জিএম ফসলের প্রবর্তন নাকি প্রকৃতি নিয়ে জুয়া খেলা


বাংলাদেশ যখন দ্রুত কৃষিতে একের পর এক জিএম ফসলের প্রবর্তনের জন্য তাড়াহুড়ো করছে, সে সময় ভারত বলছে, তারা এ ব্যাপারে ভেবে-চিন্তে এগোবে; কোনো তাড়া নেই। তারা বলছে, জনগণের মধ্যে জিএম ফসল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাজেই বাণিজ্যিকভাবে চাষের অনুমোদন দেয়ার আগে আট-দশ বছর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সফলতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে [দ্য ইকোনোমিক টাইমস, ১০ জুন ২০১৫]। স্কটল্যান্ড সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএম ভুট্টা ও ছয়টি জিএম ফসলের অনুমোদনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং পরিষ্কারভাবে বলছে, স্কটল্যান্ডের মানুষের কাছে জিএম খাদ্যের চাহিদা আছে এমন কোনো প্রমাণ নেই, বরং স্কটল্যান্ডের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে জিএম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে, যা তাদের ১৪ বিলিয়ন পাউন্ড খাদ্য ও পানীয়ের বাজারের ক্ষতিসাধন করবে। স্কটল্যান্ডের ভোক্তারা জানতে চায় বিদেশ থেকে আসা মাংস, ডিম, দুধে যেন লেবেল দেয়া থাকে যে গরু বা মুরগিকে জিএম খাদ্য খাওয়ানো হয়েছে কিনা। স্কটল্যান্ড সরকার মনে করে, জিএম প্রবর্তনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না, বরং জিএম ফসলের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবস্থা বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। অথচ স্কটল্যান্ডে ছোট কৃষক এবং কমিউনিটি উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ হচ্ছে, যার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

http://www.thecourier.co.uk/news/scotland/gm-crops-set-to-be-banned-in-scotland-1.893824

বাংলাদেশের মতো উর্বর ও প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ একটি দেশে নির্দয়ভাবে জিএম ফসল উৎপাদনের জন্য বিদেশী কোম্পানিগুলো চেষ্টা করে যাচ্ছে। কারণ একে একে বিভিন্ন দেশ তাদের মাটি জিএম ফসলের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। বিশ্ব এখন সে দিকেই যাচ্ছে। তাই জিএম ফসল প্রবর্তনকারী কোম্পানির কিছু দেশ এমন লাগবে, যেখানে জিএম ফসলের ক্ষতির কথা গ্রাহ্য করা হবে না, তারা অনায়াসে সরকারের সাহায্যে শুরু করে প্রাইভেট সেক্টরের মাধ্যমে চালিয়ে নিতে পারবে। জিএম বা বিটি বেগুন ২০১৩ সালে তড়িঘড়ি অনুমোদন দিয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারির ২২ তারিখ থেকে মাঠপর্যায়ে চাষের মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রবর্তন করে বাংলাদেশে জিএম খাদ্য ফসল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের আরো ২৮টি দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে রাখা দরকার, এ সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল এবং ৫ জানুয়ারি একটি বিতর্কিত নির্বাচন করে সরকার গঠন করেই বিটি বেগুন চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিটি বেগুনের মতো একটি ফসলের মাঠপর্যায়ে কৃষককে দেয়ার আগে কোনো চিন্তা-ভাবনাই করল না। করার কথাও নয়। কারণ নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যেই জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি নাকচ হয়ে গেছে। এ বিটি বেগুন এশিয়ার অন্য দুটি দেশ ভারত ও ফিলিপাইনে কেন ঢুকতে পারেনি, সে বিবেচনাকেও মাথায় রেখে চিন্তা করা হয়নি। ভারত ও ফিলিপাইন সরকার বিটি বেগুনের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত দিকগুলো নিয়ে নিশ্চিত না হয়ে চাষ করতে চায় না। বাংলাদেশের পরিবেশবাদী ও কৃষক সংগঠন এর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু এসব অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশ মনসান্তো ও মাহিকোর পরিকল্পনামাফিক প্রথম পর্বে ২০ জন কৃষক, পরে ১০৬ জন, আগামীতে আরো কৃষককে সম্পৃক্ত করে চাষের ঘোষণা দিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বিটি বেগুন চাষ খুব ভালো ফল দিয়েছে, তাই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ সংগঠনের নিজেদের এবং সাংবাদিকদের নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্যর্থতার কথাই ধরা পড়েছে। কৃষকের লাভ হয়নি, কৃষক ভালো করে জানেনও না এ বেগুনের বিশেষ মাহাত্ম্য কী। পোকা লাগবে না বলেছে এই যা, কিন্তু কৃষক দেখছেন পোকা লাগছে, ঠিকমতো ফলন হচ্ছে না, বেগুন পচে যাচ্ছে। দেখতে বিদ্ঘুটে লাগছে। কৃষক বিটি বেগুন নাম বলতে পারেন বটে, কিন্তু এটা যে জেনেটিকালি মডিফাইড (জিএম) ফসল এবং এর সম্ভাব্য ক্ষতি কী হতে পারে, কিছুই জানেন না। কিছু এলাকায় কৃষক নিজে নামকরণ করেছে ‘সরকারি বেগুন’, কিন্তু তারা এটাও দেখেছেন, কীটনাশক দেয়া তো বন্ধ হয় না। ফলে পোকা লাগার বিষ না দিলেও পাতা ও গোড়ায় পোকা লাগছে। কৃষি কর্মকর্তা তাদের বিষ ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন। তাহলে কী লাভ হলো? তারা দেখেছেন, তাদের জমির পাশে স্থানীয় জাতের বেগুনের চাষ করে এলাকার চাষীরা সপ্তাহে হাজার হাজার টাকা আয় করছেন, আর তার মাঠে বিটি বেগুন চেয়ে চেয়ে দেখছে! না, এসব ব্যর্থতা মনসান্তো, মাহিকো এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে থামাতে পারেনি, তারা পরবর্তী পরিকল্পনা করে ফেলেছেন। অর্থাৎ ব্যর্থ হবে জেনেও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করেই বিটি বেগুন বাজারে বিক্রির জন্য দিতে গিয়ে তারা লেবেল লাগাচ্ছে না। জনগণ জানে না, তারা যে বেগুন খাচ্ছে, তার মধ্যে বিটি বেগুন কোনটি!


BT-BRINJAL


বিটি বেগুনের বিরোধিতাকারীদের কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ‘দায়িত্ব’ নিয়ে ‘মূর্খ্য’ ও ‘মতলববাজ’ বলেছেন। Agriculture Minister Matia Chowdhury has said those protesting against BT brinjal cultivation in Bangladesh are either “devious” or “ignorant” [ bdnews24.com,[english] 29 May, ২০১৫] তিনি আরো বলেছেন, “The words are harsh but I’ve said this with responsibility.” তাকে ধন্যবাদ। এত বড় কথা দায়িত্ব নিয়েই বলতে হয়। বিরোধিতাকারী হিসেবে আমরা এ দলের মধ্যে পড়ি। এতে আমাদের অসুবিধা নেই। কারণ আমরা সোচ্চারভাবেই বিরোধিতা করেছি এবং যত দিন প্রমাণিত না হবে যে, বিটি বেগুন নিরাপদ, তত দিন আমাদের কথা বলে যেতেই হবে। আমরা তার এ কথায় বিচলিত নই। কারণ আমাদের তথ্য যে সঠিক, তার প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। আমরা মনে করি, বেগুনের মতো সাধারণ মানুষের ব্যাপক ব্যবহারের সবজিকে জেনেটিকালি মডিফাই করা এক ভয়ানক জুয়া খেলার মতো কাজ। এতে ক্ষতি হলে মাথা তোলার উপায় থাকবে না। বাংলাদেশ অঞ্চল হিসেবে বেগুনের আদি উৎপত্তি স্থলের মধ্যে পড়ে। রুশ বিজ্ঞানী ভ্যবিলবের মতো বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীরা তা চিহ্নিত করে দিয়েছেন। জিএম ফসল প্রবর্তনের আন্তর্জাতিক নীতিমালায়ও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ জিএম ফসলের কারণে স্থানীয় জাতের ক্ষতি হওয়া মানে একেবারে গোড়ায় ক্ষতি করা। এসব বিষয় কৃষি মন্ত্রণালয় না দেখলেও বায়োসেফটি রুলের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার দায়িত্ব পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের। আমরা বাংলাদেশে জিএম ফসলের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সোচ্চার দেখছি, কিন্তু পরিবেশ মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েই চুপ করে বসে আছে। তাদের অনুমোদনে শর্ত লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা, তার কোনো তদারকি নেই। অথচ অন্য দেশে বিশেষ করে ভারতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সবসময় তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ (বারি) একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে বিটি বেগুনের সাফল্য বর্ণনার জন্য। জুলাইয়ের ২৯ তারিখের পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে। দুঃখের বিষয় এ সংবাদ সম্মেলনে দেয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। বারি মনগড়া তথ্য দিয়ে বিটি বেগুন চাষ বাড়াতে চায়, সেটা আমরা ঠেকাতে পারব না। কারণ তাদের হাতে ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত তারা যত এলাকায় বেগুনের চারা দিয়েছে, সবখানে সফল হতে পারেনি। এ দেশের মাটি জিএম ফসলকে ‘না’ বলে দিয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সেটি হলো, বিটি বেগুনে কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ার যে দাবি করে এর পক্ষে জনসমর্থনের চেষ্টা করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। বিটি বেগুনের চাষে কীটনাশক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ হয় না এবং সেটা কৃষি কর্মকর্তারা নিজেরাই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটা খুব দুঃখজনক যে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) কীট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইপিএমকেও তারা নাকচ করছেন, যা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। সাধারণভাবেই জিএম ফসলের ব্যাপারে কিছু প্রমাণিত তথ্য দিচ্ছি। বিটি বেগুনে নতুন কিছু হবে না। ব্রাজিল জিএম ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে আছে। জিএম সয়াবিন বিশেষ করে এখানেই হয়। Brazilian Association of Collective Health (Abrasco) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০-২০১২ সাল পর্যন্ত কীটনাশকের ব্যবহার ১৬২ শতাংশ বেড়েছে এবং এ বৃদ্ধি সরাসরি জিএম ফসল চাষের সঙ্গে জড়িত। জিএম সয়াবিন প্রবর্তনের সময় বলা হয়েছিল, এগ্রোকেমিক্যালের ব্যবহার কমে যাবে। কারণ জিএম সয়াবিনের প্লেগ হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তার সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা ঘটছে। শুধু পরিমাণে বেশি নয়, আরো শক্তিশালী ও কার্যকর কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু কীটনাশক জরুরিভাবে আমদানি করতে হয়, যা এর আগে ব্রাজিলে অনুমোদিত ছিল না। ব্রাজিলে জিএম ফসলে ব্যবহার করা এগ্রোকেমিক্যালের ৫০টি উপাদানের মধ্যে ২২টি অন্যান্য দেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। তারা বলছে, এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। http://news.agropages.com/News/News Detail---14870.htm

কাজেই কীটনাশক ব্যবহার কমাবার যুক্তি বাংলাদেশেও খাটবে না, কিন্তু যখন তারা এ বিষয়ে বুঝতে পারবেন, তত দিনে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

খুব অবাক হয়েছি যে, বিটি বেগুনের স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা তারা কীভাবে করলেন, তা জেনে। স্বাস্থ্য গবেষণা করা খুব সহজ কাজ নয় এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এত দিন বলা হলো স্বাস্থ্য গবেষণা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। অথচ এখন বলা হচ্ছে, বিটি বেগুনের খাদ্যমান ও রাসায়নিক উপাদানগুলো দেশী-বিদেশী গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি। এখানে অবশ্য বলা হয়নি যে, বাংলাদেশে উৎপাদিত বিটি বেগুন স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ কিনা, সে গবেষণা করা হয়েছে কিনা। তারা একটিও অ্যাক্রেডিয়েটেড ল্যাবরেটরির নাম উল্লেখ করেননি, তাহলে অন্তত বোঝা যেত, এ গবেষণাগারগুলো কোম্পানি পরিচালিত, নাকি স্বাধীন কোনো ল্যাবরেটরি! অথচ বিটি বেগুন নিয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা করে এর স্বাস্থ্য ক্ষতির দিক তুলে ধরেছেন এমন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীর নাম আমরা দিতে পারি। ফরাসি বিজ্ঞানী Professor Gilles-Eric Seralini [Committee for Independent Research and Information on Genetic Engineering (CRIIGEN)] মানসান্তো-মাহিকোর ডোসিয়ার মূল্যায়ন করে বলেছিলেন, বিটি বেগুন মানুষের খাওয়ার উপযুক্ত নয়। কয়েকটি স্বাস্থ্য সমস্যার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। যেমন বিটি বেগুনে এমন একটি সবজির সেল তৈরি হয়, যাতে শরীর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্টান্ট হয়ে পড়ে। তাছাড়া এতে ১৫ শতাংশ কম ক্যালরি পাওয়া যায় এবং প্রতি কেজি বেগুনে ১৬-১৭ মি. গ্রাম কীটনাশকের বিষ থাকে। প্রাণী দেহের রক্তের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ছাগল এবং খরগোশের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার সময়কাল (prothrombin), লিভারের স্বাস্থ্য (total bilirubin) আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। ইঁদুরকে বিটি বেগুন খাওয়ানোর পর ডায়রিয়া দেখা দেয়, লিভারের ওজন কমে যায়। বিভিন্ন প্রাণীর ওপর বিটি বেগুনের প্রতিক্রিয়া দেখে সিরালিনি বলেছেন, জিএম বেগুন মানুষের খাদ্য হিসেবে নিরাপদ বলা যাবে না।

http://www.i-sis.org.uk/Bt-Brinjal-Unfit.php

বাংলাদেশের অনেক যোগ্য কৃষিবিজ্ঞানী রয়েছেন, কিন্তু জিএম ফসলের জন্য কোম্পানি নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের কথাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিটি বেগুনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিজ্ঞানী এসে তাদের কথাই বলে যান। বাংলাদেশের পরিবেশ, মানুষ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে যাদের জীবনের কোনো সম্পর্কই নেই। এ বিজ্ঞানীরা বিটি বেগুনের পক্ষে গান গেয়ে যাবেন, যত দিন মনসান্তো তাদের অর্থ দিয়ে খুশি করতে থাকবে। বাংলাদেশেও এ কাজ প্রকল্প আকারে চলতে থাকবে, যত দিন প্রকল্পে অর্থায়ন হতে থাকবে। যখন অর্থ দেয়া বন্ধ হবে, তার পর দেখতে চাই জিএম ফসল সরকার চালিয়ে নিচ্ছে এবং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস অটল রয়েছে। বিটি বেগুনের জন্য প্রতি বছর কৃষক সংখ্যা বাড়ানো এবং এলাকায় বাড়ানো হচ্ছে কোম্পানির অর্থ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার জোরে। এ ফসল ব্যর্থ হলো কি হলো না, কৃষকের ক্ষতি হলো না উপকার হলো, তাও দেখার বিষয় নয়। যদিও এখনো তাদের কৃষক দরকার, কৃষক ছাড়া হবে না। একপর্যায়ে বিটি বেগুনের চাষের বিষয় কৃষকের নিজ সিদ্ধান্তে তার নিজের জমিতে করার বিষয় থাকবে না। এটা সিদ্ধান্ত নেবে কোম্পানি। তারা যে এলাকায় করবে, সেখানে একজন দুজন কৃষক দিয়ে হবে না, তাদের লাগবে শত শত কৃষক একসঙ্গে, শত শত একর জমি নিয়ে চাষ করতে গিয়ে তারা কৃষকদের কন্ট্রাক্ট কৃষক বা দাস-কৃষক বানাবে। কোম্পানির দেয়া শর্তে এবং কোম্পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে জিএম ফসল চাষের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এটাই ডিজিটাল বাংলাদেশের আরেক রূপ।

বিটি বেগুন দিয়ে শুরু, বিফল হলেও অন্যান্য জিএম ফসল প্রবর্তনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। জুলাইয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, এক বছরের মধ্যে জিএম আলু মাঠপর্যায়ে চাষের জন্য প্রবর্তন করবে [নিউ এজ, ২৯ জুলাই, ২০১৫] এবং জিএম তুলা গ্রিন হাউজ ট্রায়াল শুরু করেছে [দ্য ডেইলি স্টার, ১৪ জুলাই ২০১৫]।

একের পর এক জিএম ফসলের প্রবর্তন, এ দেশের মানুষ ও পরিবেশের জন্য যে হুমকির সৃষ্টি করবে, তার দায়দায়িত্ব কে নেবে? পোকা দমন ও ফলনের কথা বলে কি আমরা প্রকৃতির সঙ্গে জুয়া খেলছি না? জিতলে ভালো হবে মুষ্টিমেয় কোম্পানির, তবে হারলে সারা দেশের মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনবে। তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ক্রমেই জিএম ফসল উৎপাদন থেকে সরে আসছে, আর এ জঞ্জাল আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।