জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে সঠিক বরাদ্দ জরুরি


দুটি বিষয়ে আশা করি কেউ দ্বিমত করবেন না। এক. স্বাস্থ্যসেবার যে ব্যবস্থা দেশে বিরাজমান, তা জনগণেরই পয়সায় চলে এবং এখান থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দুই. তামাক সেবন ও উত্পাদন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। আরো বিষয় স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সেবা আলোচনায় আসতে পারে। তবে এখন যেসব দাবি উঠছে, তার মধ্যে তামাকের উদাহরণ ইচ্ছে করেই টানছি। তামাক সেবনের কারণে সৃষ্ট রোগে বছরে প্রায় এক লাখ মানুষ ‘অকাল’ মৃত্যুবরণ করে। আরো ৩ লাখ মানুষ নানা রোগের কারণে ধুঁকে ধুঁকে মরে বা পঙ্গুত্ব বরণ করে। অকালমৃত্যুর অর্থ হচ্ছে— একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম কিংবা যিনি দেশের জন্যও অবদান রাখতে পারতেন, তাকে হারানো। বাংলাদেশে যে পরিসংখ্যান আমরা দেখছি, তা অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করেছে, দেশকে বঞ্চিত করেছে কর্মক্ষম মানুষের অবদান থেকে। জনস্বাস্থ্যের জন্য তামাক সেবন কমানো এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের তালিকায় গুরুত্বের সঙ্গে চলে এসেছে। এবারের বাজেট ২০১৬-১৭তে স্বাস্থ্য খাতে কেমন বাজেট হওয়া চাই, তা নিয়ে লিখতে গিয়ে এ বিষয়গুলো তুলে ধরতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাজেটের সময় এলেই আলোচনায় আসে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কেমন। দীর্ঘদিন বাজেটের সময় এ দাবি তুলতে গিয়ে আমরা যারা স্বাস্থ্য আন্দোলনে আছি, তারা এ বিষয়টি অর্থ বরাদ্দের পরিমাণের ঊর্ধ্বে চিন্তা করতে শুরু করেছি। আমাদের দেখার মূল বিষয় হচ্ছে, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার এবং তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের যে অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটি পূরণ করা হচ্ছে কিনা। আমরা এখন বিশ্ব অর্থনীতির যে পর্যায়ে আছি, তাতে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার দায়িত্ব থেকে সরকার মুক্তি পেতে চাইছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়ে সরকারের দায়দায়িত্ব আরো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তারা অবাধ দরজা খুলে দিয়েছে বেসরকারি খাত থেকে সেবা নেয়ার জন্য। যার সোজা অর্থ হচ্ছে, ‘টাকা থাকলে সেবা পাবে, না থাকলে মরতে হবে!’

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কী পরিমাণ এবং কোন খাতে দেয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে চিন্তা-ভাবনা হয়, কিন্তু এর সঙ্গে স্বাস্থ্য অর্থায়নের সম্পর্ক কী এবং কোন অর্থ রাজস্ব থেকে আসবে, কোনটা বৈদেশিক সাহায্য থেকে আসবে এবং জনগণ নিজে কতখানি বহন করবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। সরকারের বাজেট বরাদ্দের দিক থেকে স্বাস্থ্য খাত ধীরে ধীরে অবহেলিত একটি খাত হিসেবে বাজেটে স্থান পেতে শুরু করেছে। সার্বিক বাজেটের পরিধি বিশাল হচ্ছে, প্রতি বছরই বাড়ছে। উল্টো দিকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আনুপাতিক হারে প্রতি বছর কমছে। গত অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে অর্থ বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, টাকার পরিমাণে বাড়লেও মূল বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। এর আগের বছরের তুলনায়ও কম, ২০১৪-১৫ বছরে ছিল ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। স্বাস্থ্য আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখাতে চাই, স্বাস্থ্য খাতে অর্থের জোগানের বিষয় শুধু বাজেটে অর্থ বরাদ্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ব্যবহার কোথায় হচ্ছে এবং সেখানে তার আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা কিংবা যেখানে প্রয়োজন ছিল, সেখানে আদৌ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিনা, তা আমরা দেখতে চাই। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ স্বাস্থ্য অর্থায়নের একটি অংশ মাত্র। স্বাস্থ্য অর্থায়নের নানা পথ আছে, সেখানে এখন রোগীর পকেট বা গাঁট থেকে খরচ করাটাই মূখ্য হয়ে উঠছে।

আমরা এটাও জানি, স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতাল, ডাক্তার-নার্স, ওষুধ ও চিকিত্সা নয়। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুষ্টিহীনতা, খাদ্যবাহিত রোগ, তামাক সেবন ও উত্পাদন, জীবনযাপনের ধরন, নগরায়ণ, পরিবেশ, সড়ক দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া, রাজনৈতিক হানাহানি, কারখানায় আগুন ও ভবনধস, ট্রমাজনিত রোগ, অটিজম-প্রতিবন্ধিতাসহ অনেক রোগ; যা একজন সুস্থ মানুষকে পরক্ষণে অসুস্থ করে ফেলতে পারে। এর সঙ্গে দেশের উন্নয়ন, মানুষের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা জড়িয়ে আছে।

সরকারের বার্ষিক বাজেট পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব দিন দিন কমে আসছে, এটা শুভ লক্ষণ নয় কোনোভাবেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখার বিষয় যে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দটা কোথায় ব্যয় করা হচ্ছে এবং সেটা জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল কিনা। জনপ্রতি বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে মাত্র ৭০০ টাকা বছরে, দৈনিক মাত্র ১ দশমিক ৯২ টাকা। ২ টাকাও পুরো নয়। কী সেবা পাবে মানুষ এ টাকায়? অবশ্য বিনা পয়সায় যদি চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া যায়, তাহলে রোগীর অনেক উপকার হতে পারে। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ‘বাইরে’ থেকে কিনতে হলেও বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় খরচ অনেক কম। তাই লাইন দিয়ে টিকিট কেটে আউটডোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে চিকিত্সা নিতে দেখা যায় অনেককে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিলে ৬০ শতাংশ নিজের বহন করতে হয়, বেসরকারি সেবা নিলে তার পরিমাণ ১০০ থেকে ২০০ ভাগ বেড়ে যায়।

বিগত বছরগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে বিশেষভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ওষুধসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি খরচ হয়ে যায়। আবার দেখা যায় বরাদ্দকৃত বাজেটের টাকা পরবর্তী বাজেট ঘোষণার আগে খরচ করা হয় না। কমিউনিটি ক্লিনিক সরকারের তালিকায় প্রাধান্য পেলেও এজন্য প্রদত্ত বরাদ্দ সময়মতো ব্যবহার হতে দেখা যায় না। ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ‘উন্নত’ বলে দেখানো যেতে পারে কিন্তু দেশের গরিব মানুষের এটি কতটা কাজে লাগবে, তা আমাদের জানা নেই। বিগত বাজেটে (২০১৪-১৫) ১৩ হাজার ৮৬২টি মিনি ল্যাপটপ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ল্যাপটপ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া, জনশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট ছিল না। হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেন্টার করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৮টি হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেন্টার খোলা হয়েছে, আরো ১৫টি খোলার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষ বিনা পয়সায় চিকিত্সা পাবে বলে সরকার বলছে। গ্রামপর্যায়ে গিয়ে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য অর্থায়নের একটি মাধ্যম হচ্ছে স্বাস্থ্য বীমা। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চুক্তির মাধ্যমে টাঙ্গাইলের তিনটি উপজেলায় এক লাখ কার্ড দেয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে ৫০টি রোগ নির্ণয় ও বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হবে। সরকার কার্ডধারীদের ১ হাজার টাকা বছরে প্রদান করবে। এর বিনিময়ে তারা বছরে ৫০ হাজার টাকার চিকিত্সাসেবা পাবে।

এ বছর শেষ হচ্ছে দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে করা প্রকল্প ‘স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি (২০১১-২০১৬)’। এ কর্মসূচিতে দাতাগোষ্ঠী বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করলেও তাদের বিবেচনায় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জাতি-পেশাগত ও সামাজিকভাবে পশ্চাত্পদ অংশ, শ্রমজীবী মানুষ, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মানুষ, যাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই বাদ পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এ বছর থেকে শুরু হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) বছর, যার বেশকিছু বিষয় স্বাস্থ্য বাজেটে গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। বিষয়গুলো শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে অন্য অনেক মন্ত্রণালয়। তাদের বাজেটে স্বাস্থ্যের প্রতিফলন কোথায়? যেমন— জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগের মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন। অথচ জিকা ভাইরাসের কোনো ঝুঁকি নেই বাংলাদেশে— এ কথা বলাই যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে বাড়তি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উঠে আসছে। নগরের সমস্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেবে কি?

সংক্রামক রোগে মৃত্যু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও এখন স্বাস্থ্যসেবার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে অসংক্রামক রোগের কারণে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি। ৬০ শতাংশের বেশি মৃত্যু ঘটছে উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি মারাত্মক রোগে। জীবনযাত্রা, পরিবেশদূষণ, খাদ্য উত্পাদনে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার, তামাক ব্যবহারের কারণে এসব রোগ বাড়ছে বলে এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অজানা অনেক রোগের শঙ্কা, যা জিএমও খাদ্য প্রবর্তনের সঙ্গে আসতে পারে। এ ধরনের রোগ শনাক্ত করার বাজেট কি আছে?

স্বাস্থ্য জনবল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বেলায় যত গুরুত্ব দেয়া হয়, নার্স ও অন্যান্য সহযোগী কর্মীদের বেলায় সরকারের উদাসীনতা দেখা যায়। তাদের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট রাখলে নিশ্চয় এ সমস্যার সমাধান করা যেত।

বাজেটে অর্থ বরাদ্দ যেমন জরুরি, তেমনি অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতির মাধ্যমেও জনস্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব। বাইরে থেকে কোনো প্রকার অর্থ সাহায্য ছাড়াই উচ্চহারে করারোপ করে তামাকের মতো ক্ষতিকর পণ্য যেমন— বিড়ি, সিগারেট, সাদাপাতা, জর্দা, গুল ইত্যাদি ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে নিয়ে আসতে পারলে সেবনের হার কমবে, অতএব ক্ষতির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। কথাটি সরলীকরণ নয়, বরং বিভিন্ন দেশের গবেষণায় প্রমাণিত সত্য। এটা ঠিক, উচ্চকর বা নিম্নকর নির্ভর করে কোন পণ্যের ওপর তা আরোপ করা হয়েছে। বাজেটের পরে প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ খাদ্যদ্রব্য, নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের দাম বাড়ল কি কমল, তা নিয়ে উদ্বেগ জানায়। কিন্তু এটা আমরা দেখি না যে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের তালিকায় যেসব ক্ষতিকর পণ্য আছে, যার ওপর উচ্চ করারোপ করলে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করতে। তামাকদ্রব্য, মদ ও অন্যান্য ক্ষতিকর খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় উচ্চকরের আওতায় আনা যেতে পারে। আমি এখানে বোঝার সুবিধার জন্য ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্র থেকে কিছু উপাত্ত তুলে ধরছি। প্রথমেই বলতে হয়, মনে হয় বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বোকা ও দুর্ভাগা দেশ, যেখানে সস্তায় পেলে বিষ গিলতেও আপত্তি নেই। এবং বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে সিগারেট ও বিড়ির দাম বিশ্বের অন্য সব দেশের চেয়ে কম। সস্তা দামে ধোঁয়াযুক্ত ও ধোঁয়াবিহীন তামাকদ্রব্য সেবন করে সাময়িক আনন্দ পাওয়া যায় হয়তো, নায়ক নায়ক ভাব আনা যায়, কিন্তু যখন দেখি হূদরোগে আক্রান্ত মৃত্যুর ৩০ শতাংশ, ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ, ফুসফুসে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত মৃত্যুর ২৪ শতাংশের জন্য দায়ী ধূমপান তখন আনন্দ থাকার কথা নয়। শুধু যিনি ধূমপান করেন, তিনি একা নন, তার আশপাশে বিশেষ করে পরিবারের নারী ও শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাংলাদেশে প্রায় ৬৩ শতাংশ কর্মজীবী নারী ও পুরুষ কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন এবং তারাও একই ধরনের রোগে মারা যেতে পারেন। এছাড়া রয়েছে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য (পানের সঙ্গে জর্দা, সাদাপাতা, গুল) ব্যবহারে মুখের ক্যান্সার, নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তার গর্ভের শিশুও রেহাই পাচ্ছে না। অল্প ওজনের সন্তান প্রসব করা বা মৃত শিশুর জন্ম দিয়ে বহু নারী শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। তবুও ভালো যে জর্দা-গুল সেবন ফ্যাশনের অংশ নয়, একটু কুটিল চরিত্রের লোক দেখাতে হলেই মুখভর্তি পান-জর্দার চিত্র ভেসে ওঠে। শীতকালীন খাদ্য ফসলের চাষের ভরা মৌসুমে তামাক পাতার চাষ করা হচ্ছে, বলা যায় সরাসরি নিকোটিন উত্পাদন করা হচ্ছে অতিমাত্রায় সার-বিষ ব্যবহার করে, মাটি ও পানি দূষিত করে। তামাক পাতার নিকোটিন ক্রমে পরিচর্যাকারীর হাত, পা, মুখ ও শরীরের ভেতর প্রবেশ করে জটিল রোগ সৃষ্টি করে। একইভাবে বিড়ি ও জর্দা-গুল উত্পাদনের কারখানাগুলোকে রোগ সৃষ্টির কারখানা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। কাজেই তামাকের কারণে স্বাস্থ্যের ক্ষতি, অর্থনৈতিক ক্ষতি সবই হচ্ছে। শুধু ধূমপানজনিত অসুস্থতার কারণে জাতীয় উত্পাদনশীলতায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, তামাক সেবন বাংলাদেশের মানুষের সুস্থ থাকা এবং দেশের অগ্রগতির পথে বড় অন্তরায়।

তামাকবিরোধী নারী জোটের (তাবিনাজ) সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে গত কয়েক বছরে তামাক নিয়ন্ত্রণে যারা নিয়োজিত, তাদের সঙ্গে মিলে বাজেটে বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, সাদাপাতা, গুল ইত্যাদি দ্রব্যের ওপর উচ্চহারে করারোপের দাবি জানাচ্ছি। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, যা স্বাস্থ্য খাতে ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যাবে, অন্যদিকে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে। এ বাজেটে সুনির্দিষ্ট দাবি হচ্ছে— সিগারেটের ওপর করারোপের জন্য ব্যবহূত মূল্যস্তর প্রথা তুলে দিয়ে সব ধরনের সিগারেটে একই হারে বাড়াতে হবে, তাতে কম দামি সিগারেট বলে আলাদা কিছু যেন না থাকে। গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিতে হলে বিড়ি ও জর্দা-গুলের ওপর উচ্চহারে সুনির্দিষ্ট এক্সাইজ করারোপ করতে হবে। তামাক পাতা রফতানিতে উচ্চহারে রফতানি করারোপ করতে হবে। এটাকে চিংড়ি ও পোশাক শিল্পের মতো রফতানি পণ্য বানিয়ে বিশ্বের মানুষের রোগের কারণ সৃষ্টি করা যাবে না।

স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে ক্ষতিকর দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে হবে।

http://www.bonikbarta.com/2016-05-15/news/details/75470.html


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।