বর্ষার ভরা মৌসুমেও ইলিশ নাই, প্রকৃতি নয় মানবসৃষ্ট কারণই দায়ী
ফরিদা আখতার || Sunday 06 September 2026 ||
এখন বর্ষার মৌসুম, ভালো বৃষ্টিও হচ্ছে। কাজেই মানুষ ইলিশ মাছ খেতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাজারে ইলিশ প্রায় নেই বললে চলে, যা পাওয়া যায় তার দাম অত্যন্ত বেশি, মাঝারি ইলিশ প্রায় ২০০০ টাকা আর বড় ইলিশ ৩০০০ টাকায় কেনার সাধ্য সাধারণ মানুষের নেই। পত্রিকায় প্রতিদিন ইলিশের খবর উঠছে, একদিকে জেলেরা খালি হাতে ফিরছেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও দামের কারণে বাজারে গিয়ে ইলিশ কিনতে পারছেন না।
অথচ এমন হবার কথা নয়। পৃথিবীর মাত্র ১১টি দেশে ইলিশ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, বাংলাদেশ তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। ইলিশ (Tenualosa ilisha) প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া মাছ, যার কোনো উৎপাদন করতে হয় না, শুধু ব্যবস্থাপনা করতে হয়। ইলিশ মাছ স্বাদের জন্যই বেশি সমাদৃত; এর পুষ্টিগুণও কম নয়। উচ্চ মাত্রায় আমিষ, চর্বি ও খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। কাজেই পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেও ইলিশের মূল্য আছে। আগে দেশের প্রায় সব নদ-নদীতে, এমনকি শাখা নদীতেও ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। ২০১৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে ১০০টি নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ইলিশের প্রধান আহরণ এলাকা হচ্ছে মেঘনা নদীর নিম্নাঞ্চল, তেঁতুলিয়া, কালাবদর বা আড়িয়াল খাঁ (নিম্নাংশ), ধর্মগঞ্জ, নয়াভাংগানি, বিষখালী, পায়া, রূপসা, শিবসা, পশুর, কচা, লতা, লোহালিয়া, আন্দরমানিকসহ অনেক নদী ও মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরে ইলিশ ধরা পরে। [ইলিশ মাছ গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা, বিএফআরআই, চাঁদপুর, ২০১৩]
ইলিশকে জাতীয় মাছ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তার মূল কারণ এর অর্থনৈতিক অবদান। এককভাবে ইলিশ জিডিপিতে ১% অবদান রাখে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জি আই) পণ্য হিশেবেও ২০১৭ সালে স্বীকৃতি মিলেছে। উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের অবদান হচ্ছে ৪২% তার মধ্যে প্রায় ১২% ইলিশ থেকে আসে; ২৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং ১.৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। পাঁচ লক্ষ জেলে সরাসরি এবং ২০-২৫ লক্ষ মানুষ ইলিশ সম্পদের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন।
ইলিশের সরবরাহের অবস্থা
ইলিশ সাগর ও নদী থেকে আহরণ করা হয়। ইলিশ উৎপাদনে সরকারের কিছু করার না থাকলেও ইলিশ ব্যবস্থাপনায় অনেক ভূমিকা আছে। এবং সেটাই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটটের কাজ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটটের তথ্য অনুযায়ী মোট আহরিত ইলিশের প্রায় ৬০% সমুদ্র থেকে আসে, বাকি ৪০% ইলিশ নদী ও মোহনা থেকে আসে, যার মধ্যে ১৫% নদী ও ২৫% মোহনা থেকে আহরিত হয়। বর্তমানে নদী ও সাগর থেকে ইলিশের উৎপাদন হয় ৫.২৯ মেট্রিক টন। বিগত ২৫ বছরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০০০ সালের শুরুতে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লক্ষ মেট্রিক টন কিন্তু এরপর থেকে ইলিশ আহরণ বেড়েছে, বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত ইলিশের আহরণের বৃদ্ধি ৫.৭১ লাখ মেট্রিক টন দেখা গেছে। কিন্তু ইলিশ আহরণ তিন আর্থিক বছর (২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪) ধরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২০-২১ সালে ৫.৩৪ লক্ষ মেট্রিক টন হতে ২০২৩-২৪ সালে ৪.৭৭ লক্ষ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। এই সময়ে প্রায় ৫৭ হাজার মেট্রিক টন (১০.৭%) হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, ইলিশ আহরণে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা যাচ্ছে এবং বিশেষ করে ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক নিম্নমুখী ধারা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক উৎপাদন আনুমানিক ৫.৩২ লক্ষ মেট্রিক টন যা ২০২০-২১ সালের সমান পর্যায়ে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এ বছর সে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় উৎপাদনের প্রধান অংশ বরিশাল বিভাগ থেকে আসে—যা প্রতিবছর মোট উৎপাদনের ৮৫% এর বেশি অবদান রাখে।
ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়াতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা
আহরণ করা মাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য মাছ ধরার ওপর বছরের বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এটা ব্যবস্থাপনার কাজ। এই নিষেধাজ্ঞা পালন করা আইনিভাবেই জরুরি।
দুটি প্রধান নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হয়। ১. ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় ২২ দিনের (আশ্বিন-কার্তিক বা অক্টোবর নভেম্বর মাসে) এবং ২. বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছের জন্যে নিষেধাজ্ঞা এপ্রিলের ১৫ থেকে জুনের ১১ তারিখ পর্যন্ত ৫৮ দিন। সমুদ্রে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার এই সময়কাল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুনভাবে নির্ধারণ করেছিল যা আগে ৬৫ দিনের ছিল। সে সময় তারিখ এমনভাবে ছিল যে আমাদের জেলেরা যখন নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে মাছ ধরতে পারছে না অথচ তখন পার্শ্ববর্তী দেশের ট্রলার এসে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আটান্ন দিনের তারিখ নির্ধারণ ভারতের নিষেধাজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছিল। এই ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালনে বিশেষভাবে সহায়তা করেন নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ এবং অবশ্যই মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এই কাজ কঠিন কিন্তু ঠিক মতো নিষেধাজ্ঞার সময় মেনে চলতে পারলে মাছের প্রাপ্তি সম্ভাবনা বাড়ে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে মৎস্যজীবী পরিবারগুলোতে ৪০ কেজি খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়। বলাবাহুল্য, এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়।
নির্ধারিত জল সীমায় অভয়াশ্রমগুলোতেও দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। মূলত মার্চ-এপ্রিল মাসে সারা দেশে বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে মাছ ধরায় স্থানীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এই কাজে আমাদের মৎস্যজীবীরা সহযোগিতা করলেও অমৎস্যজীবীরা নানাভাবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেন। তাই আইনের আশ্রয় নিতে হয়।
মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞার সুফল আছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। এই সফলতা যাচাইয়ের গবেষণা করে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ইলিশের প্রজনন সফলতার হার ৫২% পর্যন্ত পাওয়া গেছে, কোথাও ৭০% এর বেশিও হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০২৫ সালের ইলিশের গড় প্রজনন সফলতার হার-৪৯.২৭%, আনুমানিক ৭৯১,৫৬৪ কেজি ডিম উৎপাদন, প্রাকৃতিক মজুদে প্রায় ৩৯.৫৭ হাজার কোটি জাটকা যুক্ত হয়েছে।
মানবসৃষ্ট কারণ: নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার
নদী সমূহে মূলত ফাঁস জাল দিয়ে ইলিশ আহরণ করা হয়। এটাকে ইলিশ জালও বলে। কোথাও কোথাও সাইন জাল বলে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ অনুযায়ী ৬.৫ সে.মি. এর চেয়ে ছোট মেস সাইজের ইলিশ জাল দিয়ে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ। ইলিশ আহরণের বৈধ জাল সমূহ হলো: ৬.৫ সে.মি. বা এর চেয়ে বড় মেস সাইজের ইলিশ জাল/সাইন জাল/ সুতার জাল/নাইলন সুতার জাল, কোনা জাল, গুলতি জাল, চান্দীজাল/ ছান্দীজাল, খোট জাল।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট (চাঁদপুর) গবেষকরা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ধৃত ইলিশ মাছের দৈর্ঘ্য বিবেচনা করে ৬.৫ সেমি ফাঁস (MESH) যুক্ত জালের ব্যবহার নির্ধারণ করেন, তাহলে নদীতে ইলিশ মাছের মজুদ সংরক্ষণ, সহনশীল মৎস্য উৎপাদন রক্ষা করা যাবে। জাটকাসহ ২৬ সেমি ঊর্ধ্ব দৈর্ঘ্যের মাছ রক্ষা পাবে। জালের প্রসঙ্গে কথা বলতে হলে বিজ্ঞানীরা Catch-per-unit-effort CPUE নিয়েই প্রধানত হিশাব করেন। অর্থাৎ প্রতিবার মাছ ধরার সাথে কত পরিমাণ মাছ উঠছে তা জাল ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই জালভিত্তিক CPUE নির্ণয় খুব জরুরি কারণ একই সাথে ইলিশ ছাড়াও অন্যান্য মাছ উঠতে পারে ফাঁসে সাইজের কারণে। যেমন বিএফআরআইয়ের গবেষণা ফলাফল হচ্ছে জেলেদের জালে জাটকার সাথে কাচকি, কাজলী, কুকুরজীব কুচিয়া, তাপসী, তুলার ডান্ডি, সাদা চেওয়া, লাল চেওয়া, শিলং, ঘাউরা, পোয়াসহ এমন অনেক মাছ উঠতে পারে।
সব ধরনের জাল ইলিশ আহরণের উপযোগী নয়। তাই জালের মধ্যে কিছু জাল নিষিদ্ধ করা আছে। যেমন বেহুন্দি জাল। জালভিত্তিক CPUE নির্ধারণ করে দেখা গেছে বেহুন্দি (Setbag net), চান্দি ও কারেন্ট জালে ধৃত মাছের মাত্র ১৬% ইলিশ ও ৮৪% অন্যান্য মাছ। এই মাছগুলো অধিকাংশই লার্ভি ও অপরিণত অবস্থায় ধরা পড়ে। ইলিশ মাছ উৎপাদন হ্রাসের ক্ষেত্রে বেহুন্দি জালের ব্যবহার অন্যতম কারণ।

চান্দি জাল মূলত ইলিশ ধরার ফাঁস জাল। এই জালে ধরা পড়া ইলিশের হার ৮৩% এবং অন্যান্য মাছের হার ১৭%। অন্যান্য মাছের মধ্যে আছে পোয়া, পাঙ্গাস, তাপসী, বেলে ইত্যাদি। চান্দি জাল ঠিক মতো নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে বড় ইলিশ পাওয়া যাবে। অন্যান্য মাছের মধ্যে পোয়া উল্লেখযোগ্য। চান্দি জালের মতো আর একটি জাল হচ্ছে গুল্টি জাল। এর তলদেশে ছোট ছোট পকেট থাকে তবে সিংহ ভাগই ইলিশ।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কারেন্ট জালও ইলিশ ধরার জন্য নিষিদ্ধ। এই জালে ৮০% ইলিশ হলেও সেগুলো প্রধানত জাটকা (২৫ সেমি দৈর্ঘ্য সীমা)। ইলিশ মাছের উৎপাদনের ক্ষেত্রে কারেন্ট জালের ব্যবহার একটা বড় হুমকি। এর ব্যবহার বন্ধ না করলে বড় আকারের ইলিশ পাওয়া কঠিন হবে। কারেন্ট জালে পাঙ্গাস ও পোয়া মাছও ওঠে। [তথ্যসূত্র বাংলাদেশের নদ-নদীতে ইলিশ মাছের সহনশীল উৎপাদনের লক্ষ্যে ইলিশ মাছ গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা [Hilsa research and management in the rivers of Bangladesh for the sustainable Hilsa production] ড. মো. আনিছুর রহমান, মো. মেহেদী হাসান প্রামানিক, ফ্লোরা, মো. মনজুরুল হাসান, তায়েফা আহমেদ, ড মাসুদ হোসেন খান এবং ড ইয়াহিয়া মাহমুদ, মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নদী কেন্দ্র, চাঁদপুর, ২০২১]
মা ইলিশ সংরক্ষণের সময় পরিচালিত অভিযানে কারেন্ট জালের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ২০২৪ সালে ২২ দিনের অভিযানে ১৬.৬ কোটি বর্গমিটার কারেন্ট ও ৩.৯১ কোটি বর্গমিটার অন্যান্য জাল ধরা হয়েছে। এ ছাড়া মশারী, বেহুন্দি জাল, চায়না দুয়ারি ধরা হয়েছে ৮১৫৭টি। এই জাল ব্যবহার করে আইন ভঙ্গের জন্য ২৮৯ জন জেলেকে জরিমানা করা হয়েছে। [বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পরিচালিত কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ] বাংলাদেশ নৌবাহিনী কারেন্ট জাল ধরেছে ২.৭১ কোটি বর্গমিটার, মশারী, বেহুন্দি জাল, চায়না দুয়ারি ধরা হয়েছে ৯৫টি, ৭০ জন জেলেকে জরিমানা করা হয়েছে। কারেন্ট জালসহ নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারকারীরা আইনভঙ্গ করে ইলিশ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
সমুদ্রে ছোট ভাসান জাল ও বড় ভাসান জাল দিয়ে ইলিশ আহরণ করা হয়। সামুদ্রিক মৎস্য আইন ২০২০ অনুযায়ী ছোট ভাসান জালের ক্ষেত্রে ২০০ মি.মি. এর চেয়ে ছোট মেস সাইজের ফাঁস জাল দিয়ে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ এবং বড় ভাসান জালের ক্ষেত্রে ১০০ মি.মি. এর চেয়ে ছোট মেস সাইজের ফাঁস জাল দিয়ে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া ৪০ মি. এর অধিক গভীরতায় বাণিজ্যিক ট্রলারের মাধ্যমেও ইলিশ আহরিত হয়। আইন অনুযায়ী শেষ প্রান্তে (Cod end) ৬০ মি.মি. এর ছোট মেস সাইজের ট্রল নেট দিয়ে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ।
তাছাড়া সমুদ্রে ছোট ফাঁসের টং জাল এবং আর্টিসানাল বোটে ট্রল ডোর সংযোগ করে অবৈধভাবে ছোট ইলিশ/জাটকা আহরিত হয়।[ তথ্যসূত্র মৎস্য অধিদপ্তর]
নির্বিচারে ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের ফলে, যেমন: কারেন্ট জাল, চায়নাদুয়ারি, বেহুন্দি জাল, বড় জাল, চরঘেরা জাল, মশারী জাল, পাইজাল, টানাজাল এবং অপরিকল্পিত যান্ত্রিক নৌযানের মাধ্যমে মাছ আহরণ ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের অন্যতম কারণ। এই সকল সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের ইলিশ আহরণ কমে যাওয়া প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট উভয় কারণের ফল। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন, বিশেষ করে বিভিন্ন নদ-নদীতে অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট-সেতু নির্মাণ, উজান থেকে পরিবাহিত পলি জমা এবং নদীর নাব্যতা হ্রাস ও জলজ পরিবেশ দূষণ ইলিশ আহরণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ইলিশ মাছের পরিভ্রমণ পথ, প্রজনন ক্ষেত্র, বিচরণ ও চারণ ক্ষেত্র (ফিডিং এবং নার্সারি গ্রাউন্ড) দিন দিন পরিবর্তিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে।
নদীর নাব্যতা সংকট
ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন রুটসমূহ, যেমন মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনা অক্ষুণ্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভোলা-নোয়াখালী ও ভোলা-পটুয়াখালীর মধ্যবর্তী মোহনা ইলিশের বৃহত্তম প্রজনন ও মাইগ্রেশন পথ হিসেবে বিবেচিত। তবে এই মোহনায় অসংখ্য চর ও ডুবোচর রয়েছে, যেগুলোর অনেকের বয়স ২০-৩০ বছর। জোয়ারের সময় এগুলো ৪-৫ হাত পানির নিচে থাকে এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে, যা নদীর নাব্যতা ও প্রজনন পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। ডুবোচরে পলি জমার কারণে নদীর গভীরতা ০.৫ থেকে ৭৫ ফুট (MSL) পর্যন্ত পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে, যা নদীর নাব্যতা সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।
মৎস্য অধিদপ্তর মেঘনা এবং তেঁতুলিয়া নদী, রাঙ্গাবালীর সোনারচর, নোয়াখালির ঢালচরের ৫০ কিলোমিটার স্থানে নাব্যতা হ্রাসের ৫২টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। [The New Nation 5 Sept. 2025]
বাংলাদেশের প্রধান নদীসমূহের ইলিশের প্রাচুর্য বৃদ্ধির জন্য ইলিশের মাইগ্রেটরি রুটে পলি অপসারণের লক্ষ্যে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় গজারিয়া নদীতে তিনটি রুট খনন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
নদী দূষণ
শীতলক্ষ্যা নদীর পারে শিল্প কলকারখানার হতে রাসায়নিক ও বর্জ্য নদী দূষণের একটি বড় কারণ। ইটিপি স্থাপন ও কার্যকর করা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ শিল্প কারখানা তা মেনে চলে না। শীতলক্ষ্যার দূষণের কারণে মেঘনা নদীও দূষিত হচ্ছে। কৃষিতে কীটনাশক ও বালাইনাশক অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে যা পানিতে মিশছে। এছাড়া, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের মোড়ক ইত্যাদি পানিতে ফেলার কারণে নদীতে দূষণ বেড়ে যাচ্ছে।
মেঘনা নদীতে লবণাক্ততা
মেঘনা নদী স্বাদু পানির নদী। মা ইলিশ লবণাক্ত সমুদ্র থেকে স্বাদু পানির দিকে আসে ডিম ছাড়ার জন্য। অথচ এই স্বাদু পানির নদীতেই লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন মৌসুমে মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এর একটি চলতি গবেষণা প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফল থেকে জানা যায় যে শুষ্ক মৌসুমে মেঘনার চর ভৈরবী তে ১১.৪ পিপিটি, রামগতিতে ৯.২ পিপিটি, হাইমচর ৭.৪ পিপিটি, চাঁদপুরে ৪.৪ পিপিটি এবং চর লুধুয়া তে ৩.৪ পিপিটি লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে থাকে না। মোটামুটিভাবে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত লবণাক্ততা থাকে।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির অনিশ্চয়তা ইলিশের প্রজননে ক্ষতি করে। দাদন ব্যবস্থার কারণে ইলিশের জেলেরা স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে পারেন না এবং ইলিশ ব্যবসায়ীদের ইচ্ছামতো দামে তাদের বিক্রি করতে হয়। ক্রেতারাও তাদেরই নির্ধারিত দামে কিনতে পারেন।
ইলিশ ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করতে পারলে অবশ্যই ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়বে। ::::
লেখাটি সাপ্তাহিক চিন্তা, ও তৎপরতার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। (বর্ষ ২ ।। ৯ আগস্ট, ২০২৬।। সংখ্যা ২৭ ।। ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩।।)