তে ঋণ দিতে হবে। কৃষকদের সহায়তা দিতে হবে। এই অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের কথা মাথায় রেখে উবিনীগ তামাক চাষের বিকল্প সন্ধানের গবেষণা শুরু করে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিকল্প চাই, কিন্তু তাকে কিভাবে সফল করা যায়?

বাংলাদেশের আইনের যে দূর্বলতাগুলো আছে তার মধ্যে একটা হোল ধূমপানের বাইরে বিভিন্ন তামাকজাত পণ্যের প্রতি নজর কম থাকা। ২০১৩ সালে এসে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যে জর্দা, গুল, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য ব্যবাহার বন্ধ করারা প্রতি যথেষ্ট নজর দেওয়া হয় নি। তামাক পণ্য হিসাবে শুধু সিগারেট, বিড়িকে বুঝায় না। জর্দা, গুল, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যও বটে। এই কাজটা উবিনীগের সহায়তায় বিশেষভাবে করতে শুরু করে তামাক বেরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) ।

বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে আইনের সংজ্ঞায় সরাসরি তিনটা জিনিষ যুক্ত করা গেছে: ১. জর্দা ২. গুল ও ৩. সাদাপাতা। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যাপক ব্যবহার হয়। এটা তাবিনাজের কাজের বিশেষ অবদান।

বাংলাদেশে একটি নতুন তামাক আইন সংশোধনের খসড়া তৈরি হয়েছে। তামাক নিয়ে যারা কাজ করছেন এর পেছনে তাঁদের যেমন অবদান আহে, তেমনি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক মহলেও আন্তরিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা রয়েছেন। আশা করা যায় তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রশংসা পাবে।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।