স্বাস্থ্য খাতে অ-সুস্থ্য বাজেট


বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দেখে হতাশ হয়েছেন অনেকেই, আবার অনেকেই বিষয়টি লক্ষ্যই করেন নি। অর্থনীতিবিদ রাজনীতিবিদসহ যারা বাজেট নিয়ে কথা বলছেন তাঁরাও কেউ স্বাস্থ্যকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বাজেট বক্তৃতায় এবং পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সরকারও গুরুত্ব দেয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের কেউ অর্থমন্ত্রীর পাশে বসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরও দেন নি। স্বাস্থ্যখাত এতোই অবহেলিত। এবার ২০১৮-১৯ সালে মোট বাজেটের ৫.০৩% বরাদ্দ দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। এটা গতানুগতিক একটা বরাদ্দ, যা ক্রমাগতভাবে গত ১০টি বাজেটে কমে আসছে। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫.১৬%। টাকার অংকে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ২৩,৩৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে বরাদ্দ ১৮,১৬৬ কোটি টাকা, আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যান বিভাগের জন্য রয়েছে ৫,২২৭ কোটি টাকা।

বিশাল অংকের (৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা) প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী অনেক চমক থাকলেও এই বাজেট গরিব-বান্ধব নয়, তা স্বাস্থ্য বাজেটেই প্রমাণ মিলছে। অর্থ মন্ত্রী বলেছেন “দেশের জনসাধারণের জন্য সুলভে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার কল্যাণ সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।” এই কথার প্রতিফলন বাজেটে আদৌ আছে কি? মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক কিছু মানদণ্ড আছে। এখন সারা বিশ্বে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার কথা বলা হচ্ছে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা তখনই হবে যখন সকল মানুষ প্রয়োজনীয় এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা পাবে এবং এই সেবা পেতে গিয়ে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবায় একদিকে সুস্থতা নিশ্চিত করা যায় অন্যদিকে সমতা ও মানবাধিকার অর্জন করা সম্ভব হয়। এমন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে নিজ নিজ দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতীয় আয়ের বা জিডিপির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা বাঞ্ছনীয়। তবে তাদের সুপারিশ হচ্ছে জাতীয় আয় বা জিডিপির কম পক্ষে ৫% যেন স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ তার ধারে কাছে নেই। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৯৪%, অর্থাৎ ১% এর ও কম। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্ত রাজ্যের মতো ধনি দেশে যথাক্রমে ৮.৩% এবং ৭.৬%। আফ্রিকা ও এশিয়ার কোন দেশই জিডিপির ৫% বরাদ্দ দেয় নাই, কিন্তু তারা অন্তত ১ শতাংশের ওপরে আছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ৪.২% অর্জন করেছে। থাইল্যাণ্ড ৩.২%। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে স্বাস্থ্য খাতে এই বরাদ্দ লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা পেতে হলে রোগীকে মোট খরচের ৬৭% বহন করতে হয়, যা ‘আউট-অব-পকেট’ ব্যয় হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ সম্পুর্ণ সেবা পেতে হলে রোগীকে নিজেই খরচের একটি বড় অংশ যোগাতে হয়। হিসেব করে দেখা গেছে প্রায় ৩.৩% মানুষ, (৫২ লক্ষ ৫০ হাজার) স্বাস্থ্য সেবার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর দারিদ্রের কবলে পড়ছেন। প্রায় ১৪.১% মানুষ পারিবারিক খরচের ১০ শতাংশেরও বেশি খরচ করছেন শুধু চিকিৎসার জন্যে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য সেবা বলতে মূলত চিকিৎসা খরচই বোঝায়। বাধ্য হয়ে যখন চিকিৎসা করতেই হয় সেই খরচটাই এখানে গণ্য করা হয়। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য সেবা ধরাই হয়না। তাহলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও এবং মানুষের আয় বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্যে, বা ওষুধ কেনার জন্যে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের সকল চেষ্টাই ভেস্তে যাবে স্বাস্থ্য খাত দুর্বল থাকলে। এসডিজি ৩ লক্ষ্যমাত্রা সরাসরি সু-স্বাস্থ্য ও সুখ-সমৃদ্ধি অর্জন করার কথা বলা হয়েছে। বাজেট বরাদ্দ দেখে মনে হয় না যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কোন চেষ্টা সরকারের বাজেট চিন্তায় আছে। অথচ তারা মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার জন্য মা ও শিশুর জন্যে পুষ্টি সমৃদ্ধ্ব খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা, সবার জন্য মানসম্মত সাধারণ ও বিশেষায়িত সেবা, সংক্রামক ও অ-সংক্রামক রোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত নতুন রোগ নিয়ন্ত্রণ , উন্নত ও দক্ষ ওষুধ খাত এবং দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এই বাজেটে। কিন্তু এই সব অর্জনের বাস্তব পদক্ষেপ কি হবে তার কোন বর্ণনা বাজেটে নেই। শুধু আছে ৯৭৯২ জন চিকিৎসক, ৪০০০ নার্স ও ৬০০ মিড ওয়াইফ নিয়োগের কথা। যাদের ইতিমধ্যে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেছেন কিনা কিংবা ঠিক মতো কাজ করছেন কিনা তার কোন দেখভাল নেই। নতুন নিয়োগের এই পরিকল্পনা নির্বাচনি বাজেটের অংশ নয়তো? ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) একটী অনুষ্ঠানে আগামী নির্বাচনে চিকিৎসকেরা যেন নিজ নিজ গ্রামে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন, প্রয়োজনে চিকিৎসকেরা যেন কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে যান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এমন আহ্বানও জানিয়েছেন।

বর্তমানে স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অ-সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনী রোগ, হৃদরোগসহ বিভিন্ন অ-সংক্রামক রোগ মানুষের জীবন যাপন, খাদ্য ব্যবস্থা, পরিবেশ দূষণ, মদ ও তামাক সেবনের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসের কারণে ঘটছে। মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৯% এই অ-সংক্রামক রোগের কারনে ঘটছে যার ফলে বছরে ৮ লক্ষ ৮৬ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, যার মধ্যে অনেকেই অ-কালেই ঝরে পড়ছে। একদিকে বলা হচ্ছে গড় আয়ু বেড়ে ৭০ বছর হয়েছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে খুব অল্প বয়স থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এমন কি ক্যান্সার নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন এক বিরাট জনগোষ্ঠি। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া স্বাস্থ্যের একমাত্র সুচক নয়, কত মানুষ সুস্থ জীবন যাপন করছেন তা জানাই বেশি দরকার।

তামাক সেবন কমানো একটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার কাজ। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক সনদ 'ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টব্যাকো কন্ট্রোল' (এফসিটিসি) এর স্বাক্ষরকারি দেশ হিসেবে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক সনদ এফসিটিসি’র একটি গুরুত্বপুর্ণ ধারা (আর্টিকেল ৬) হচ্ছে Price and Tax measures to reduce demand for tobacco । তামাকের ব্যবহার কমাবার জন্যে সচেতনতা সৃষ্টি, বিক্রেতা ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার পাশাপাশি এর দাম বাড়িয়ে দিয়ে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাবার চেষ্টা একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য। তাই বাজেট ঘোষণার আগে তামাক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংগঠন অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে স্মারকলিপি দেয়া, মানব বন্ধন ইত্যাদীর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক পণ্যের ওপর উচ্চ করারোপের দাবি জানান। এই একই সময়ে সিগারেট কোম্পানী ও বিড়ি কোম্পানির যাতায়াতও অর্থ মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব বোর্ডে বেড়ে যায়। দুঃখজনক হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে তামাক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংগঠনের সাথে সভায় অর্থ মন্ত্রী ও রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত কোম্পানির দাবিই টিকে যায়। যদিও এটা পরিস্কার যে কর না বাড়াবার দাবির সাথে কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত অথচ তামাক পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধির দাবির সাথে জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্ন জড়িত। তামাক অ-সংক্রামক রোগ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশে ৪৩% (২০০৯ সালের গ্যাটস এর হিসাব অনুযায়ি) বা ৪ কোটি ১৩ লক্ষ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ ধুমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন। তামাকের চাহিদা কমাতে পারলে হাজার হাজার মানুষ অনেক ঘাতক রোগ থেকে রক্ষা পাবে। তামাকজনিত ক্ষয় ক্ষতি হিসেব করলে তা জিডিপির প্রায় ৩% । এই তথ্য সরকারের জানা আছে। দুঃখ জনক হচ্ছে এবারের বাজেটও তামাক পণ্যে কর বৃদ্ধির প্রশ্নে হতাশ করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম ও সম্পুরক শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানির ব্যাসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, অন্যদিকে নিম্ন স্তরের সিগারেটে শুল্ক নামমাত্র বৃদ্ধি করা হয়েছে যা চাহিদা কমানোর ক্ষেত্রে নগন্য ভুমিকা রাখবে। সরকার তামাক কোম্পানির কাছ থেকে উচ্চ হারে রাজস্ব পান বলে যে ভ্রান্ত ধারণায় রয়েছেন তা বহু আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে নাকচ হয়ে যায়। তামাক খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায় তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে তার দ্বিগুন অর্থ ব্যয় করতে হয় (সুত্রঃ বাংলাদেশ নেটোয়ার্ক ফর এন্সিডি কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন)। ইতিমধ্যে তামাক বিরোধি সংগঠন সমূহ বিশেষ করে প্রজ্ঞা, আত্মা, আহসানিয়া মিশনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়েছে। একদিকে স্বাস্থ্য বাজেটে অ-সংক্রামক রোগ কমাবার অঙ্গীকার অন্যদিকে তামাকের ব্যবহার কমাবার জন্যে কার্যকরভাবে কর বৃদ্ধ্বি না করা স্ব-বিরোধিতা করা হচ্ছে।

কাজেই এই বাজেট অসুস্থ। স্বাস্থ্যশূন্যতাই বাজেটের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর চিকিৎসা প্রয়োজন।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।