৩০০ আসনে নির্বাচন : বাকি ৫০টির কী হবে?


একদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে কি হবে না সংশয়, অন্যদিকে সরকারি দলের প্রস্তুতি চলছে মনোনয়নপত্র বিক্রির। এ যেন এক উৎসব। নাচানাচি হচ্ছে, ঢোল বাজছে। তবে এ উৎসবে আসনসংখ্যা গনা হচ্ছে ৩০০। মনে হচ্ছে এগুলো বেশির ভাগ পুরুষদের জন্য নির্ধারিত। মোটরসাইকেল র?্যালি করে এসে মনোনয়ন চাওয়ার মধ্যে তাই প্রতীয়মান হয়। তারা সবাই ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে নিজ নির্বাচনী এলাকার মনোনয়নপত্র কিনছেন ২৫ হাজার টাকা দিয়ে। এরই মধ্যে সবার অজান্তে থেকে যাচ্ছে ৫০টি আসন, যা সংরক্ষিত নারী আসন নামে পরিচিত। যখন সংসদ অধিবেশন চলে তখন যিনি চালান অর্থাৎ স্পিকার, তিনি যে আসন থেকে এসেছেন সে আসনও এখন গনার বাইরে। এ বড় অদ্ভুত ব্যাপার। এ আসনগুলোর মর্যাদা কখন বাড়ে বা কমে তা বোঝার উপায় নেই। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী যোগ্যতার দিক থেকে বিভিন্ন মানদ-ে মিললেও একটি ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে গেছে যে, তিনি সরাসরি নির্বাচিত নন। তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের একজন। তাকে প্রধানমন্ত্রী স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করেছেন ভালো কথা; কিন্তু তার ব্যাপারে যে প্রশ্ন থেকে গেছে তার কোনো সুরাহা করে দেননি। এ বিষয়টিকে একটা ঘাটতি হিসেবেই রেখে দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে যারা সংরক্ষিত আসনে আছেন তাদের মধ্যে দু’একজন সংসদ সদস্যকে মনোনয়নপত্র কিনতে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা সরাসরি নির্বাচন করতে চান। তাদের এ আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধকে আমি সাধুবাদ জানাই। আর বাকি যারা সংরক্ষিত আসনেই থাকবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন তারা এখন বসে থাকছেন। নির্বাচনের সময় হলে দলের প্রার্থীদের জন্য মাঠে ভোট চাওয়ার কাজ করবেন। তারপর যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে সে দলের নারী সদস্যদের ডাকা হবে, পুরস্কার হিসেবে তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য। আমরা নারী আন্দোলন থেকে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি এ পদ্ধতি চরম অসম্মানজনক, ২০১৪ সালের নির্বাচনে এসে এ পদ্ধতি আর মেনে নেয়া যায় না। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা (যার বেশির ভাগ পুরুষ) করুণা করে তাদের নির্বাচিত করবেন। জনগণের কাছে সরাসরি ভোট চাইতে গেলে যে ধরনের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়, এখানে তা হবে না। এখানে তাদের অনুগত হতে হবে। সেটাই তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। সাধারণ আসনের পুরুষ (কিছু মহিলাও আজকাল আছেন) সদস্যদের সুপারিশে এবং সংসদ নেতার চূড়ান্ত অনুমোদনে এক অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শেষ পর্যন্ত গিয়ে মনোনীত হবে সংরক্ষিত আসনের ৫০টি আসন। তবে একথা সবাই স্বীকার করবেন, এ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এই ৫০টি আসনের সদস্যই সংসদ অধিবেশনের সময় নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ আসনে বসে থেকেছেন, অন্য আসনগুলো তখন ফাঁকা। তারা নিয়মিতভাবে বক্তব্য রেখেছেন, প্রয়োজনে নিজ ‘কাল্পনিক’ নির্বাচনী এলাকার জনগণের জন্য মন্ত্রীদের কাছে বরাদ্দ চাওয়া এবং কিছু উন্নয়নের কাজ করা সবই তারা করেছেন। তারা সংসদ সদস্য; কিন্তু তারা জনপ্রতিনিধি নন। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে!
শুধু তাই নয়, নিজ নিজ দলের জন্য তারা কী না করেছেন! টেলিভিশন টকশোতে গিয়ে বিরোধী দলের সদস্যের সঙ্গে দলীয় অবস্থান থেকে বিতর্ক বা ঝগড়া করেছেন। সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকে অপমান করেছেন কিংবা বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করেছেন। এক কথায় তারা সংসদে দলের লাঠিয়াল বাহিনী হয়েছেন। প্রতিপক্ষের প্রতি কথার লাঠি মারার কাজটি করেছেন। এতে শ্লীলতা-অশ্লীলতার প্রশ্নে এবং সমালোচনায় এ নারী সংসদ সদস্যরাই জর্জরিত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। মনে হয়েছে পুরুষ সদস্যরা কখনোই অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন না!

বিগত নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিষ্কার ভাষায় বলেছিল যে, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দেবে। ২০০৯ থেকে আমরা শুনে আসছি তারা নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন করবেন এবং তাই সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন করবেন। এখন নভেম্বর ২০১৩ সাল, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও এবং সংবিধানে নানাভাবে কাটাছেঁড়া করার পরও নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার কাজটি তারা করেননি। অথচ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন বলে দলের পক্ষ থেকে নেতানেত্রীরা সব সময় বলতে থাকেন। আগামী নির্বাচনের জন্য যখন ইশতেহার তৈরি করা হবে তখন কি আবারও বলা হবে, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে? যদি তারা তাই লেখেন তাহলে এটা হবে সবচেয়ে বড় প্রহসন। যখন তাদের করার সর্বময় ক্ষমতা ছিল তখন কিছু করেননি, আর এখন আবার নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে! বাহ্! আর যদি তারা এ ব্যাপারে কিছু না বলেন তাহলে বুঝতে হবে তারা নারীদের ‘অনুগত’ রাজনৈতিক কর্মী বানিয়ে রাখতে চান। তাদের মাথার ওপর সিলিং বাঁধা থাকবে। বেশি দূর এগোনো যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা তারা কখনোই জনগণের কাছে পৌঁছতে পারবেন না।

টেলিভিশন টকশোতেও এ বিষয়ের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। আজকাল দুই নেত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কথাবার্তা যেভাবে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে নারী নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। মানে তারা দু’জন নারী বলেই এমনটি হচ্ছে। অথচ এ পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে নারীদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক থাকবে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে বিরোধে জড়াবেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা নারীমূলক নয়, এটা নিছক পুরুষতান্ত্রিক।
জাতীয় সংসদ রাজনীতিবিদদের জন্য এবং বিশেষ করে যারা নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে যাওয়া কিংবা যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়াটাও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু নারীদের জন্য সে কাজটি করতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের তাঁবেদারি রাজনীতি করতে হচ্ছে।

যদি এবারের নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন না দিতে পারেন তাহলে এ আসনগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করে নারীদের সাধারণ আসনে নির্বাচনের জন্য বেশি করে মনোনয়ন দিন। নারীরা দিনে দিনে সামনে এগোবার কথা; কিন্তু এভাবে তাদের পিছিয়ে দেয়ার রাজনৈতিক চর্চার আমরা বিরোধিতা করি।

আশা করি নারী রাজনৈতিক কর্মীরা সংরক্ষিত আসনের অপেক্ষায় না থেকে সাধারণ আসনের জন্য এগিয়ে আসবেন।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।