ডুবো ধান বনাম বোনা আমন ধান


ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি ষ্টার এর ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সংখ্যায় ইনোভেটিভ রাইস ফার্মিং ইন দি নর্থ (উত্তর অঞ্চলে নব প্রবর্তিত ধানের আবাদ) শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপা হয়। এ সংবাদের শুরুতে লেখা হয় ২০১৪ সালে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে নীচু এলাকায় বসবাসরত জনগণ এক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত ধানের জাতগুলি ১৫ দিন পানির তলায় ডুবে থাকে। ফলে ফসল বিনষ্ট হয়।

এ খবরে প্রকাশিত বন্যার খবরটি সত্য তবে ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত ধানের জাতগুলি বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টি বির্তক সৃষ্টি করেছে।

পানির উপর ভিত্তি করে স্মরণাতীতকাল থেকে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের ২০% জমি স্বাভাবিক অবস্থায় বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হয়। আবার বড় বন্যা যেমন ২০০৭, ২০০৪, ১৯৯৮, ১৯৮৮, ১৯৭৪, ১৯৫১, ১৮৯২, ১৮৮৫, ১৮৭৫, ১৮৭১, ১৮৫৮,১৮৪২ সালে ব্যাপক এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে যায় এবং দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, ১৯৯৮ সালের বন্যায় যমুনা, গঙ্গা এবং পদ্মা অববাহিকা যথাক্রমে ৮৭, ২৮ এবং ১১৮ দিন পানিতে ডুবে থাকে।

কৃষি এ অঞ্চলের মানুষের স্বর্গীয় উপহার। ধান তার মধ্যমনি। পরিবেশ প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে যুগযুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতের ধান আবাদ করে আসছেন। জমির অবস্থান ও ধরণ বুঝে ধানের জাত নির্বাচন করছেন। টান জমির জন্য এক শ্রেণীর ধান। মাঝারি জমির জন্য অন্য রকম ধান। নীচু জমিতে বহু জাতের গভীর পানির বোনা আমন ধান আবাদ করে আসছেন। নীচু জমিতে চৈত্র-বৈশাখ মাসে ছিটিয়ে এ সব ধানের বীজ বোনা হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বন্যার পানির সাথে ধান গাছ বেড়ে ওঠে। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে পাকা ধান কাটা হয়।

বাংলাদেশে ৫৬, ৪৫, ৬৩৭ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়। এর মধ্যে ৫২, ১৯, ৫৮৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন এবং ৪, ২৬, ০৫৪ হেক্টরে বোনা আমন ধানের চাষ হয় (বিবিএস, ২০১১)।

এক সময় এ দেশে শত শত জাতের বোনা আমন ধানের চাষ ছিল। নয়াকৃষি, উবিনীগ (২০১০) এর সমীক্ষায় ১৬৪ জাতের বোনা আমন ধানের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতগুলি হচ্ছে: চামারাদিঘা, হরিঙ্গাদিঘা, বাওইঝাক, মরিচফুল, মধুশাইল, লোহাডাং, কার্তিকশাইল, ভাওয়ালিয়া, বাঁশীরাজ, ঝুলদিঘা, সোনাদিয়া, ভাওয়ালিয়াদিঘা, মালভোগ, বকঝুল, সাদাবাজাল, বাজাল, বাওয়াল, কালোবাজাল, ইজলদিঘা, সোনাজলি, পাটনল, ঢেপা, ধলামোটা, জলঢেপা, দুধবাজাল, ঢেপাশাইল, লালচামারা, পানিশাইল, সোনাআঞ্জল, কালো ঢেপা, লক্ষী দিঘা, অশানি, ডিঙ্গামতি, মোরাবাজাল, ভাওয়াল, পানিয়া মোটা, বাঁশনল, দুধ শাইল, বাঁশ মোটা, পানিডাঙ্গা, দুধ রাজ, গনক রায়, বাঁশ মালতি, ওমর চামারা, লাল ঢেপা, আড়াইরাল, হিয়াল, খমন, গোরি, কাজল, কার্তিকঝুল, লানি, দুলন, বিলডুবি, মালিকাশাইল, গোনাগিরি, কাজলগিরি, ডুমরাজ, জলডুবি, বাসনা, লতামোটা ও লাইটা।

সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট (ইরি), ফিলিপাইন থেকে ইরি ধান প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) থেকে আরো অনেক জাতের ধান ছাড় করা হয়। গত শতাব্দীর নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে চীন, ভারত ও ফিলিপাইন থেকে হাইব্রিড ধান আমদানি করা হয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট এবং বিদেশী বীজ কোম্পানির সহায়তায় স্থানীয় বীজ কোম্পানি স্থানীয়ভাবে হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন করছে। এ পর্যন্ত ১১৭টি হাইব্রিড ধান এ দেশে ছাড় করা হয়েছে। অন্যান্য ফসল যেমন ভুট্টা, শাক-সবজি, গোল আলু, তরমুজ ইত্যাদির হাইব্রিড বীজ ছাড় করা হয়েছে।

সম্প্রতি জিএম (জেনেটিকালি মডিফাইড) বেগুন ব্যাপক চাষাবাদের জন্য ছাড় করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে জিএম ধান ও জিএম গোল আলু চাষের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বীজ ব্যবসা তথা কৃষি ব্যবস্থাকে বহুজাতিক কোম্পানি ধাপে ধাপে উচ্চ ফলনশীল জাত (উফশী), হাইব্রিড, জিএম এবং সব শেষে জৈবপ্রযুক্তি বা মলিকুলার টেকনিক ব্যবহার করছে।

বাহ্যিক হিসাবে দেখা যায় গত চার দশকে ধানের ফলন ও উৎপাদন বেড়েছে। তবে এ বৃদ্ধির পিছনে খরচের হিসাব থেকে দেখা যায় যে পানি সেচ, সার, বালাইনাশক, আগাছানাশক ইত্যাদির ব্যবহার ও বেড়েছে বহুগুণ। এক কথায় আধুনিক প্রযুক্তি প্রকটভাবে মূলধন নির্ভর। জাতিকে বহুজাতিক করপোরেশান এর বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল করেছে। কৃষকদের ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে, জনসাধারণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েছে, প্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়েছে, পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অভিযোজন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

বোঝার উপর শাকের আটির মত শত শত জাতের বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু জাতের ধান থাকা সত্ত্বেও ডুবো ধান (সাবমারজেন্স টলারেন্ট) প্রবর্তন করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে যে এ ধান ১৫ দিন পর্যন্ত পানির তলায় ডুবে থাকলেও ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। তবে বন্যা দির্ঘায়িত হলে কি হবে, তা উহ্য।

পক্ষান্তরে স্থানীয় জাতের বন্যা সহিষ্ণু ধানের জাতগুলি বন্যার পানির সাথে সাথে বেড়ে ওঠে। পানি যত বেশী হয় ধান গাছও তত লম্বা হয়। প্রতিটি গীট থেকে একটা করে কুষি বেড় হয়।

আরো জানা যায় যে, প্রবর্তিত তথা কথিত ডুবো ধান পানির তলায় টিকে থাকতে পারে: যদি বন্যার পানি চারা অবস্থার পরে এবং ফুল আসার আগে আসে; বন্যার পানি ১০-২০ দিনের মধ্যে সরে যায়, যদি তাপমাত্রা ২৬ সেলসিয়াস এর নীচে থাকে এবং যদি পানি পরিস্কার থাকে। ভয়ের কথা, এত শর্ত সাপেক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ধান আবাদ করে কৃষকরা মারাত্মক ফসল হানির আশংকায় পড়বেন নিশ্চিত।

পরিবর্তনশীল পরিবেশ প্রতিকুলতা মোকাবেলার স্বার্থে সময়ের পরীক্ষায় উতীর্ণ স্থানীয় জাতের বোনা আমন ধান এর পরিবর্তে ডুবো ধান প্রবর্তন করা হলে স্থানীয় জাতের ধানের অস্তিত্ব যেমন বিপন্ন হবে তেমনই জনসাধারণের খাদ্য সার্বভৈৗমত্বের উপর মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে।

এ ক্ষেত্রে ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট জীনব্যাংকে যেসব স্থানীয় জাতের রোপা এবং বোনা আমন ধানের বীজ আছে তা নিয়ে বোনা ও রোপা আমনের পরিবেশে আকশ্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু জাত বাছাই পরীক্ষা পরিচালনা করা উচিত।

কনসালট্যান্ট, উবিনীগ


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।