বিটি বেগুন বা বিকৃত পোকা বেগুনের চাষ কেন


বেগুন একটি অতি পরিচিত এবং দেশ-বিদেশের সব মানুষের প্রিয় একটি সবজি। এটি নানাভাবে রান্না করে খাওয়া যায়। বাংলাদেশের কৃষির অন্যান্য ফসলের মতো এর স্থানীয় জাতের বৈচিত্র্য আছে অনেক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে আছে অন্তত ২৪৭টি, এলাকাভেদে কৃষকরা কমপক্ষে ৪০ জাতের বেগুন চাষ করেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কীটনাশকনির্ভর হাইব্রিড ও উফশী জাত প্রায় ১৯টি। বাণিজ্যিকভাবে বেগুন চাষ করতে গিয়ে উফশী ও হাইব্রিড বেগুনে ব্যাপক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এ ব্যাপারে পরিবেশবাদী এবং নিরাপদ খাদ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের পক্ষ থেকে অনেক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান না করেই এখন নতুনভাবে আসছে বিটি বেগুন। বলা হচ্ছে, বেগুনের একটি প্রধান শত্রু, ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য অতি আধুনিক প্রযুক্তি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ব্যাসিলাস থুরিনজেনেসিস (bacillus thuringenesis সংক্ষেপে বিটি) নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিস্টাল জিন বেগুনে সংযোজন করা হয়েছে। বেসিলাসের ‘বি’ এবং থুরিনজেনসিসের ‘টি’ দিয়ে নাম হয়েছে বিটি। এর ফলে গাছের ভেতরেই বিষ তৈরি হয়, যার কারণে পোকা গাছের ভেতরেই মরে যায়। তার মানে কি এই নয় যে, আমরা পোকা দমন করতে গিয়ে পোকাসহ বেগুন খাব? আগে যে পোকা বাইরে থাকত এখন সে পোকা বেগুনে মিশে গেছে, তাই বাইরে দেখা যাচ্ছে না। অভিনব বটে!

একথা বলা যাবে না যে, বিটি বেগুন আর শত শত বেগুনের জাতের মধ্যে নতুন একটি সংযোজন। এ বেগুনের চরিত্র ভিন্ন, এটা কেবল সবজি নয়, এর ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার জিন আছে, তাই সবজির সম্পূর্ণ চরিত্র এর মধ্যে থাকার কথা নয়। যারা এই কারিগরি করছেন তারাও এ ব্যাপারে সচেতন তাই একে শুধু বেগুন বলছেন না, নাম দিয়েছেন বিটি বেগুন।

অর্থাৎ বিটি বেগুন আর সত্যিকারের সবজি বেগুন এক নয়। নিরামিশভোজীরা এ বেগুন খেলে নিরামিশ খেয়েছেন দাবি করতে পারবেন না, কারণ তারা একইসঙ্গে ব্যাকটেরিয়াও খেয়েছেন। ধর্মীয়ভাবেও যারা কোনো প্রাণের আহার করেন না, তাদের জন্যও বিটি বেগুন নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিটি বেগুন কৃষকের ফসল নয়, কোম্পানির উদ্যোগে কৃষি গবেষণার ফসল। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সরকার ঘটা করে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষকের মধ্যে চাষের জন্য এই বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করছে। চারটি জেলায় (গাজীপুর, জামালপুর, রংপুর ও পাবনা) মাত্র ২০ জন কৃষকের মাঝে ২২ জানুয়ারি, ২০১৪ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে। এ আয়োজনের ঘটা থেকেই বোঝা যায়, এই বেগুন আর আমাদের স্বাভাবিক বেগুনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। পরিবেশবাদী ও কৃষক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়েছে।

কৃষিতে বিশেষ করে খাদ্য ফসলে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা বায়োটেকনোলজির ব্যবহার নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বাংলাদেশে অনেকেই এই বিতর্ক সম্পর্কে জানেন, যদিও সাধারণ মানুষের কাছে সব তথ্য হাজির করা হয়নি। বিটি বেগুন খাদ্য ফসলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শুধু নয়, এশিয়াতে প্রথম একটি জিএম ফসল। অন্য দেশে বিটি বেগুনের গবেষণার ও মাঠ পর্যায়ে চাষের অনুমতি দেয়া হয়নি, কারণ খাদ্য হিসেবে নিরাপদ কিনা এখনও জানা যায়নি। পরিবেশের জন্যও ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে উৎকণ্ঠা আছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সনদ কার্টাগেনা প্রটোকলে অনেক সতর্কতার বিধান রাখা হয়েছে। তার মধ্যে একটি অন্যতম বিধান হচ্ছে কোনো ফসলের আদি উৎপত্তি স্থলে জিএম ফসল প্রবর্তন করা যাবে না, কারণ স্থানীয় জাতে দূষণ ঘটতে পারে। বেগুনের জাতের বৈচিত্র্যের উৎপত্তিস্থলও (Origin of Diversity) এই তিন বৃহৎ নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এই অববাহিকা। ডি ক্যানডোল (১৮৮৬) অরিজিন অব কালটিভেটেড প্লান্টস (আবাদি ফসলের আদি উৎপত্তিস্থল) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, প্রচীন কাল থেকে বেগুন (সোলানাম মেলঙ্গেনা) প্রজাতি অবিভক্ত ভারতে পরিচিত। সে অর্থে বেগুন জন্মগতভাবে এশিয়া মহাদেশের একটি প্রজাতি। রুশ বিজ্ঞানী ভ্যাভিলভের (১৯২৮) মতে, বেগুনের আদি উৎপত্তিস্থল ইন্দোবার্মা অঞ্চল। আজও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন আকার-আকৃতি ও বর্ণের বেগুন পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে বেগুনের সর্বাধিক বৈচিত্র্য দেখা যায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে। আন্তর্জাতিক আইন মানলে বাংলাদেশে বিটি বেগুন যতই ভালো হোক না কেন, জিএম ফসল হিসেবে ছাড় পেতে পারে না, তবুও দেয়া হয়েছে এবং কৃষকদের হাতে বীজও তুলে দেয়া হচ্ছে। একটিবার ভেবে দেখা হচ্ছে না, যদি কোনো ক্ষতি হয় এর দায়দায়িত্ব কে নেবে!

জিএম ফসল প্রবর্তনের আগে বায়সেফটি আইন করার কথা, কিন্তু বাংলাদেশে এখনও কোনো আইন নেই, যা আছে তা হচ্ছে বায়সেফটি রুল, ২০১২। আইন না থাকার সুযোগ নিয়েই বাংলাদেশে বিটি বেগুন প্রবর্তন করা হচ্ছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিঠানে অইঝচওও প্রকল্পের মাধ্যমে এই গবেষণা করা হয়েছে। প্রযুক্তি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মন্সান্তো ও ভারতের মাহিকো কোম্পানির কাছ থেকে। এখানে বাংলাদেশের অবদান শুধু আমাদের দেশীয় জাতের বেগুন তাদের হাতে তুলে দিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার মধ্যেই। আমরা নিজেদের বেগুন এবং আমাদের কৃষককে উৎপাদক এবং মানুষকে ভোক্তা হিসেবে সহজে গিনিপিগ বানানোর সুযোগ করে দিচ্ছি মাত্র।

জিএম ফসলের ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন প্রমাণ ভূরি ভূরি আছে, যা কোম্পানির নিজস্ব গবেষণায়ও ধরা পড়েছে। জিএমও ফসল ও খাদ্যের নানা ক্ষতিকর দিক এরই মধ্যে ধনী দেশের মানুষ বুঝতে শুরু করেছে। সেখানে নানা ধরনের রোগ ধরা পড়েছে। গবেষণার ইঁদুর ও খরগোশের মধ্যেও রোগ পাওয়া গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় জিএম খাদ্যের উৎপাদন ঠেকাতে না পারলেও ভোক্তাদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ওই দেশে কৃষক নেই, কোম্পানিই উৎপাদন করে। আমাদের জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ কৃষির সঙ্গে জড়িত। তাই আমাদের দায় বেশি। ওদের দায় শুধু ভোক্তাদের ক্ষেত্রে। ভোক্তাদের দাবি অন্তত যেন চিনে কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার জন্য লেবেল লাগিয়ে দেয়া হোক। বাংলাদেশে কৃষকদের বীজ চিনে কেনার অবস্থাও নেই। যা তাদের ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে তাই তাদের নিতে হচ্ছে। বিটি বেগুনের চারা নিয়েছেন এমন একজন কৃষক বলেন, ‘স্যার বলেছেন তাই নিয়েছি।’ আর ভোক্তারা কেমন করে জানবেন বাজারে বিটি বেগুন কোনটি?

Bt

প্রহসনের বিষয় হচ্ছে, এতদিন কৃষিতে কীটনাশক ছাড়া ফলন হবে না বলে কৃষকদের কীটনাশক দেয়া হলো, আর এখন কীটনাশকের ক্ষতির কথা বলে তার চেয়েও ভয়ানক জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আমাদের অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিকে বিশাল ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নানা ধরনের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আমাদের ফেলে দেয়া হচ্ছে। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বায়োটেক কোম্পানির সরাসরি সম্পৃক্ততায় এবং অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বায়োটেক গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। এ দেশে কৃষি বিজ্ঞানের অগ্রগতি হোক সেটা সবারই কাম্য; কিন্তু যে বিজ্ঞান কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিচালিত সেখানে মানুষের কল্যাণ হতে পারে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রয়োজনে ও স্বার্থে করতে হবে। এখন পর্যন্ত যেসব বায়োটেক গবেষণা কোম্পানির সাহায্যে এবং তাদেরই নির্দেশনায় করা হয়েছে। এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার যে, বাংলাদেশে বেগুনের ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিটি বেগুন বানানো কৃষকের চাহিদার কারণে হয়নি, হয়েছে কোম্পানির প্রয়োজনে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেশের বীজ সম্পদ রক্ষা এবং দেশের প্রয়োজনে গবেষণায় নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের হাতে যে বীজ সংরক্ষণ করা আছে তা কৃষকের হাজার বছরের তৈরি করা জাত, অথচ এই জাতগুলো কারও অনুমতি ছাড়াই বিদেশি কোম্পানিকে জেনেটিক বিকৃতি ঘটানোর জন্য দেয়া হয়েছে। এটা ঘোরতর অন্যায়।

ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রিড বীজ কোম্পানি (মাহিকো) ও বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্টোর সহায়তায় বেগুনের জিন পরিবর্তনের এ কাজটি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাধ্যমে বাংলাদেশে শুরু করে। বিটি বেগুন প্রকল্পের অংশীদার বেশিরভাগ বিদেশি সংস্থা যেমন ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ফর দ্য একুইজিশান অব এগ্রবায়োটেক এপ্লিকেশন (ISAAA), ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপাইন্স, লসবেনোস (UPLB), সাউথইস্ট এশিয়ান রিজিওনাল সেন্টার ফর গ্রাজুয়েট স্টাডি অ্যান্ড রিসার্চ ইন এগ্রিকালচার (SEARCA) [ওয়েবসাইট দেখুন www.absp2.net]| । কাজেই এই গবেষণা কেবল বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের, এমন দাবি করা যাবে না।

বিটি বেগুনের গবেষণা তিনটি দেশে শুরু করলেও ভারতে ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায় এবং ফিলিপাইনে ২০১৩ সালে কোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এখন বাংলাদেশ ছাড়া উপায় কী? তাই ঠিকমতো গবেষণার ফল নিশ্চিত না হয়েই ছাড়পত্রের জন্য ২০১৩ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে কৃষক পর্যায়ে চাষ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) আবেদন করে। জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসল ছাড় দেয়ার কমিটি National Committee on Crop Biotechnology (NTCCB) সভা করেছেন ৭ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে। NTCCB বিটি বেগুনের ল্যাবরেটরি টেস্ট প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদফতরকে পাঠায়। তবে এ কমিটিও ছাড়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য দেয়নি বলে পরিবেশ অধিদফতর সূত্র থেকে জানা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে পরিবেশ অধিদফতর কর্তৃক গঠিত বায়োসেফটি কোর কমিটির কাছে প্রদান করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে ২৩ অক্টোবর মতামত-প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। মাত্র তিন দিন, অথচ সময় দেয়ার কথা ৯০ দিন। শেষে ন্যাশনাল কমিটি অন বায়ো সেফটি (The National Committee on Biosafety, NCB) চারটি বিটি বেগুনের ছাড় দিয়েছে। এই চারটি স্থানীয় জাতের বেগুন উত্তরা, কাজলা, নয়নতারা এবং একটি ঈশ্বরদী স্থানীয় জাতকে বিটি বেগুন ১, ২, ৩ এবং ৪ নামে ছাড়া হয়েছে। সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ‘শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন’ প্রদান করেছে ৩০ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে। [http://bari.gov.bd/home/latest_news] সাতটি শর্তযুক্ত (যার অধিকাংশই মেনে চলা বারি এবং কৃষকদের পক্ষে সম্ভব নয়), ছাড়পত্র দিয়ে প্রমাণ করা হচ্ছে তারা ক্ষতির দায়িত্ব নিতে রাজি নন। কিন্তু তাহলে কার এমন তাড়া লেগেছে যে, এখনই ছাড় দিতে হবে? বোঝাই যাচ্ছে, যারা এই অনুমোদন দিয়েছেন তারা নিজেরাই নিশ্চিত নন যে, এই বেগুন আসলেই নিরাপদ। অথচ এই কথা পরিবেশবাদী ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠনগুলো এতদিন ধরে দাবি জানিয়েছিলেন মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় জাতের বেগুনের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে কিনা নিশ্চিত না হয়ে যেন অনুমোদন না দেয়া হয়। কিন্তু সে কথার কোনো গুরুত্ব সরকার দেননি। এমনকি বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এসব কিছুই উপেক্ষা করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জানুয়ারি মাসেই চারটি বেগুনের চারা বিতরণ করে দেয়া হয়েছে চাষের জন্য।

বিটি বেগুন স্থানীয় জাতের বেগুনের ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করা। অথচ স্থানীয় জাতের বেগুনে পোকার আক্রমণ তেমন তীব্র হয় না এবং কীটনাশকও দিতে হয় না, এসব বেগুনের মনোকালচার বা একাট্টা চাষও হয় না। স্থানীয় জাতের বেগুনের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও রয়েছে। যেসব স্থানীয় জাতের বেগুন নিয়ে বিটি করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে এই পোকার আক্রমণ তেমন তীব্র নয়। বারির নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জাতের বেগুনে পোকার আক্রমণ খুব কম হয়। যেমন ঝুমকি বেগুনে পোকা খুবই কম লাগে, মাত্র ১ থেকে ১০ ভাগ (Highly Resistant)  খটখটিয়াও মোটামুটি কম লাগে, ২০ ভাগ (Fairly Resistant)। কিছু বেগুন যেমন ইসলামপুরী ২১-৩০ ভাগ পোকার সম্ভাবনা আছে (Tolerant) এবং ইরি বেগুন একটু বেশি লাগে ৪১ শতাংশের বেশি। রোগ নিরাময় যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে হাইব্রিড বেগুনে কেন বিটি করা হলো না? তাছাড়া বেগুনে শুধু এক ধরনের পোকার আক্রমণ হয় না, আরও অনেক ধরনের পোকা বা রোগবালাই হয়। যদিও ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিটি করার কারণে শুধু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হয়তো বন্ধ করা যাবে, অন্য রোগবালাইয়ের আক্রমণ ঠিকই থাকবে। অথচ এসব পোকার ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management) বা আইপিএম পদ্ধতিতে রোধ করা সম্ভব এবং এতে কোনো প্রকার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি নেই। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান কীটতত্ত্ববিদ যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড এন্ডো প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিতে জানিয়েছেন যে, আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। আইপিএম এরই মধ্যে কৃষক পর্যায়ে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। তাহলে সরকারের কৃষকের প্রতি দরদ থাকলে উচিত ছিল সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া। তাছাড়া বিটি প্রযুক্তি ব্যবহারের কীট প্রতিরোধক হয়ে উঠতে পারে, যা বিপজ্জনক। তাহলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তার জন্য নিশ্চয়ই আমাদের বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত নন। মনে রাখতে হবে, ফসলের জীবন্ত প্রাণে (বীজ) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হচ্ছে। এই সক্রিয় নিজের মতো করে আরও কী পরিবর্তন ঘটাবে তা বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। সে কারও চাকরি করে না যে, নির্দেশ মতো শুধু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা মেরেই চুপ করে বসে থাকবে।

বারির বিজ্ঞানীরা কোনো ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির গবেষণা ছাড়াই ঘোষণা দিচ্ছেন যে, মানবদেহে কোনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না। অথচ উন্নত বিশ্বে (নিউজিল্যান্ড) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের যকৃতের ক্ষতিসাধন করতে পারে। বিজ্ঞানীদের স্বাধীন গবেষণায় দেখা গেছে, বিটি বেগুন মানুষের খাদ্য হিসেবে মোটেও উপযুক্ত নয়। ফরাসি  বিজ্ঞানী Professor Gilles-Eric Seralini বিটি বেগুন নিয়ে বিভিন্ন প্রাণী গবেষণা করে দেখেছেন যে, বিটি বেগুন সবজির মধ্যে এমন প্রোটিন তৈরি করে যা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক অর্থাৎ এন্টিবায়োটিকে কোনো কাজ করবে না। ক্যালোরির দিক থেকেও বিটি বেগুনে ১৫ শতাংশ কম ক্যলোরি পাওয়া গেছে। তাছাড়া লিভারের সমস্যা এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যাও দেখা গেছে। সেরালিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিটি বেগুনের উন্মুক্ত চাষের কারণে প্রজাপতি ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষতি হবে না, এমন কোনো গবেষণা করা হয়নি এবং বিশেষ করে সাধারণ বেগুনের জাতের ওপর পরিবেশ দূষণ ঘটতে পারে। বিটি টক্সিন soil bacterium Bacillus thuringenesis থেকে নেয়া হয়েছে, কিন্তু এই বিটি টক্সিন স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। জিএম সবজিতে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক মার্কার থাকে। তার মানে মানুষ এই সবজি খেলে তার শরীরে এন্টিবায়োটিক কাজ করবে না, অথচ যে কোনো ইনফেকশন হলে এন্টিবায়োটিক নেয়ার প্রয়োজন মানুষের থাকতে পারে। প্রাণীদেহে অজানা, অনাকাক্সিক্ষত চরিত্র সৃষ্টি হতে পারে। এলার্জি হতে পারে।

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই কি সরকার এর চাষ করবে! এবং আমরা তা খাব?


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।