Search  Phonetic Unijoy  English 

ফরিদা আখতার


Wednesday 17 June 15



print

বিশাল অঙ্কের বাজেট (২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা) ঘোষণা হয়েছে ৪ জুন। পরদিন ছিল ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। তার পরের দিন আসবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। আগে-পরে বড় বড় ঘটনা থাকায় বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি সরকারিভাবে ঠিকমতো পালন করা হলো না। তবুও ৫ জুন বিভিন্ন সংগঠন মোদির সফরের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেসব পরিবেশ ধ্বংসকারী চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে তার বিরুদ্ধে সভাসমাবেশ করেছে। তারা দাবি করেছে সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার জন্য। পরিবেশবাদীরা দাবি করেছিলেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করবেন। এটাই ছিল এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল ঘটনা। কিন্তু সবার আশার গুড়ে বালি দিয়ে ২২টি চুক্তি সই হয়েছে, যার মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে। সুখবরই বটে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী এলেন ৬ তারিখে, গেলেন ৭ তারিখে, এ সফরের খবর এবং বিশ্লেষণ এখনও চলছে তো চলছেই। থামার কোনো লক্ষণ নেই। এর মধ্যে বাজেটের ব্যাপারে আলোচনা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। তাছাড়া সরকারের বৈধতার সমস্যা যেহেতু এখনও কাটেনি, বাজেটের প্রতিক্রিয়া দিতে অনেকেই খুব উৎসাহ বোধ করছেন না। বিশ্বব্যাংক একটু বিলম্বে প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেছে প্রস্তাবিত বাজেটের যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। শুধু তাই নয়, বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক চার ধরনের ঝুঁকির কথাও চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে গার্মেন্ট খাতে শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য। রোজার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা সব সময় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখি। মানুষের মৌলিক চাহিদার দিকগুলো বাজেটে কেমন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটা দেখা খুব জরুরি। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি খাতগুলোর প্রতি জনগণের আগ্রহ বাড়ে। আবার বাজেট ঘোষণার সঙ্গেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়া ও কমার যে রেওয়াজ আছে, তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বেশকিছু জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বুঝেও বেড়েছে, না বুঝেও বেড়েছে। কিন্তু কর আরোপের মাধ্যমে যেসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোগ কমানোর দাবি উঠেছিল, যেমন- বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি তার দাম তেমন বাড়েনি। এতে আমরা হতাশ হয়েছি। অর্থমন্ত্রীর কাছে নানাভাবে দাবি জানানো সত্ত্বেও যেভাবে নামকাওয়াস্তে কর বাড়ানো হয়েছে তাতে সামান্য দাম বৃদ্ধির কারণে ভোক্তার সংখ্যা কমবে না, কোম্পানির আয় বাড়বে। অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, তামাক কোম্পানিগুলো সবচেয়ে কম কর প্রদান করে অথচ সবচেয়ে বেশি জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এ কথা বুঝেও তিনি ভোগ কমানো যায় এমন হারে কর বাড়ালেন না! তামাক সেবনের ফলে অসংক্রামক রোগের পরিমাণ বাড়ছে এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। অসংক্রামক রোগের যে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে তামাক সেবন তার মধ্যে অন্যতম। কাজেই তামাকজাত দ্রব্যকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে নয়, রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে আইন অনুযায়ী তার নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হিসেবে বাজেটে যথেষ্ট পরিমাণ কর বাড়ানো সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। দুঃখজনক হচ্ছে, বাজেটের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যালয়ে তামাক কোম্পানির যাতায়াত যেভাবে বৃদ্ধি পায় তাতে বাজেটে কর বৃদ্ধির এ হাল দেখে আর আশ্চর্য হতে পারছি না।

তবুও দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য খাতে সরকার আসলে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছে। এত বিশাল বাজেটের মধ্যে মাত্র ৪.৩ শতাংশ জুটেছে স্বাস্থ্য খাতে, যদিও টাকার অঙ্কে ১২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছর (২০১৪-১৫) এ খাতে সংশোধিত বাজেট ছিল ১১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ যুক্তি উঠবে আপত্তির কী আছে, প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা তো বেড়েছে।

এখন দেখা যাক এ টাকা (ধরে নিলাম একটি বড় অঙ্কের টাকা) সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার মতো করে বরাদ্দ হয়েছে কিনা। কারণ মোট টাকাই বড় কথা নয়। এ টাকা কীসে খরচ হবে, তা জানা জরুরি। বাজেট বক্তৃতার ৮৬ থেকে ৯০ পর্যন্ত প্যারাগ্রাফে কমিউনিটি ক্লিনিক, টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ওয়ার্ড পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। এখানে সব সময় যেন স্বাস্থ্যকর্মী থাকতে পারেন এবং সেখানে যেন প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হয়, সে ব্যবস্থাই কমিউনিটি ক্লিনিককে কার্যকর করে তুলবে। কিন্তু সেটা না দিয়ে বাজেটে ‘মিনি ল্যাপটপ হবে ডিজিটাল ডাক্তার’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ১৩ হাজার ৮৬১টি মিনি ল্যাপটপ প্রদানের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। কে চালাবে এ ল্যাপটপ? কী কাজে লাগবে? দাবি করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণ টেলিমেডিসিন সেবা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য ও স্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগ পাবেন। একজন গরিব দিনমজুরের কথা ভাবুন। তার কাছে কি এ সেবা যাবে? টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ হচ্ছে ৬৪ জেলা এবং ৪১৮টি উপজেলা হাসপাতালে, যেখানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা অফিসগুলোতে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। গরিব, দুস্থ ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম ৭৩টি উপজেলায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৩২টি উপজেলায় জরুরি প্রসূতি সেবা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য আধুনিকায়ন কীভাবে করা হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা বাজেটে নেই। আধুনিক করার যে বুলি স্বাস্থ্য বাজেটে রয়েছে, তা না দিয়ে প্রকৃত সেবার কথা ও বরাদ্দ থাকলেই জনগণ বেশি উপকৃত হতো।

এরই মধ্যে বাপাসহ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য সাংবাদিক ফোরামের পক্ষ থেকে যে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে তাতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, প্রতি বছর মোট বাজেটের পরিমাণ বাড়ছে; কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ থেকে নেমে গিয়ে এখন ০.৭৩ শতাংশ হয়েছে আর মোট বাজেটের ৬ শতাংশ থেকে বছরে বছরে কমেছে এবং এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৩ শতাংশে। এ থেকে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য খাত সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১০ জুন অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। সেটা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জনপ্রতি বার্ষিক স্বাস্থ্যসেবা বাবদ প্রয়োজন ৫৪ ডলার। বাংলাদেশের খরচ হচ্ছে ২৮ ডলার, সরকারের অবদান মাত্র ৯ ডলার। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থাকলেও জনগণের পকেট থেকে টাকা যাচ্ছে। তবুও জনগণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবাই নিতে চায় এবং সেটা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু জনগণের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে যখন সরকারের সেবার অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করছে মুনাফাবাজ স্বাস্থ্য সেবাদানকারী সংস্থা। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণ করছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিদেশের হাসপাতালগুলো। সেদিকেও সরকারের নজর নেই। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো কারও তোয়াক্কা করে না, তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ‘বিল’ করে আর রোগীকে তাই দিতে হয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত দুর্বল হলে মানুষের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। গরিব মানুষ আরও গরিব হবে চিকিৎসা ব্যয় করতে গিয়ে। গরু-ছাগল, জমিজমা বিক্রি এগুলো পুরনো ব্যাপার। এ ধারা অব্যাহত রেখে দারিদ্র্যবিমোচনের কথা বলা স্ববিরোধিতা।

টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা বা ল্যাপটপ দেয়া- এগুলো অন্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। মোবাইল ফোনে রোগী না দেখেই ওষুধ- এতে মোবাইল ফোন কোম্পানি ও ওষুধ কোম্পানির পকেট ফুলে ঢোল হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে এর কার্যকারিতা কতখানি হবে, বাজেটে বরাদ্দ দেয়ার আগে কোনো গবেষণা বা মতবিনিময় হয়েছে কিনা, আমাদের জানা নেই। এত ল্যাপটপ আদৌ কোনো কাজে আসবে কিনা তার কোনো প্রাক-বিবেচনা করা হয়নি। সবকিছু প্রযুক্তি দিয়ে হয় না। এখনও জ্বর এলে মাথায় একটু হাত দিয়ে দেখতে হয়, থার্মোমিটারে কতটুকু জ্বর মাপা হলো তাকে সেবা বলে না।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ : উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’। বেশ কাব্যিক। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন- কার সমৃদ্ধির সোপানের পথ রচনা করছে এ বাজেট? সাধারণ মানুষের নিশ্চয়ই নয়।


Related Articles


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Comments Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : বাজেট, প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, ওষুধ, স্বাস্থ্য খাত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুল, গার্মেন্ট, শ্রমিক ,

View: 1712 Bookmark and Share


Home
EMAIL
PASSWORD