হাওরের বোরো ধান ও মৎস্যসম্পদ: প্রাকৃতিক নয়, মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ
ফরিদা আখতার || Wednesday 13 May 2026 ||
বর্তমানে সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি হাওরের দিকে। কারণ সেখানে আগাম বৃষ্টিতে বোরো ধানে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে। বাংলাদেশের প্রধান কৃষি ফসল ধানের মৌসুম তিনটি হলেও বোরো মৌসুমকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, কারণ বোরো ধান মোট ধান উৎপাদনের ৫৫-৬০% সরবরাহ করে। অথচ একসময় আমনই ধানের প্রধান মৌসুম ছিল। এখন আমন ধানের গুরুত্ব কমে গেছে, তবুও আমন ধানের মাধ্যমে আসে ৩৮-৪০%, আর আউশ ধান সরবরাহ করে ৬-৮%। ধানের মৌসুম অনুযায়ী উৎপাদনের এই তারতম্য প্রাকৃতিক নয়। এর পেছনে রয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে কৃষিসংক্রান্ত সরকারের নীতি এবং সে অনুযায়ী সুবিধা প্রদানের বিষয়। বিশেষ করে আধুনিক কৃষির প্রবর্তন করে ব্রি-ধানের জাতের উৎপাদন যা মূলতঃ সেচ নির্ভর, সাথে আছে সার-কীটনাশকের ব্যবহার। বীজের ধরণ হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড। ধান বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন বোরো মৌসুমে ধানগাছ প্রচুর সূর্যকিরণ পায়, সার বেশি গ্রহণ করে অথচ গাছ ও পাতা হেলে পড়ে না, ফলবান কুশি বেশি হয় এবং অধিক ফলন পাওয়া যায়। ফলে এই ধান উৎপাদনেই সকল প্রকার সহায়তা দিতে হবে। বলাবাহুল্য এই সহায়তার অর্থ হচ্ছে সেচের ব্যবস্থা করা, সার কীটনাশক এবং কৃষি কাজের যন্ত্র সরবরাহ করা। এসবে ভর্তুকি ও দেয়া হচ্ছে হাজার কোটি টাকার। যা কৃষক নয় পাচ্ছে সার-কীটনাশক ও যন্ত্রের কোম্পানি। আজ সেই রকম একটি অবস্থায় দাঁড়িয়ে হাওরের বোরো ধানের বিপর্যয় নিয়ে আমাদের পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। এবারের আগাম ও অতিবৃষ্টিতে পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী (ডেইলি স্টার ৮ মে, ২০২৬) ৪৯,০৭৩ হেক্টর বা ১১% জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে, নষ্ট হওয়া ধানের পরিমাণ প্রায় ২ লক্ষ ১৩ হাজার টন। টাকার অংকে ১০৪৭ কোটি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২৩৬,০০০। বলাবাহুল্য, বোরো ধানের জন্য এই ঘটনা দেশের সার্বিক খাদ্য পরিস্থিতির জন্যও খুব উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে বোরো ধান চাষ হলেও হাওরের একটি মাত্র ফসল হিশাবে বোরো ধান খুব গুরুত্বপূর্ণ। হাওর এলাকা সবসময়ই বোরো ধানের জন্যে খুব পরিচিত ছিল তবে সে ধান ছিল স্থানীয় জাতের। এই ধান উৎপাদনে কোনো সেচের দরকার হোত না। হাওরের শুকনো মৌসুমে নীচু ভূমিতে যে পানি থাকে সেখানেই ধান হোত। অত্যন্ত সুন্দর নাম ছিল ধানের, যেমন টেপি বোরো, রাতা বোরো, টেপি বোরো, রাতা বোরো, তুলসীমালা, খইয়া বোরো, বালাম।
হাওরের শুকনো মৌসুমে প্রায় ৬৮ লাখ হেক্টর জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে ৮০% জমিতেই বোরো ধান হয়, যা সারাদেশে উৎপাদিত মোট বোরো ধানের প্রায় ১৮-২০%। অর্থাৎ প্রায় পাঁচভাগের ১ ভাগ শুধু হাওর থেকেই বোরো ধান আসে। কিন্তু এই ধান দেশীয় জাত নয়।
এখন আধুনিক জাতের প্রবর্তন করে উচ্চফলনশীল ধান চাষ করা হয়। এগুলো হচ্ছে বিআর ১১, ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ২৯, ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ৮৯, সহ বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত ধান। হাইব্রিড ধানও চাষ করা হয়। ধানের বীজ সরবরাহ করেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশান (বিএডিসি)। সব উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান সার-কীটনাশক-সেচ এর ওপর নির্ভরশীল। বোরো ধানের মধ্যে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত ব্রি ধান ২৮ এবং ২৯ বোরো ধান চাষে মূখ্য ভূমিকা রেখেছে এবং হাওরে স্থানীয় জাত না করে এই ধানই চাষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন ব্রি এর গবেষক বলছেন সময়ের ব্যবধানে ব্রি ২৮ ও ২৯ জাত দুটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে আসছে। ব্রি’র মতে এ বছর সারা দেশেই ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯-এর পাশাপাশি অন্যান্য ব্রি উদ্ভাবিত ধান যেমন ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, বঙ্গবন্ধু ধান১০০, ব্রি ধান১০১ এবং ব্রি ধান১০২ ব্যাপকভাবে চাষ হয়েছে। এ জাতগুলোয় গড় ফলন হয়েছে বিঘাপ্রতি ২৮-৩৩ মন। অর্থাৎ বোরো ধান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে কৃষকদের ওপর। এবারের বিপর্যয়ে বিএডিসি সরবরাহকৃত বীজ সময়মতো না পাওয়া এবং মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২২ সালের আগ পর্যন্ত হাওরে ধান কাটার জন্যে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হোত না। অন্য জেলার কৃষি শ্রমিকরা এসে ধান কেটে দিতেন। করোনার সময় থেকে হাওরে কৃষি শ্রমিক আনার সমস্যা আছে বলে ২০২২ সালে কীটনাশক কোম্পানি এসিআইয়ের তৈরি করা কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার শুরু হয় সরকারি উদ্যোগে। শুধু কম্বাইন্ড হারভেস্টার নয়, হাওরের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করা হয় রিপার, পাওয়ার টিলার ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে। ধান শুকাবার জন্য ড্রায়ার যন্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে। এবারের দুর্যোগে এই মেশিন কোনো কাজে লাগেনি।
হাওরে বোরো ধান চাষ রোপণ করা হয় পৌষ মাসে, (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) এবং কাটার সময় বৈশাখ মাসে (এপ্রিল-মে)। এই সময়টা শুকনো মৌসুম, কিন্তু ধান কাটার সময় প্রায় প্রতিবছর আগাম বৃষ্টি বা বন্যার ঝুঁকি থাকে। বছরের এই সময়ে অর্থাৎ বর্ষাকাল শুরু হবার আগে থেকেই হাওরের কথা পত্রিকার শিরোনাম হয়। অন্য কোনো সময় হাওরের খবর পত্রিকার শিরোনাম খুব একটা হয় না। বলাবাহুল্য হাওরের খবর ইতিবাচকভাবে আসে না। তাদের সমস্যার চরমে পৌছালেই আমরা জানতে পারি। এবারও আগাম বৃষ্টির কারণে হাওরের কান্না সারা দেশবাসী শুনছে।
হাওর সম্পর্কে বোঝার দরকার আছে। হাওর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মিঠাপানির জলাভূমি। এই হাওর অঞ্চল ৩৭৩টি ছোট ব্ড় হাওর নিয়ে গঠিত, যা মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রায় ২.৬৩ লক্ষ হেক্টর আয়তনজুড়ে আছে [বাংলাদেশ জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, মার্চ ২০২৫]। এই অঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষের বাস। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের কিছু তথ্য ব্যবহার করছি। তাদের সংজ্ঞায় ‘হাওর’ বলতে পাত্রাকৃতি নিচু নিম্নভূমিকে বোঝায়, যা বর্ষা মৌসুমে ৭-৮ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং শুকনো মৌসুমে (৪-৫ মাস) অধিকাংশ এলাকায় ফসলী জমিতে পরিণত হয়। হাওরের মধ্যে ছোট ছোট স্থানীয়ভাবে পানি মগ্ন নিম্নভূমি স্থানীয়ভাবে ‘বিল’ নামে পরিচিত, যা দেশের অন্যান্য বিলের চেয়ে ভিন্ন। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশজুড়ে বিস্তৃত নিম্নভূমিতে অবস্থিত হাওরগুলো বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ও নদীর পানি ধারণ করে বিশাল একক জলাশয়ে পরিণত হয়, যা দেশের সর্ববৃহৎ জলজ বাস্তুতন্ত্র। আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে ২১ সীমান্তবর্তী নদী হাওরের পানি প্রবাহে অবদান রাখে।[ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, ২০২৫]
হাওরের বন্যা, আগাম বন্যা, কিংবা আগাম ও অতিবৃষ্টি এখন আর প্রাকৃতিক নয়, নিয়মিতভাবেই সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একদিকে বন্যার মাধ্যমে পলি আসে, অন্যদিকে আগাম এবং আকস্মিক বন্যা বোরো ধানের ঠিক যখন পাকার সময় হয়, তখন অপূরণীয় ক্ষতি করে। এর আগে ২০১৭ সালে যে আগাম বন্যা হয়েছিল, তাতে হাওরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্লাবিত হয়েছিল, তখন ৮০% বোরো ধান নষ্ট হয়। আবার ২০২২ সালে দুই দফা আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

শুধু কী বৃষ্টি? হাওরের কৃষকরা যেসব সমস্যার কথা বলছেন তার মধ্যে রয়েছে শ্রমিক না পাওয়া, বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যেতে না পারা, জলাবদ্ধতা, বাঁধ অকার্যকর হওয়া, ধানের বীজ ঠিকমতো না পাওয়া ইত্যাদি।
আগাম বৃষ্টিতে ধান কাটার জন্য কৃষক মাঠে গিয়ে ধান কেটে উঠতে পারছেন না কারণ এত বিশাল এলাকায় কৃষি কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আগে অন্য জেলা থেকে কৃষিশ্রমিক এসে ধান বোনা ও কাটার কাজ করে দিত। যা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কারণে চাহিদা কমে গেছে। এই শ্রমিক এসে কেটে দেয়ার পদ্ধতি এখন আর নেই। কিন্তু এই বৃষ্টিতে যখন ধান পানিতে তলিয়ে গেল তখন দেখা গেল যন্ত্র কাজে লাগছে না, হারভেস্টার পানি ও কাদায় নামতে পারছে না। জ্বালানী সংকটের কারণে হারভেস্টার ব্যবহার সীমিত হয়ে গেছে। কৃষক তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়েকে সাথে নিয়েও ধান কেটে কূল পাচ্ছেন না। একে-অপরের সাহায্যের জন্য প্রতিবেশীরাও সাহায্য করতে পারছেন না, কারণ সবারই এক অবস্থা।
তীব্র শ্রমিকসংকটে শ্রমিকের মজুরিও বেশি দিতে হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে যে শ্রমিক পাওয়া যেত ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে সেই শ্রমিক ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা দিতে হচ্ছে। অথচ ধানের দাম মিলছে না, ভাগ্য ভালো হলে ৭০০ টাকা মণ হয়তো পাওয়া যাবে। তাই পারিবারিক শ্রম ব্যবহার করে ধান কাটছেন কৃষকরা। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না গিয়ে মা-বাবাকে সাহায্য করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে শ্রমিক সংকট শ্রমিকের অভাবে সৃষ্টি হয়নি। বিগত বছরগুলোতে সব কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করার কারণে শ্রমিকের চাহিদা কমে গেছে। অন্য জেলা থেকে আসা এই শ্রমিকরা হয়তো কাজ না পেয়ে বসে আছেন, আর এদিকে হাওরের কৃষকরা শ্রমিক সংকটের কারণে উচ্চ মজুরি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ এর জন্যে কোনো পরিকল্পনা নেই, আশা যে পানি শুকিয়ে গেলে মেশিন হয়তো নামবে। কাজেই এখন দুর্যোগ, দুর্যোগই থাক।
আধুনিক বোরো ধান রক্ষার্থে হাওরে অকাল বন্যা এবং পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাঁধ দেয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের। অর্থাৎ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বোরো ধান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, যার প্রধান কাজ হচ্ছে মাটি কাটা এবং বাঁধ দেয়া। এটা তাদের প্রজেক্ট। কিন্তু এই বাঁধগুলো অধিকাংশ সময় অপরিকল্পিতভাবে করা হয় এবং সময়মতো শেষ হয় না। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ফসল রক্ষার নামে হাওরের যেখানে-সেখানে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এসব বাঁধের কারণে হাওর থেকে বৃষ্টির পানি নামার রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। টানা বৃষ্টিতে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। হাওরের সাতটি জেলায় ৩১১টি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে যার দৈর্ঘ্য ২২৮৪.৭৫ [মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪] শুরুর দিকে অনেক হাওরে কৃষক শত শত শ্যালো মেশিন বসিয়ে সেই পানি সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন বৃষ্টি বেশি হয়, হাওর ভেসে যায়, তখন কৃষক বা পাউবো কারো আর কিছু করার থাকে না। ফলে বেশির ভাগ ধান বাঁচানো যায়নি। হাওরের অনেকে এ অবস্থাকে ‘নয়া দুর্যোগ’ বলছেন। প্রতিবছরই বাঁধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাটি কাটার পরিমাণ। অপরিকল্পিত বাঁধের সঙ্গে বিপুল মাটি প্রতি বছর হাওরে, নদীতে, খালে ও জলাশয়ে এসে পড়ছে। মাটি কাটার ফলে একদিকে হাওরের জাঙ্গাল, উঁচু জমি, বন, গাছগাছালি ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে সেই মাটিতেই হাওরের জলমহাল, হাওর, হাওরঘেঁষা নদী ও খাল ভরাট হয়েছে। সব মিলিয়ে বাঁধই এখন গলার ফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক কৃষক [বাংলা বিডিনিউজ২৪.কম ২ মে, ২০২৬]। এদিকে ২০২০ সালে কিশোরগঞ্জের তিনটি উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে যুক্ত করে অলওয়েদার ২৯.১৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টি বাঁধ, ১৫টি ব্রিজ, ৬৯টি কালভার্ট ও ৩৫টি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে, যা মাছের চলাচলের জন্য বাধা সৃষ্টি করছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সড়ক মন্ত্রণালয় একটি সার্ভে করে এর সত্যতা যাচাই করেছে। তারা এই সড়কের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ পেয়ে কাজ হাতে নিয়েছে। এই সার্ভের কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হচ্ছে পূর্বে বর্ষার পানির সাথে পলি মাটি আসতো, কিন্তু এখন পলিমাটির পরিবর্তে বালি মাটি আসে। সড়ক নির্মাণের ফলে বালিযুক্ত পানি সড়কের সাথে ধাক্কা খেয়ে হাওরের তলদেশে জমা হয়ে বালি মাটির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে খাল ও বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বোরো ধানের জন্য কৃষক বিলে পানি না পেয়ে বোরিং করে পানি তুলছে। বর্ষাকালে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কালভার্টের মুখে অবৈধ ও নিষিদ্ধ জাল স্থাপন করে ডিমওয়ালা মাছসহ অতিরিক্ত পরিমাণে মাছ আহরণ করে হাওরের মৎস্য সম্পদের ক্ষতি করছে [মৎস্য অধিদপ্তর, ১ লা জানুয়ারি, ২০২৫] ।এই অলওয়েদার সড়কের কারণে পানি অবাধ চলাচল ব্যাহত হয়ে হাওরের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একটি শখের প্রকল্প হাওরের গলার কাঁটা হয়ে গেছে।

এখন আসি হাওরের মূল পরিচয়ে। হাওরে শুকনো মৌসুম থাকে বছরে ৪-৫ মাস, কিন্তু বছরের ৭-৮ মাসই হাওরে পানি থাকে। আর এই পানি থাকার অর্থ হচ্ছে প্রচুর দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা। হাওরে প্রায় ১৪৩ প্রজাতির মাছসহ স্বাদু পানির চিংড়ি, শামুক ও ঝিনুক পাওয়া যায়। বিল, প্লাবনভূমি ও নদীতে বিপুল পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়, যা জেলেরা আহরণ করেন। সিলেট বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ সালে আহরিত মাছের পরিমাণ ২,২০,৫৭২ মে টন। দেশীয় মাছ রক্ষার জন্য বিভিন্ন স্থানে ৩৫টি অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু বোরো ধান চাষে রাসায়নিক সার ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ধান ব্যবহার হয়, যা ধান কাটার পরও মাটিতে রেসিডিউ আকারে থেকে যায় এবং বর্ষাকালে পানির সাথে মিশে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেশীয় মাছের ব্যাপ্যক ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক মৎস্যজীবী/জেলে মাছ আহরণের সাথে জড়িত। মাছ কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে মৎস্যজীবীদের জীবিকার ওপর আঘাত।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বোরো ধানে ব্যবহার করা কীটনাশকের ২৫% বর্ষার পানির সাথে জলাভূমিতে গড়িয়ে যায় এবং প্রায় ১৫-২০% রেসিডিউ হিশাবে থেকে যায়। অথচ হাওর থেকে শুধু ধান নয়, সারা দেশের আহরিত মাছের ৩০%, ২২% গবাদি পশু ও ২৪% হাঁস হাওর থেকে আসে। কীটনাশক ব্যবহারের কারণে গবাদি পশুর খাদ্য দূষিত হয়, হাঁস পালনও ব্যাহত হয়। এই তথ্যগুলো নীরবে থেকে যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাওরাঞ্চলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রক্ষায় কৃষিতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করার জন্য ২৯ সদস্যের জাতীয়, জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করেছে আগস্ট ২০২৪ সালে। তিনটি মন্ত্রণালয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও পানি সম্পদ একত্রে বোরো মৌসুমে হাওর অধ্যুষিত সাত জেলায় বালাইনাশক বিক্রি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। জেলা প্রশাসক, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে কৃষি খাতে বালাইনাশক ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএফআরআই) এর তথ্য অনুযায়ী হাওরের মাছ আহরণ ২০১১-১২ সালে ২.৩১ লাখ মে টন থেকে ২০২৩-২৪ কমে হয়েছে ১.২৮ লাখ মে টন, অর্থাৎ এক দশকে কমেছে ১.০৩ লাখ মে টন, প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রায় এই একই সময়ে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৩৩,৩৭০ টন (২০১৬) থেকে ৩৯,৫৪০ টন (২০২১)। কিন্তু হাওরে ধানের ক্ষতি হলে যেভাবে সারা দেশে সাড়া পড়ে যায়, মাছ ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। অথচ মাছ ও গবাদি পশু মোট খাদ্য সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবাদি পশু, হাঁস পালনও কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ প্রাণিজ আমিষের যোগানেও সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
একদিকে হাওরে মাছ রক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মাছ আহরণে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার যেমন চায়নাদুয়ারি, কারেন্ট জাল এবং ইলেক্ট্রিক ফিশিং এবং রাসায়নিক দ্রব্য এমনকি কীটনাশকও ব্যবহার করা হয়। এগুলো বন্ধের জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলেই কাজের পরিকল্পনা করেছেন।
হাওরের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে ইজারা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওরগুলো রয়েছে। যদিও অধিকাংশ হাওর এলাকা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দিয়ে দেওয়া হয়েছে; যারা শুধু ইজারা দিয়ে এখান থেকে রাজস্ব আহরণ করে। হাওরকে ঘিরে একটা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। হাওর ইজারা প্রায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহাজনদের হাতেই যায়। যার ফলে সাধারণ মৎস্যজীবীরা বঞ্চিত হয়। মৎস্যজীবী সমিতির নামে হাওর ইজারা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের সমর্থকরা হাওর লিজ নিয়ে থাকে। হাওরে ইজারা প্রথা বন্ধ করতে হবে, ইজারা দেওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করে সেগুলোকে মাছের অভয়ারণ্য ঘোষণা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরণ ও পরিমাণ পরিবর্তিত হওয়ায় কৃষির পূর্বানুমান করা কঠিন হয়ে গেছে। হাওরে ধান কাটার সময়ে প্রায় সময় আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি হচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে লাখ লাখ জমির পাকা ধান। বৃষ্টি কখন হবে না হবে কৃষকের জানার উপায় নেই। এখন শুনছি স্বল্পমেয়াদের বোরো ধান করা হবে। কিন্তু কত স্বল্পমেয়াদের করবে? কিন্তু এই বিষয়টি কেউ ভাবছে না যে জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর চাষপদ্ধতি জলবায়ু পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে। ট্রাক্টর, সেচ ও হারভেস্টারের মতো যন্ত্র ব্যবহারে ডিজেল ব্যবহার হয়, যা কার্বন নির্গমনে সহায়তা করে। সার (বিশেষ করে ইউরিয়া) ও কীটনাশকের মাধ্যমেও গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয়। নাইট্রোজেন পানিতে মিশে মাছ দূষিত হয় এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্যে ঝুঁকি সৃষ্টি করে। একদিকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে নানা কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে যার ভুক্তভোগী হচ্ছে হাওরের মানুষ; অন্যদিকে হাওরের কৃষিব্যবস্থা নিজেই গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে অবদান রাখছে।
জলাবদ্ধতাও হাওরের জন্য একটি বড় সমস্যা। যে বাঁধ দেয়া হয়েছিল ফসল রক্ষার জন্য, সে বাঁধই আবার জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির পানি বের হবার কোনো পথ থাকে না, তখন দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অপরিকল্পিত ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক হাওরের পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, যা মাছের জন্য ক্ষতিকর। এগুলোকে উন্নয়ন মনে করা হয়, আসলে কী তাই?
করণীয় কী?
উবিনীগ ও নয়াকৃষি আন্দোলন আয়োজিত হাওরের দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের জন্য ১২ মে, ২০২৬ তারিখে জাতীয় প্রেসক্লাবে হাওরের কয়েকটি জেলার কৃষকসহ একটি মত বিনিময় সভার আয়োজন করেছে। এই সভায় কৃষকদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এই সভায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন হাওরের কৃষক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের দাবিগুলো ছিল ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে, বেড়িবাঁধ, কোম্পানির বীজের বিরুদ্ধ্বে। বেড়িবাঁধে স্লুইস গেট না থাকার কারণে পানির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অকাল বৃষ্টিতে এতো সমস্যা সৃষ্টি হোত না, যদি এসব প্রতিবন্ধকতা না থাকতো।
হাওরের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। যেমন,
১। বোরো ধানের জন্য আধুনিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার কতখানি হবে তা পর্যালোচনা করতে হবে।
২। কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন একসাথে পরিকল্পনা করতে হবে। একটির কারণে অন্যটি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা দেখতে হবে। কারণ সব মিলিয়েই খাদ্য উৎপাদন।
৩। কৃষক, মৎস্যজীবী, গবাদিপশু পালনকারী সকলের টিকে থাকার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে।
৪। আমাদের উন্নয়ন নীতি ও প্রকল্প পর্যালোচনা করতে হবে। রাস্তা, বাঁধ, ব্রিজ কালভার্ট কার উপকার করছে আর কার ক্ষতি করছে তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৫। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় রক্ষা করে হাওরের মানুষ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার জন্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
[এই লেখাটিতে মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাওরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সভায় উত্থাপিত তথ্য থেকে নেয়া হয়েছে, একই সাথে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকেও নেয়া হয়েছে]