Search  Phonetic Unijoy  English 

ফরিদা আখতার


Saturday 23 January 16



print

 অর্থনীতির অবস্থা বুঝতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বা কমেছে কিনা তা নিয়ে অনেক মাথা ঘামানো হয়। অর্থনীতিবিদরা নানা তত্ত্ব দেন। রাজনৈতিক সরকার পরিসংখ্যানে দারিদ্র্যের হার একটু কম দেখাতে পারলে উল্লসিত হয়ে ওঠে। আর জিডিপি বৃদ্ধি পেলে তো কথা-ই নাই। বাহ্! অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন গণতন্ত্রের দরকার নেই। এটা আমাদেরই কৃতিত্ব। আমাদের আগে যারা ছিল, তারা কিছু করেনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ উন্নয়ন বা দারিদ্র্যবিমোচনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকে এবং জনগণও কারও মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকে না। কাজেই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকে। কিন্তু অর্থনীতির অংক অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার ভাল কোন মানদণ্ড নয়। যদি এমন একটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয় যেখানে প্রবৃদ্ধির অর্থ কিছু মানুষের হাতে সম্পদের পুঞ্জিভবন, আর বাকিদের গরিব করা – তাহলে দারিদ্রের মাত্রা হ্রাস কিম্বা দরিদ্রের সংখ্যা কমা না কমার ব্যাপারটি নিছকই রাজনৈতিক প্রচার ও প্রপাগান্ডার ভূমিকা পালন করে। তবে এটা ঠিক সাধারণ ভাবে রাজনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সাধারণ মানুষের উন্নয়ন নাকি মধ্যবিত্ত ও ধনীদের বিত্ত বাড়ানোর রাষ্ট্রীয় নীতি ইত্যাদি কোন একটি সরকারের সাফল্য বা বিফলতার মানদণ্ড হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

উন্নয়ন কিম্বা দারিদ্র্যবিমোচনের সরকারী পরিসংখ্যান আসলে বিদ্যমান অসম অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থার পক্ষে প্রচার হিসাবে কাজ করে। যদি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরণ এমন হয় যে একদিকে সম্পদের পুঞ্জিভবন আর অন্যদিকে সম্পদহীনতা বা দারিদ্য তৈরি করে তাহলে সেই সম্পর্ক বদলানোর কাজ করলে দারিদ্যবিমোচন সম্ভব নয়। এটা আমরা কাণ্ডজ্ঞানেই বুঝি। উন্নয়নের পরিসংখ্যান তখন ক্ষমতাসীনদের প্রপাগাণ্ডার অধিক কোন ভূমিকা পালন করে না। যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার কোন উন্নতি ঘটায় না সেই ব্যবস্থার সাফাই গাইতে চাইলে প্রচার করতে হয় কত রাস্তা, ব্রিজ, অট্টালিকা, বিদ্যুৎ ইত্যাদির সংখ্যা ও পরিমান বেড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার চেয়েও বড় বড় দালানকোঠা, রাস্তা, গাড়ি, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া বিত্তবানদের জন্য তখন খুব জরুরি হয়ে ওঠে। দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য যেসব সেবা দরকার, তার চেয়ে যদি ধনীদের চলাচলের সুবিধার জন্য রাস্তাঘাট বানানো, ব্রিজ করা বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে বুঝতে হবে এই ধরনের উন্নয়ন চিন্তায় ঘোরতর গলদ আছে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে সাধারণত এই ধরনের সংখ্যার চাতুরি চলে। এর মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (MDG) সময়কাল পার হয়ে টেঁকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) নির্ধারণ করা হয়েছে। আসলে দরিদ্রদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু তাদের অবস্থার উন্নয়ন বা উত্তরণ ঘটেছে কিনা সেখানে ঘোরতর সন্দেহ আছে।

তবুও গরিবের প্রতি দয়া দেখে আমাদের আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ওপর মুগ্ধ (?) হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তারা দারিদ্র্যবিমোচন করতে চায়, দরিদ্রের সংখ্যা কমাতে চায়। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে; কিন্তু বিস্ময়কর যে আজ পর্যন্ত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি যে, ধনীদের ধন কমাতে হবে। ধনের পুঞ্জিভবনের অর্থ দুনিয়ায় গরিবের সংখ্যা বৃদ্ধি। অতএব সম্পদ পুঞ্জিভবনের হ্রাস টেনে ধরা দরকার। অথচ অধিকাংশকে গরিব রেখে অল্পকিছু পরিবারকে ধনি করা হচ্ছে। দারিদ্র্য কমানোর অর্থ তো ধনীদের আহরিত ধনের উৎস দেখে তার ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। গরিব এবং ধনীর সম্পদের ব্যবধান কেন এত বেশি তা বুঝতে হবে। বিশ্বের সম্পদ বেড়ে যায়নি, বেড়েছে কিছু মানুষের ভাগের অংশ। ধনসম্পদের পার্থক্য বিশ্বের মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে। কারণ ধন বৃদ্ধির জন্য অন্যায়-অবিচার যেমন বহাল রাখতে হচ্ছে, তেমনি অল্পকিছু পরিবারের স্বার্থে বাকিদের দমন পীড়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য হিংসা ও হত্যার ব্যবস্থাকে শানিত রাখতে হচ্ছে। গরিবের সংখ্যা কমাবার জন্য ধনিরা যুদ্ধ বাঁধাচ্ছে। ধনী-গরিব ব্যবধান বড় থাকা বিশ্বের জন্য এবং কোনো দেশের জন্যই ন্যায্য নয়।

অক্সফাম নামক ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থা গেল বছর জানুয়ারিতে একটি গবেষণা তথ্য প্রকাশ করেছিল এ সংবাদটি দিয়ে যে, বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে ধনের পরিমাণ হচ্ছে ৪৮ শতাংশ। তারা আশংকা প্রকাশ করেছিল এইভাবে চলতে থাকলে এই অল্প সংখ্যক ধনীর সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হবে ৫০ শতাংশ। এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল গেল বছর ১৯ জানুয়ারি। ঠিক ১ বছর পর ১৮ জানুয়ারি, ২০১৬-তে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৬২ জন ধনকুবেরের হাতে সম্পদ রয়েছে বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের সম্পদের সমপরিমাণ। এ এক অকল্পনীয় ও ভয়াবহ খবর! এ সময়ে বিশ্বে যারা গরিব, তারা আরও গরিব হয়েছে, মাত্র ৫ বছরে (২০১০ থেকে ২০১৫) তাদের সম্পদ কমেছে ৪১ থেকে ৫০ শতাংশ। একই সময়ে মাত্র ৬২ জন ধনীর সম্পদ বেড়েছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১.৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার।তারা ১ বছর আগে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। এ গতি চলতে থাকলে সম্পদের পুঞ্জীভবন আরও বেশি হবে। অক্সফামের গবেষণার ফল এক বছরের মধ্যে সত্য প্রমাণিত হয়ে গেল! আশ্চর্য!!

( বিলাতের গার্ডিয়ান পত্রিকা এই বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আগ্রহীরা এখানে পড়ে দেখতে পারেন: 'Richest 62 eople as wealthy as half of world's population' ।

পুঁজিবাদের সহজ পাঠ হিসেবেই জানি পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির চরিত্র হচ্ছে ধনী আরও বেশি ধনী হবে আর গরিব আরও গরিব হবে। কিন্তু তাই বলে মাত্র কয়েকজনের হাতে সব সম্পদ জড়ো হয়ে যাবে আর অন্যরা খেতেও পারবে না, এই পরিস্থিতি অবিশ্বাস্য। কিন্তু এটাই এখনকার বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।এই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য সহায়ক কোনো বিষয় নয়। ধনীর ধন বাড়ছে এমন সময়ে যখন দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বে প্রতি ১০ জনের একজন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় (ঘুম তার হয় কিনা তা আমাদের জানা নেই)। আধপেটা যারা খায়, তাদের হিসাব রাখা হয় না, কারণ তারা খেয়েছে এটাই হচ্ছে পরিসংখ্যান। আর যা খেয়েছে তাতে পুষ্টি ছিল কিনা, সুস্থ থাকবে কিনা তারও কোনো হিসাব নাই। তবে পুষ্টিহীনতার সংখ্যা বাড়ছে। এ হিসাব এখন করা হয়, কারণ এর সঙ্গেও ব্যবসা জড়িয়ে গেছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বলছে, ৭৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মতো খাদ্য খেতে পারে না। অর্থাৎ প্রতি নয়জনের মধ্যে একজন খাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সুস্থ থাকার মতো খাদ্য পাচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশকে ক্ষুধার দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ রয়েছে। এখানে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে বলে হিসাব করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ নাকি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে?

পৃথিবীর মোট সম্পদও বাড়ছে বলে মনে হয় না, কারণ তাই যদি হতো গরিবের সম্পদ কমে যেত না। বরং তাদের ভাগ্যেও এ বাড়তি সম্পদের কিছু পড়ত। অর্থাৎ কেক একই সাইজের রয়ে গেছে; কিন্তু ভাগাভাগিতে ধনীদের দিকে বড় করে কাটা হচ্ছে, আর গরিবের দিকে পাতলা সাইজ হয়ে যাচ্ছে। পাঠক একবার দৃশ্যটি কল্পনা করে দেখুন, কেমন লাগবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামেও আলোচনা হয়েছে ধনী-গরিবের ব্যবধানের প্রসঙ্গ। এ বিষয়টি পোপ ফ্রান্সিসের যেমন খারাপ লেগেছে, তেমনি আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ডেরও ভালো ঠেকেনি। তারা জানেন, গরিবের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া তাদের জন্যই বিপদের কারণ হতে পারে। তাই তারা কিছু অ্যাকশন প্রস্তাব করেন। কিন্তু সে প্রস্তাব বাস্তবে পরিণত করা যায়নি।

ধনী-গরিব ব্যবধানের চিত্র বাংলাদেশেও রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থায় নিচের দিকে যারা গরিব রয়েছেন, তাদের আয় ১.২ শতাংশ থেকে কমে ০.৮ শতাংশ হয়েছে ২০১০ সালে। তুলনায় উপরের দিকে থাকা ধনীদের আয় বেড়েছে ৫ শতাংশ থেকে ১৮.৩ শতাংশ। এ ব্যাপারে অর্থনীতির গবেষকরা সজ্ঞান। খবর হিসাবে এখানে পড়ুন। 

বাংলাদেশের মতো দেশে ধনী-গরিবের আয়ের এ বৈষম্য মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার বিপরীত নয় কি? ধনীর আয় বৃদ্ধি আপনাতেই ঘটে না। তারা বিশাল অঙ্কের ঋণ নিতে পারেন, কারণ ঋণ নেয়ার জন্য যে সম্পদ দেখাতে হয় তা তারা সহজেই দেখাতে পারেন। তাদের মাথায় যথেষ্ট তেল আছে, কাজেই ব্যাংকের কাজ হলো সেই তেলা মাথায় তেল দেয়া। অথচ ঋণ পরিশোধের হার তাদের মধ্যেই সবচেয়ে কম। ব্যাংকগুলোও তাদের ওপর বেশি চাপ দিতে পারে না। তাদের এক ঋণ পরিশোধের আগেই আরও বড় ঋণ দেয়া হয়, কারণ তাদের 'ক্রেডিবিলিটি' আছে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাও আছে। অথচ ছোট ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে হলে অনেক ধরনা দিতে হয় এবং ঋণ পরিশোধে একটু এদিক-ওদিক হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কাজেই ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন গ্রহীতার উদাহরণ বাংলাদেশে হাজার হাজার পাওয়া যাবে। এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারতেন তাহলে তাদের আয় বৃদ্ধি হয়ে ধনীর পর্যায়ে না গেলেও অন্তত বৈষম্যের পার্থক্য কিছু হলেও কমত। বড় ব্যবসায়ীদের সাহায্য করার পেছনে যুক্তি দেয়া হয়, তারা অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, তাই তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু ছোট ছোট ব্যবসায়ীও নিজের এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত অনেকের জীবনজীবিকার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এগুলো কি কর্মসংস্থান নয়?

এ অন্যায় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অক্সফামের প্রতিবেদনে তিনটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে- এক. করফাঁকি দেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দুই. সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তিন. কম মজুরি যারা পাচ্ছেন, তাদের মজুরি বাড়ানো। তাছাড়া কিছু কিছু শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য কর না দেয়ার বিশেষ সুবিধা (Tax haven) দেয়া হয় ব্যক্তি এবং কোম্পানিকে, ফলে দারিদ্র্যবিমোচন বা সেবামূলক কাজের জন্য ব্যয় করার মতো রাজস্ব আয় সরকারের বৃদ্ধি পায় না। আয় বৈষম্য বাড়তে থাকার এটাও একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অক্সফামের প্রতিবেদনে বিশ্বের ধনীদের আয় (যা তারা অন্য দেশে বিনিয়োগ করে আয় করেছে) ৭.৬ ট্রিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে, টাকার অঙ্কে লক্ষ-হাজার কোটির ঘরে পড়বে। এ আয়ের ওপর যদি কর দেয়া হতো তাহলে সরকারগুলোর ভাণ্ডারে ১৯০ বিলিয়ন ডলার থাকতে পারত, যা দিয়ে তারা জনসেবামূলক কাজ করতে পারত। যেমন- আফ্রিকার অর্থনৈতিক সম্পদের ৩০ শতাংশ বিদেশ থেকে আহরণ করা হয়েছে; কিন্তু এর জন্য কোনো কর সরকারকে এই ব্যক্তি বা কোম্পানি দেয়নি। যদি তারা কর দিত তাহলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যবহার করা যেত এবং প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জীবন বাঁচানো যেত। একইসঙ্গে আফ্রিকার স্কুলগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিশুকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হতো। তার মানে হচ্ছে, ধনীদের সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার জন্য সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা আছে। আর বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে অংশগ্রহণকারী বহুজাতিক কোম্পানির কর দেয়ার বিষয়টি দেখতে গিয়ে অক্সফাম প্রতিবেদনে লিখছে, প্রতি ১০টি করপোরেশনের ৯টি কোনো না কোনো উন্নয়নশীল দেশের কর না দেয়ার সুবিধাভোগের (বা ইংরেজিতে Tax haven) অঞ্চলে কাজ করছে। অর্থাৎ তাদের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র আদতে উন্নয়নশীল দেশ, আর কোম্পানিগুলো কর না দেয়ার কারণে সেই দেশের সরকার ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় হারাচ্ছে। এ সুবিধা পেয়ে ধনীদের আয় বৃদ্ধি সহজ হয়ে গেছে এবং সঙ্গত কারণেই ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশে বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণ।

বাংলাদেশে উন্নয়নের নামে রফতানিমূলক শিল্প, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইত্যাদি স্থাপন করতে গিয়ে সেখানে যেসব উদ্যোক্তা কোম্পানি আসে, তাদের কর দিতে হয় না। ফলে দেশে এ ধরনের যত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি করা হবে সেখানে বিশেষ ব্যক্তি ও কোম্পানি তাদের বর্ধিত আয়ের ভাগ সরকারকে দেবে না। তারা দয়া(?) করে এখানে বিনিয়োগ করছে এটাই অনেক বড় অবদান। তাদের কাজে সাহায্য করতে গিয়ে আমাদের দেশেরও গুটিকয় ব্যক্তি ও কোম্পানির আয় বৃদ্ধি পাবে। তাই তাদের জমি দিতে গিয়ে যদি শত বছর চাষ করার চা শ্রমিকদের জমিও দিতে হয় তাতে আপত্তি নেই। দেশের আরও অনেক এলাকায় কৃষিজমি নিয়ে নেয়া হচ্ছে, কারণ বিশেষ অঞ্চল করে কর না দেয়ার মতো বিশেষ সুবিধা দিলে বিনিয়োগ তো আসবে। অথচ বিনিয়োগ আনার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার কোনো চেষ্টাই নেই।

কাজেই এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় যে, হঠাৎ ধনীদের ধন বেড়ে গেছ। ধনিরা খুব খেটেখুটে আয় উপার্জন করেছেন আর গরিবরা অলস সময় কাটিয়ে বসে আছেন, তাই এ আয়ের বৈষম্য ! না মোটেও তা নয়। ধনীদের আয় বাড়ানোর সুবিধা সৃষ্টি করছে উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলোই। তাই মাত্র হাতেগোনা যায় এমন সংখ্যক মানুষের হাতে বিশ্বের সম্পদের পাহাড়। দুঃখজনক হচ্ছে, বাংলাদেশেও একই চিত্র।

আমাদের অবশ্যই এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এটাই এখন সবচের্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

২১ জানুয়ারি ২০১৬। ৮ মাঘ ১৪২২। শ্যামলী।

 

 

 

 

 


Related Articles


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Comments Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : ফরিদা আখতার, উন্নয়ন, দারিদ্র, ধনী-গরিব ব্যবধান, অক্সফাম,

View: 2090 Bookmark and Share


Home
EMAIL
PASSWORD