Search  Phonetic Unijoy  English 

ফরিদা আখতার


Sunday 23 July 17



print

লোকে প্রায় বলে আপনারা অনেক জাতীয় গুরুত্বপুর্ণ কাজ করেন কিন্তু প্রচার কম। কথাটি সত্যি। আসলেই অনেকে জানেন না আমাদের যেসব কাজ গ্রামে-গঞ্জে রয়েছে তার কোন জাতীয় মূল্য রয়েছে কিনা। আমাদের পরিচিতজনেরা দেখে মুগ্ধ্ব হন এবং আক্ষেপ করেন প্রচার নাই কেন! কিন্তু শুধু প্রচারের জন্য কাজ করার তো কোন অর্থ নাই। একটি কাজ আর দশটি প্রচার – এটা আমাদের নীতি নয়। তাই প্রচারের জন্য যে সময় দেয়া দরকার তা আমরা দেইনি। কিন্তু যদি দিতামও তাহলে কি আমাদের দেশে প্রচারের যে সব মাধ্যম রয়েছে তারা এগুলো গ্রহণ করতো? তার জন্যও এক ধরণের প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, কারণ যে সকল ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করি সেই ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে সমাজে কিছু প্রাথমিক সচেতনতা ও বোঝার আগ্রহ আগে তৈরি করা দরকার। যেমন, প্রাণবৈচিত্র নির্ভর উন্নত কৃষি ব্যবস্থা, ঘরে এবং মাঠে দেশীয় জাতের বীজ ও গাছপালা উদ্ভিদ প্রাণী ইত্যাদি সংরক্ষণ, কৃষিকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টির চোখ দিয়ে বুঝতে শেখা, স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে দাই মাদের লোকায়ত জ্ঞান ও সামাজিক ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়া, ইত্যাদি। তবে কিছু কিছু কাজে আমাদের পরিচিতি বাড়ে নি তা নয়, বিশেষত তামাক চাষের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম এবং তামাক চাষের জমিকে খাদ্য উৎপাদনের জমিতে রূপান্তর করা।

প্রচার মাধ্যমের মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে সংবাদ পত্র ও টিভি, রেডিও ইত্যাদি। বর্তমানে যোগ হয়েছে সোশাল মিডিয়া। এসব মাধ্যমে যতো বেশি উপস্থিতি থাকবে যে কোন কাজ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যাক্তি তত বেশি ‘বিখ্যাত’ হবেন। সংক্ষেপে বললে দাঁড়ায় মিডিয়াই ঠিক করবে কে কতটা কাজ করেছে, কোনটা আলোচনা হওয়া উচিত কোনটা নয়, কারটা সত্যি, কারটা মিথ্যা। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই মিডিয়া সম্পুর্ণ স্বাধীন নয়। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি না হলে মিডিয়া আসবে না, অর্থনৈতিকভাবে মিডিয়াকে সন্তুষ্ট করা না গেলেও মিডিয়ার একটি অংশ সাড়া দেবে না, আর বিষয়টা মিডিয়ার ব্যবসার সহায়ক না হলেও মিডিয়া আসবে না। তাই আমাদের শুভানুধ্যায়ীরা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে যে আক্ষেপ করেন, সেটা আমরা চাইলেও পাওয়া আসলেই দুরূহ ব্যাপার।

আমরা যেসব কাজ করি তাতে জাতীয় স্বার্থ আছে। স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা গরিব মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে কথা বলি। জাতীয় বাজেটের সময় অন্য কোন বিষয় নিয়ে কথা না বললেও স্বাস্থ্য সেবার বাজেট বরাদ্দ যেন যথাযথ হয় তা নিয়ে দাবি তুলি। বাজেটের পর্যালোচনা করে দেখি ঠিকমতো বরাদ্দ হয়েছে কিনা। না হলে উদ্বেগ প্রকাশ করার জন্যে সংবাদ সম্মেলন করি। সাংবাদিক ডাকি। প্রিন্ট মিডিয়া এবং অন-লাইন কয়েকটি পত্রিকা এলেও টিভি ক্যামেরা দেখা যায় না। তার একটি কারণ হচ্ছে এই সংবাদ সম্মেলনে এমন কেউ বড় মাপের ভিআইপি নেই যাকে নিয়ে একটি নিউজ হতে পারে। কিন্তু আমাদের সম্মেলনে অনেক প্রথিতযশা চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী, গবেষক সবাই আছেন। সবার কথাই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু না, মিডিয়া্র কাছে তাঁদের এই উদ্বেগের মূল্য নেই। তাই যেসব সাংবাদিক এসেছিলেন তারাও খুব বড় কোন রিপোর্ট করেন না। দুএকটি পত্রিকা শুধু একটি ছবি দিয়েই খালাস। আমাদের বক্তব্য ভাল কি মন্দ বিবেচনা করে ফেললেন সাংবাদিকরা নিজেরাই। তাদের পত্রিকার পাঠকদের কাছে এই বক্তব্য পাঠানো প্রয়োজন বোধ করলেন না। কিছুই করার নেই। মেনে নিয়েছি, আমাদেরই ঘাটতি।

ধোঁয়াবিহীন তামাকের ওপর করারোপ নিয়ে কিছু করতে হলে ‘আত্মা’ (Anti Tobacco Media Alliance) বা তামাক বিরোধী সাংবাদিক জোট এর স্মরাণাপন্ন না হলে মিডিয়া প্রচার সম্ভব নয়। তাঁরা যখন আসেন বেশ ভাল ভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে আসেন, এবং বিষয়টির গুরুত্ব বুঝেই আসেন। এই রকম বিষয়ের ওপর জানা সাংবাদিক দেখলে আমাদের ভাল লাগে। তাঁদের আন্তরিকতাও প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু তাঁদের যখন-তখন ডাকা সম্ভব নয়। কিন্তু তারাও একটি গোষ্টি তাদের ডাক্তে হলেও নিয়ম মেনেই ডাকতে হয়। তাঁরা ছাড়া অন্য সাংবাদিকদের কাছে তামাকের কারনে এতো অসুস্থতা ও মৃত্যুর কথা প্রচারের কোন মূল্য নেই! শত অনুষ্ঠান করলেও সাংবাদিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এবার আসি দেশের মানুষের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ এবং আগামি প্রজন্মের জন্যে বেঁচে থাকার প্রশ্ন – তেমন একটি কাজের কথায়। আমরা কৃষিতে বিশেষ করে খাদ্য ফসলে জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ব্যবহার নিয়ে তথ্য উপাত্ত দিয়ে এবং অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে অনেক সাবধান করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ বেগুন। বেগুন সকল শ্রেণীর মানুষের খাদ্য, যার আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ-আসাম-মিয়ানমার অঞ্চল। সেখানে বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্তোর পৃষ্ঠপোষকতায় এই বেগুনের ৯ টি জাতের ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং করে এবং পেটেন্ট নিয়ে বিটি বেগুন নামে প্রবর্তনের বিরুদ্ধ্বে আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এই বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমে সহযোগিতা খুব সীমিতভাবে পাওয়া গেছে। কারণ বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যম নিজেরাই এর পক্ষ নিয়ে ফেলেছেন। সাংবাদিকতার নীতি মেনেও অন্য পক্ষের বক্তব্য শোনা যায় কিনা তার কোন ব্যবস্থা নেই। কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যম নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছে এ নিয়ে প্রতিবেদন করা যাবে না। মনসান্তোর মতো পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন কোম্পানি নিয়ে কথা বললে মিডিয়া শুনতে চায় না, পাঠক ও দর্শককেও জানাতে চায়না। দেশ ও মানুষের ক্ষতি হলে যেন কারো কিছু যায়-আসে না।

আমরা নয়াকৃষি আন্দোলন নামে কৃষকদের একটি আন্দোলনের সাথে যুক্ত। এই কৃষকরা কোন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভর চাষাবাদ করে, দেশীয় বীজ রক্ষা করে , মাটির তলার পানি সেচের জনয়ে ব্যবহার না করে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য ফলায়। তাদের কথা জানার জন্যে মিডিয়া ছোটে না।

নারী অধিকার নিয়ে মিডিয়ার আগ্রহ আছে, তবে যতক্ষণ ধর্ষনের মতো ঘটনা, বা সরাসরি নির্যাতন না ঘটছে, ততক্ষণ তাদের আগ্রহ নাই। কৃষিতে নারীর অধিকার হরণ হচ্ছে এটা কোন খবরই নয় । পরিবেশ ধ্বংস হওয়া মানে নারীর জীবন-জীবিকার ক্ষতি হওয়া, গোলকায়নের ফলে নারী শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি- এ সমস্ত বিষয়ে আগ্রহ পাওয়া যায় না। বড় ধরণের সভা করলেও আকর্ষণীয় ভিআইপি মন্ত্রী না হলে মিডিয়া আসতে চায় না। সেই মন্ত্রী বা ভিআইপি যে বিষয়ের ওপর সেমিনার বা আলোচনা সেই বিষয়ের ওপর কথা না বলে অন্য রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেই সেটাই শিরোনাম হয়।

এমন অভিজ্ঞতা শুধু আমাদের একার নয় , অনেকেরই আছে। কাজেই আক্ষেপ শুধু আমার একার নয়।

কিন্তু মিডিয়া কারো পেছনে লেগে থেকে তথ্য নিতে জানে, এবং তার প্রয়োজনে যতোক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, তাও দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাদের ডাকতে হয় নি, তারা নিজেরাই এসেছে। সংখ্যায় অনেক এসেছে। কেউ ফোনে, কেউ সরাসরি হাজির হয়েছে। যতোভাবে তথ্য খুঁজতে হয়, তথ্য পাওয়া না গেলে কি করে ছোট খবরকে বড় ও বিকৃত করা যায় তাও দেখেছি। দেখেছি সাংবাদিক না ডেকেও তারা আসে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকে, বিরক্ত হয় না। তাদের সাথে কথা বলতে পারছি না, তাও তারা কথা বলবেই। ফোনের পর ফোন করবে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করবে, যদি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নেই যে ভাই কথা বলতে পারছি না। তখন সৌজন্যমুলক কথার ছুতায় উত্তর দেয়ার পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। তথ্য নেয়ার জন্যে তারা বলেন , আমরা তো পজিটিভ রিপোর্ট করি। আমার প্রশ্ন সত্যিকারের সাংবাদিকতা করলে কি পজিটিভ বা নিগেটিভ বলে কিছু থাকে? যা সত্যি তাই লিখলে তা যার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে তাতো বিবেচ্য হবার কথা নয়। সাংবাদিকতা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। সেখানে কি দলীয়, সরকারি বা পজিটিভ-নিগেটিভ রিপোর্টিং বলে কোন ভাগ করা হয়?

সাংবাদিকরা যখন কাউকে রাতে ফোন করেন তখন তাদের জন্যে কাজের সময় বা ওয়ার্কিং আওয়ার। কিন্তু যাকে ফোন করছেন তিনি হয়তো সারাদিনের কাজ শেষে পরিশ্রান্ত, বিধস্ত, এমনকি হয়তো অসুস্থ বোধ করছেন। নম্বর দেখে সাংবাদিকের ফোন তো বোঝা যায় না। তাই ফোন ধরলেই কথা বলতে বাধ্য করার অবস্থাও দেখেছি। বড় নিষ্ঠুর মনে হয়েছে। অপর দিকে কথা বলতে না চাইলেও কোন কোন রিপোর্টার কাতর হয়ে বলেছে, ম্যাডাম, আমাদের ওপর হাউজের চাপ আছে। কিছু একটা রিপোর্ট করতেই হবে! তবে রিপোর্টারদের আমি একা দোষারোপ করছি না, কারণ তাদের রিপোর্ট যাই হোক, বার্তা সম্পাদক বা সম্পাদকের টেবিলে গিয়ে তার শিরোনাম কিংবা বক্তব্য ভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।

সাংবাদ, সাংবাদিকতা এবং সংবাদ মাধ্যম কবে জনস্বার্থে তাদের ভুমিকা রাখবে?


Related Articles


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Comments Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : মিডিয়া, সংবাদ পত্র, টিভি, রেডি, ,

View: 282 Bookmark and Share


Home
EMAIL
PASSWORD