হাইব্রিড ধানের ব্যবসা


লাল সবুজ একাকার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-৪৫) পৃথিবী দুই শিবিরে বিভক্ত হয়। একদিকে মিত্রশক্তি (Allied Power) -- প্রধান অংশীদার গ্রেটবৃটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তাদের সহযোগী দেশ ও উপনিবেশ।অন্যদিকে চক্র শক্তি (Axis Power)| গুরুত্বপূর্ণ শক্তি জার্মানী, ইটালী, জাপান ও তাদের সহযোগী দেশ সমূহ। যুদ্ধে মিত্র শক্তি বিজয়ী হয়। বিজয়ের ফলাফল ভাগাভাগিতে মিত্রশক্তির মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। মতানৈক্য থেকে শুরু হয় ঠান্ডা লড়াই (Cold war)| ঠান্ডা লড়াইতে পৃথিবী আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়। একদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার সমর্থক গ্রেট-ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং সমমনা দেশ সমূহ। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং সমমনা অন্যান্য দেশসমূহ, যাদের মূলনীতি হচ্ছে সমাজতন্ত্র। এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব-ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকার গরিব দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের জোয়ার বইতে শুরু করে। দিকে দিকে লাল পতাকার প্রসার ঘটতে থাকে। তখন পুঁজিবাদী শক্তি এ লাল পতাকার গতিরোধ করার জন্য সবুজ বিপ্লবের নীল নক্‌শা তৈয়ার করে।

ফোর্ড এবং রকফেলার ফাউন্ডেশন এর অর্থানুকুল্যে কনসালটেটিভ গ্রুপ অব ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারসহ আরো বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জন্ম লাভ করে। ধান গবেষণার জন্য ফিলিপাইনে ইরি এবং গম ও ভুট্টা গবেষণার জন্য অন্যদিকে মেক্সিকোতে সিমিট প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইরির মাধ্যমে ধানের অনেকগুলি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবিত হয়। একই ভাবে সিমিট থেকে অনেকগুলো উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবিত হয়। ভুট্টার অনেকগুলি হাইব্রিডও ছাড় করা হয়। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরেও জো্রদার কৃষি গবেষণা চলতে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বের হাইব্রিড ভুট্টার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে চীনা বিজ্ঞানীরা ধানের হাইব্রিড উদ্ভাবনের চ্যালেঞ্জিং গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, ভুট্টা একটি পর-পরাগায়িত ফসল। হাইব্রিড ভুট্টা উৎপাদন অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ। পক্ষান্তরে ধান একটি স্বপরাগায়িত ফসল। চীনাদের আগে ধানের হাইব্রিড উৎপাদনের কথা কেউ চিন্তাই করেনি। ১৯৭০ সালে চীনা বিজ্ঞানীরা একাজে হাত দেন এবং মাত্র চার বছরের মাথায় হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেন।

চিনাদের কাণ্ড! হাইব্রীড ধানের ব্যবসা প্রসারের জন্য নানান দেশ থেকে থেকে বিজ্ঞানী ও নীতি নির্ধারকদের ধরে এনে হাইব্রিড ধানের মাঠ দেখাচ্ছে।

এ সাফল্যের পেছনে প্রফেসর ইউয়ান লং পিং এর অবদান সবচাইতে উল্লেখযোগ্য। ইতোমধ্যে হাইব্রিড ধান উৎপাদনের দুটি পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়:

ক. সাইটোপ্লাজমীয় কৌলিক বন্ধাত্ব বা তিন লাইন পদ্ধতি।

খ. পরিবেশগত কৌলিক বন্ধাত্ব বা দু’লাইন পদ্ধতি।

ক. সাইটোপ্লাজমীয় কৌলিক বন্ধাত্ব:

ধানে হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করতে সাইটোপ্লাজমীয় কৌলিক পুংবন্ধ্যাত্ব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ কাজে তিনটি লাইন ব্যবহার করতে হয়। যেমন:

(১) সাইটোপ্লাজমীয় কৌলিক পুংবন্ধ্যাত্ব লাইন (এ লাইন)

(২) পুংবন্ধ্যাত্ব সংরক্ষণকারী লাইন (বি লাইন)(৩) উর্বরতা পুনস্থাপক লাইন (আর লাইন)

খ. পরিবেশগত কৌলিক বন্ধাত্ব বা দু’লাইন পদ্ধতি:

(১) দিবস দৈর্ঘ্য বা আলোক সংবেদী কৌলিক পুংবন্ধ্যাত্ব বা পিজিএমএস লাইন

(২) তাপমাত্রা সংবেদী কৌলিক পুংবন্ধা বা টিজিএমএস লাইন

দিবস দৈর্ঘ্য বা তাপমাত্রা কাজে লাগিয়ে পুংবন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে ধানের হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করা হয়। তিন লাইন বা পিজিএমএস পদ্ধতির চাইতে-দুই লাইন পদ্ধতিতে সহজে ধানের হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করা যায়।

সাম্পতিক কালে চীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাইব্রিড ধান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে দু:খজনক বিষয় হচ্ছে পুঁজিবাদ মোকাবেলা করার জন্য যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তা এখন পুঁজিবাদের সম্পদ হয়েছে। বুঝার উপায় নাই যে চীনের হাইব্রিড ধানের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম চীনের প্রাইভেট কোম্পানীর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। তা কেবল একটি মাত্র কোম্পানী-

এলপিএইচটির দ্বারা পরিচালিত হয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বছরের পর বছর সরকারী সহায়তায় গড়ে ওঠা হাইব্রিড রাইচ এখন একটি কোম্পানীর সম্পদ। এখন এ কোম্পানীর ২৬টি অঙ্গ সংগঠন রয়েছে। এলপিএইচটি সেনজেন ষ্টক একচেঞ্জের তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানী। অন্যদিকে বিশ্বের চতুর্থতম বৃহৎ বীজ কোম্পানী ভিলমোরিন। যার প্রধান কার্যালয় ফ্রান্সে। ভিলমোরিন এখন এলপিএইচটির অধিকাংশ শেয়ারের মালিক।

ভাবতে কষ্ট হয় পুঁজিবাদ ঠেকানোর জন্য গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের প্রথম দিকে চীনে যে হাইব্রিড ধান গবেষণা শুরু হয়েছিল তা আজ পুঁজিবাদের হাতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে ক্ষুদ্র কৃষককে শোষণ করছে।

রকফেলার ও ফোর্ড ফাউনডেশানের সহায়তায় ডক্টর বরলগ উচ্চ ফলনশীল গম ও ধান নিয়ে গবেষেণা করেছিলেন। তাঁকে এখানে দেখা যাচ্ছে ২০০২ সালে শান্তি পুরস্কার পাওয়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে। আর আছেন মিস্টার জন রুয়ান। বাংলাদেশের জনগনের দিক থেকে এই ছবির গুরুত্ব হচ্ছে ছবিটি তোলা হয়েছে ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যের দ্য মইনে শহরে। সেই বছর গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ডক্টর ইউনুসকে বিশ্ব খাদ্য পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। খাদ্যে কী তাঁর অবদান বাংলা দেশের মানুষকে মাথা খাটিয়ে বের করতে হবে।

পুঁজিবাদ ও মুক্ত বাজারের ধাক্কায় লাল-সবুজ একাকার হয়ে গেছে। বাদ বিবাদ চলছে-চলবে।তবে এ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবার সুযোগ কম। সরেজমিনে এ ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া দেখেও চক্ষু বন্ধ করে থাকলে এ পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। অধিক ফলনের নেশায় কাঁচামরিচ, বেগুন, শশা, মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা ও ধানের মতো সব ফসলের হাইব্রিড বীজে বাজার সয়লাব।

চকচকে ল্যামো ফয়েল প্যাকেটের মধ্যে এ সব বীজ এখন হাটে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তবে অধিকাংশ বীজের মূল উৎস দেশের বাহিরে। এক কথায় ঘরের চাবি পরের কাছে। বীজের জন্য কৃষক এখন অন্যের উপরে নির্ভরশীল। বোঝার উপর শাকের আটির মতো ইদানিংকালে আবার জিএমওর কথা শোনা যাচ্ছে। বেগুনের জিএমও বাংলাদেশে প্রবর্তনের পায়তারা চলছে এই মূহুর্তে। আরও অনেক ফসল আছে জিএমওর তালিকায়। কিন্তু উচ্চফলনশীল জাত এবং হাইব্রিড প্রবর্তনের পূর্বে প্রতিটি ফসলের বহু স্থানীয় জাত ছিল। সে সব জাত ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে অথবা চিরতরে হারিয়ে যাবার অপেক্ষায় আছে। এসব স্থানীয় জাতের মধ্যে অফুরন্ত প্রাণবৈচিত্র্য ছিল। পরিবেশ প্রতিকুলতায় টিকে থাকার মতো সঞ্জীবনী শক্তিও ছিল।

তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং কৃষকের হাতে এখনও যে সব প্রাণসম্পদ অবশিষ্ট আছে তা রক্ষা করার জন্য এখনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।


ডক্টর এম এ সোবহান বীজ বিস্তার ফাউনডেশানের চেয়ারপারসন।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।