একটি মামলা এবং সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন sdf
ফরিদা আখতার || Sunday 26 April 2026 ||
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ইতোমধ্যে প্রথম অধিবেশনও চলমান; ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। সংরক্ষিত ৫০টি আসন নিয়ে নির্বাচনের গুঞ্জন শোনা গেলেও এখনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য আসন নিয়ে তদবির থেমে নেই। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন করতে চায়।
এদিকে এখন সংসদের অধিবেশন টেলিভিশনে দেখলে প্রায় নারীশূন্য মনে হয়। সরকারদলীয় সদস্যদের দিকে মাত্র ছয়জন নির্বাচিত নারী আছেন। তারা হলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ কামাল, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল এবং স্বতন্ত্র সদস্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। আর বিরোধী দলের দিক সম্পূর্ণ নারীশূন্য!
জানি সবাই বলবেন, কিছুদিনের মধ্যেই সংসদে নানা রঙের পোশাকে ৫০ জন নারীকে দেখা যাবে। তখন চোখ ভরে দেখে নিতে পারবেন। হ্যাঁ পারব, কিন্তু তারা কারা? নারী সংগঠনগুলোর দাবি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাধারণ আসনে ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়া হয়নি; এবং নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, এটি তাদের চরম ব্যর্থতা। এখন সংসদে আসন সংখ্যার অনুপাতে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মনোনীত ৫০ জন নারী এ আসনগুলো পাবেন। প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বিএনপি ৩৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১১টি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে। জোটের অংশীদার হিসেবে এনসিপির ভাগে কয়টি জুটবে বলা যাচ্ছে না; বাকি আসন পেতে পারেন স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য প্রার্থী।
এই যে আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের নিয়ম, এর পেছনে একটি মামলার কাহিনি আছে। তার আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল একাই সব আসনে মনোনয়ন দিত। বোনাস! কিন্তু ১৯৮৭ সাল থেকে ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ এই অবমাননাকর নারী আসনের বিরোধিতা করে দাবি করেছিল নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত সদস্য দ্বারা মনোনয়ন নয়, সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। পরবর্তীকালে সম্মিলিত নারী সমাজ এই আন্দোলন এগিয়ে নেয়। রাজপথে মিছিল-মিটিং করে দাবি করা ছাড়াও শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থে মামলা (রিট পিটিশন) করতে হয়েছিল। এই মামলার নাম ‘ফরিদা আখতার অ্যান্ড আদারস ভার্সেস বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেড বাই দ্য সেক্রেটারি কেবিনেট ডিভিশন, বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট অ্যান্ড আদারস’।
বলা বাহুল্য, মামলাটির বাদী আমি একা ছিলাম না, সম্মিলিত নারী সমাজের কয়েকজন নেত্রীও ছিলেন। সম্মিলিত নারী সমাজের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট এম জহির এবং অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা। আমরা চেয়েছিলাম নারীর মর্যাদা রক্ষায় এই আসনগুলো সরাসরি নির্বাচিত হওয়া দরকার।
অবাক করার বিষয়, মোট তিনটি মামলার রায় হয়েছিল ২০০৫ সালের ১৯ জুলাই। আদালতের অবকাশকালীন ছুটি চলছিল তখন। সংসদে ৪৫টি সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থাসংবলিত সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর অংশবিশেষ এবং এসব আসনে নির্বাচনের জন্য প্রণীত আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা তিনটি রিট মামলা হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ রায়ের মাধ্যমে এই আইনের আওতায় সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনের প্রহসন বা ‘মনোনয়ন’ বৈধ হয়ে গেল। রিট পিটিশন খারিজ হলেও সংবিধানের ৬৫ (৩) ধারায় বলা হলো যে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের আনুপাতিক হারে তারা নারী আসনে মনোনয়ন দিতে পারবেন।
রায়ে বলা হয়েছিল, ‘২০০৪ সালের সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধনী) আইন কার্যকর হওয়ার সময় বিদ্যমান সংসদের পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনের তারিখ থেকে শুরু করে দশ বছরের মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে না যাওয়া পর্যন্ত, শুধু মহিলা সদস্যদের জন্য ৪৫টি আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তারা উক্ত সদস্যদের দ্বারা আইন অনুসারে সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। তবে শর্ত থাকে যে, এই ধারার কোনো কিছুই কোনো মহিলাকে এই অনুচ্ছেদের ধারায় উল্লিখিত কোনো আসনে নির্বাচিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে বলে গণ্য হবে না।’
সেই সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি এবং জোটভুক্ত সংগঠন, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ যার যার ভাগে প্রাপ্ত আসনগুলোতে নারীদের ভাগবাটোয়ারা পদ্ধতিতে সংসদে নিয়ে বসাতে পেরেছিলেন। খুবই খুশির কথা।
যেদিন হাইকোর্টে রায় দেওয়া হবে, সেদিন মামলার বাদী হিসেবে আমরা যারা খবর পেয়েছিলাম, হাইকোর্টে ছুটে গিয়েছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল না ছুটির অবকাশে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা হবে। অনেকেই জানতেও পারেননি; কেউ কেউ ঢাকা শহরেও ছিলেন না। কোর্ট ছিল কার্যত ফাঁকা; অন্য সময়ের গমগম পরিবেশ ছিল না। অবাক হয়েছিলাম এটি দেখে যে ক্ষমতাসীন বিএনপির বেশ কিছু নারী আইনজীবী এবং সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী রাজনৈতিক নেত্রীদের বেশ কয়েকজন উপস্থিত হয়েছিলেন। অথচ তাদের অনেককেই আগের তিন মাস ধরে মামলার শুনানির সময় দেখা যায়নি!
মামলার শুনানিকালে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন এ কথা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে সংবিধানের এই সংশোধনী এবং তার সঙ্গে প্রণীত আইনটি নানাভাবে নারীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে। কারণ সংসদে আসন পাওয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে কোনো নারীর পক্ষে সংরক্ষিত আসনে যাওয়া সম্ভব হবে না। রায়ের পর আমরা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলাম, যদি সংসদে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়, তা নারীর স্বার্থেই ব্যবহার করতে হবে। কেবল রাজনৈতিক দলের নারীর জন্য উন্মুক্ত রাখলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কখনোই হবে না। এভাবে রাজনৈতিক দলগুলো সহজেই নারী আসনে তাদের নারী কর্মীদের বসাতে পারলে সাধারণ আসনে কখনোই মনোনয়ন দেওয়ার কথা ভাববে না।
বাস্তবে আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। ২০২৬ সালে এসেও আমরা দেখছি নারীকে সাধারণ আসনে মনোনয়নে কোনো দল আগ্রহী নয়। এভাবে নারীরা রাজনৈতিক দলে এবং রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নারী অধিকারের পক্ষে কাজ করেও সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারছেন না।
ওই রায়ের পর ২০ বছর পার হয়েছে; ওয়ান-ইলেভেন সরকারের দুই বছর কেটেছে সংবিধান স্থগিত অবস্থায়; ২০০৯ থেকে যাও ছিল, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদে কার্যকর বিরোধী দল ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যবস্থা ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদেও নারীর প্রতি অবমাননাকর এ পদ্ধতি চলতে পারে না।
বর্তমানে দুই ধরনের মত আছে। এক. নারীর জন্য এই আসনগুলো বিলোপ করা হোক; কারণ এই আসনগুলো যেভাবে নির্বাচিত হয়, তা নারীর জন্য মর্যাদাকর নয়, নারীর স্বার্থও রক্ষা হয় না। দুই. এই আসন যদি রাখতেই হয়, তবে সরাসরি নির্বাচন হতে হবে। নারী কমিশন সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১০০-তে বাড়ানো এবং সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই দুই মতের মধ্যে নারী সংগঠনগুলো দ্বিতীয়টি বেশি চায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নির্বিকার। তাহলে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ শাসনই চলবে?
কার্যকর গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনে সীমাবদ্ধ নয়; অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নারীর সমান অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। তাই সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান মনোনয়নভিত্তিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি–এটি শুধু নারীর অধিকার নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার অপরিহার্য শর্ত।
ফরিদা আখতার: নারী অধিকার নেত্রী; সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা
বিশেষ দ্রষ্টব্য
সমকাল পত্রিকায় প্রকাশীত, ২৮ মার্চ ২০২৬ একটি মামলা এবং সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন