নয়াকৃষি প্রাণবৈচিত্র্য ও দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য
ফরিদা আখতার || Saturday 24 October 2026 ||
নীতিপত্র
কৃষকের নেতৃত্বে প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক কৃষি এবং বাংলাদেশে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর ১০ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়ন
বন্যার পানি নেমে গেলে কিংবা ঘূর্ণিঝড় থেমে গেলেই কৃষক পরিবারের দুর্যোগ শেষ হয় না। ঘরবাড়ি, গৃহস্থালির জিনিসপত্র বা গাছপালার ক্ষতিতেই এর হিশাব ফুরায় না। জমির ফসল নষ্ট হলে, বীজ হারিয়ে গেলে, চাষের হাতে থাকা সময় কমে এলে এবং গো-খাদ্যের অভাবে গরু-ছাগল না খেয়ে মারা গেলে বিপদ আরও গভীর হয়। দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানো নির্ভর করে পরিবারটি আবার খাদ্য ফলাতে পারবে কি না তার ওপর। অথচ তখনকার জমি, পানি ও মৌসুমের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক আলাদা হতে পারে। বাংলাদেশের তাই এমন কৃষিনীতি দরকার, যা মানুষের চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য, সমাজের খাবার জোগানো এবং গ্রামীণ জীবনের প্রাণসম্পর্কগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা রক্ষা করে।
প্রাণবৈচিত্র্যকে উৎপাদনের ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নয়াকৃষি আন্দোলনের চর্চা এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত। এখানে নানা ফসল ও জাত, জীবন্ত মাটি, গবাদিপশু, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণ, কৃষকসমাজের বীজ রাখার প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকের জ্ঞানের পম্পরা এবং বর্ত্মান চর্চা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বোনার সময় পরিচিত ফসলের অভাব ঘটলে, কিংবা বীজ পাওয়ার উৎস অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়লে ভিন্ন উপায়ে সাড়া দেওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। নয়াকৃষি এই সুযোগ গড়ে তোলে প্রাণের বৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং সেই বৈচিত্র্য কাজে লাগানোর জন্য কৃষক ও কৃষি ভিত্তিক গ্রাম সমাজকে সংগঠিত করে। এর অবদান তাই জমির প্রাণসম্পর্ক ও মানুষের প্রতিষ্ঠান—দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্ত হয়। (Mazhar, 2019; Mazhar & Akhter, 2023)।
এই কারণেই কুনমিং–মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক প্রাণবৈচিত্র্য কাঠামোর (Kunming–Montreal Global Biodiversity Framework) ১০ নম্বর লক্ষ্যের কৃষিসংক্রান্ত উদ্দেশ্য পূরণে নয়াকৃষি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। এই লক্ষ্য কৃষি, জলজ চাষ, মৎস্যসম্পদ ও বন ব্যবস্থাপনা এমনভাবে পরিচালনার কথা বলে, যাতে এগুলোর ভিত্তি দীর্ঘকাল টিকে থাকে। এতে প্রাণসম্পর্কভিত্তিক কৃষির (agroecology) কথা স্পষ্টভাবে আছে। এই কৃষিতে ফসলের সঙ্গে মাটি, পানি, অন্যান্য প্রাণ এবং মানুষের জ্ঞান ও জীবনযাপনের সম্পর্ক একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। লক্ষ্যটি প্রাণবৈচিত্র্য, ফলনের সামর্থ্য, দুর্যোগ সামলানোর ক্ষমতা ও খাদ্যনিরাপত্তার যোগসূত্রকে গুরুত্ব দেয়। কৃষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদানের প্রধান পথগুলোর একটি হতে পারে নয়াকৃষি। তবে গোটা লক্ষ্য অর্জনে অন্য খাতগুলোতেও যথাযথ উদ্যোগ লাগবে (Convention on Biological Diversity [CBD], 2022)।
চাষাবাদ ও প্রাণের নবায়ন চালু রেখে দুর্যোগ সামলানো
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলের লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, খরা ও তাপপ্রবাহের মুখে বাংলাদেশের জন্য প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষির পুনরুদ্ধারের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাতেও জলবায়ু বদলের কারণে কৃষি ও গ্রামের জীবন-জীবিকার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপদের মুখে থাকা সমস্যার এক দিক। কিন্তু কোনো আবহাওয়াজনিত ঘটনা বা বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী জীবিকার সংকটে পরিণত হবে কি না সেটা নির্ভর করে জমিতে প্রবেশাধিকার, ঋণের বোঝা, পানি নামার ব্যবস্থা, বীজ পাওয়ার সুযোগ, যাতায়াত এবং সরকারি সহায়তা কার কাছে পৌঁছায়—সেই সকল জরুরি সমস্যা সমাধানের ওপর। (Ministry of Environment, Forest and Climate Change [MoEFCC], 2022)।
তাই দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য (resilience) বলতে শুধু ধাক্কা সহ্য করা বোঝালে চলবে না। এর মধ্যে আবার চাষ গুছিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ চাষের সম্বল শেষ না করে যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার জোগানোর ক্ষমতাও থাকতে হবে। প্রজননের জন্য রাখা গবাদিপশু বিক্রি করে, শেষ বীজটুকু খেয়ে ফেলে কিংবা শোধ করা কঠিন এমন ঋণ নিয়ে কোনো পরিবার ফসল তুলতে পারে। এতে তাৎক্ষণিক বিপদ কাটলেও পরের দুর্যোগে পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়তে পারে। কত জমিতে নতুন করে চাষ হলো বা কত টন ফসল উঠল, তার পাশাপাশি পুনরুদ্ধারের কর্মসূচিতে এই পরিণতিও বিচার করা এবং তা সমাধানের প্রশ্ন চাষাব্দের ধরণের দ্বারা আগাম নির্ণয় করে নেওয়ার দিক থেকে নয়াকৃষি অতুলনীয়।

কারণ প্রাণবৈচিত্র্য এই বিপর্যয়গুলোর জবাব দেওয়ার বিকল্প তৈরি করে। ফসলের কাজ, পাকার সময়, পানির চাহিদা এবং ভিন্ন ধরনের জমিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এক নয়। কৃষক উপযুক্ত বীজ ও রোপণসামগ্রী পাচ্ছেন কি না, সেটিও জরুরি। একই ধাক্কায় ভিন্ন ফসল ভিন্নভাবে সাড়া দিলে সবকিছু একসঙ্গে হারানোর ঝুঁকি কমতে পারে। তবে বৈচিত্র্য সব দুর্যোগ থেকে রক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না; বড় বন্যা বা ঝড়ে একাধিক অবলম্বন একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এই কৃষির সঙ্গে আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়, পানি নামার ব্যবস্থা, পানির ওপর ন্যায্য ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষার যোগ থাকা চাই। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকারি প্যানেলও এই কৃষিচর্চার অভিযোজনের সম্ভাবনা স্বীকার করে। তবে কোথায় কী সুফল মিলবে এবং কী ছাড় দিতে হবে, তা স্থানীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে (Intergovernmental Panel on Climate Change [IPCC], 2022)।
নয়াকৃষিতে প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণের নবায়ন
নয়াকৃষি কৃষিকে দেখে প্রাণ এবং জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখার সম্পর্কগুলোর চলমান নবায়ন হিশাবে। এখানে ক্ষেতের জমির পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা, পুকুর, চাষ ছাড়াই বেড়ে ওঠা গাছপালা, পশুপাখি ও সবার ব্যবহারযোগ্য সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে খাদ্য, গোখাদ্য, জ্বালানি, বীজ ও ওষুধের উপকরণ জোগায়। একই সঙ্গে মাটি, পানি ও প্রাণের সেই সম্পর্কগুলো ধরে রাখে, যেগুলোর মধ্য দিয়ে জীবন চলতে পারে। এসব সম্পর্ক মিলেই কৃষির প্রাণব্যবস্থা (agroecological system) গড়ে ওঠে। ফলে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার কাজ কৃষকসমাজের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা এবং নিজেদের চারপাশের প্রাণজগৎকে নবায়নের কাজের মধ্যেই ঘটে (Mazhar, 2019)।
নয়াকৃষির দশ নীতি এই বোঝাপড়াকে কাজে রূপ দেয়। এতে বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার বন্ধ করা, বীজ কৃষকের হাতে ও ক্ষেতে রাখা, ভূগর্ভের পানি রক্ষা, চাষের ও অচাষের খাদ্য-গোখাদ্যের উৎস বজায় রাখা, মিশ্র ফসল ও পর্যায়ক্রমে ভিন্ন ফসল চাষ, গোটা কৃষিব্যবস্থার ফলন বিচার, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির যত্ন, জলজ প্রাণ রক্ষা এবং জীবিকা মজবুত করার কথা আছে। নীতিগুলো পরস্পরের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কাজ করে। বীজ বাঁচিয়ে রাখতে চাষ চালু থাকা চাই; চাষের জন্য মাটির উর্বরতা ও পানি দরকার; পশুপালন গোখাদ্যের সঙ্গে গোবরের যোগ তৈরি করে। আবার এসব চালু রাখতে জ্ঞান, শ্রম, সম্পদ ব্যবহারের অধিকার ও সমাজের সহযোগিতা লাগে। একসঙ্গে এই চর্চাগুলো কৃষির প্রাণব্যবস্থাকে নবায়িত হওয়ার এবং তার বাসিন্দাদের জীবন ধরে রাখার সামর্থ্য দেয় (Mazhar & Akhter, 2023)।

কম্পোস্ট, ফসলের অবশিষ্টাংশ, সবুজ গাছপালার দেহাবশেষ ও গোবর জৈব পদার্থের চলাচলে অংশ নেয়। এই চলাচলের মধ্য দিয়ে মাটি ও তার অগণিত প্রাণ নতুন করে সজীব হয়। ফসল ও পশুপালনের সম্পর্ক গাছপালা, গোখাদ্য, পশুর জীবন ও গোবরকে যুক্ত রাখে। মিশ্র ফসল এবং পর্যায়ক্রমে ভিন্ন ফসল চাষ নানা প্রাণের আবাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের সুযোগ দেয়। ক্ষেতের আল, পুকুর ও অনাবাদী জায়গা খাদ্য, আশ্রয় ও বেঁচে থাকার পরিবেশ জুগিয়ে এই কাজে অংশ নেয়। কৃষক পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, শ্রম ও সম্মিলিত যত্নের মধ্য দিয়ে এসব সম্পর্কে যুক্ত থাকেন। তাঁদের কাজ এমন সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে ও সমৃদ্ধ করে, যা বাইরের কোনো একটি উপকরণ দিয়ে আলাদাভাবে তৈরি করা যায় না।
এই কারণেই কম্পোস্টকে প্রাণের ধারাবাহিক নবায়ন ও বিকাশের (ecological regeneration) বৃহত্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে বুঝতে হবে। একে কেবল রাসায়নিক সারের বদলে তৈরি আরেকটি উপকরণ ধরে আলাদা ‘উৎপাদন খরচ’ হিশাব করলে আসল সম্পর্কগুলো আড়াল হয়। গাছপালা ও প্রাণের জৈব পদার্থ কীভাবে ঘুরে ফিরে ব্যবহৃত হয়, মাটির উর্বরতা কীভাবে গড়ে ওঠে এবং কৃষকসমাজ কীভাবে নিজের জীবন ধরে রাখে—সেই যোগসূত্র আর ধরা পড়ে না। আর ধরা না পড়লে গোটা কৃষিব্যবস্থা বিচার করার অর্থও বদলে যায়। পরিবার ও দেশের খাবারের জন্য শস্যের ফলন জরুরি। তবে তার সঙ্গে সবজি, ডাল, গোখাদ্য, পশুজাত খাবার, জলজ খাদ্য ও অন্যন্য অনাবাদি সম্পদ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। মূল প্রশ্ন হলো, চাষাবাদ কি সেই সামর্থ্যগুলো নবায়ন করছে, যেগুলোর কারণে নানা উৎস থেকে খাদ্য ও পুষ্টি পাওয়া সম্ভব হয়।

এই বোঝাপড়ায় কৃষি মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দময় জীবন গড়ার চর্চাও। বাংলার ভাব ও জীবনের ধারায় ‘সহজ’ পথে ‘আনন্দ’-এর দিকে যাওয়ার সঙ্গে এর যোগ সরাসরি। মানুষ চাষের মধ্য দিয়ে এমন সম্পর্ক গড়ে, যার সাহায্যে নিজের ও অন্যের ‘আবাস’ বা বাসের জগৎ ক্রমাগত নবায়িত হয়। নীতির প্রশ্ন তাই দাঁড়ায়, মানুষ জমি, পানি, বীজ, খাদ্য ও পরস্পরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে পারছে কি না এবং অন্য প্রাণের বিকাশের সুযোগ দিতে পারছে কি না। প্রাণের নবায়ন ও জীবিকার নবায়ন এই একই দিগন্তের বিষয় (Mazhar, 2019)।
স্বাধীন গবেষণা ও প্রাণের নবায়ন বিচার
এই কৃষিচর্চার কয়েকটি মৌলিক প্রাণসম্পর্কের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে সেটা বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণাতেও প্রমাণ পাওয়া যায়। টাম্বুরিনি ও সহকর্মীরা ৯৮টি গবেষণা-সমন্বয় পর্যালোচনা করেছেন। এখানে গবেষণা-সমন্বয় বা মেটা-বিশ্লেষণ (meta-analysis) বলতে অনেক গবেষণার ফল একসঙ্গে বিচার করে সাধারণ প্রবণতা বের করাকে বোঝানো হচ্ছে। তাঁরা এসব সমন্বয়ের ওপর আবার বিশ্লেষণ চালান, যার ভিত্তিতে ছিল ৫,১৬০টি মূল গবেষণা। ফলাফলে দেখা যায়, কৃষিতে বৈচিত্র্য বাড়ালে সাধারণভাবে প্রাণবৈচিত্র্য, পরাগায়ন, ক্ষতিকর পোকার নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি উপাদানের চলাচল, মাটির উর্বরতা ও পানির ভারসাম্য উন্নত হয়; সামগ্রিকভাবে ফসলের ফলন কমে না। তবে চর্চা ও স্থানভেদে ফল আলাদা হয়েছে। তাই স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার জরুরি (Tamburini et al., 2020)।
এই ফল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা দেখায়, চাষাবাদ খাদ্য জোগান বজায় রেখেই প্রাণের সম্পর্কগুলো শক্তিশালী করতে পারে। গবেষণায় ‘প্রতিবেশের সেবা’ (ecosystem services) বলা হয় প্রকৃতির সেই সব অবদানকে, যেগুলো থেকে মানুষ উপকার পায়। এর মধ্যে কৃষির প্রাণব্যবস্থার নিজের জীবনধারণের সামর্থ্য বজায় রাখার প্রক্রিয়াও আছে। ফলে এসব গবেষণা প্রাণের নবায়ন অনুসন্ধানে কাজে লাগানো উচিত। তবে ‘সেবা’ ও ‘ফলন’ আধুনিক অর্থনীতির ভাষা। এই ভাষা পুরো প্রাণগত ও সামাজিক অর্থ ধরতে পারে না। তাই নয়াকৃষিকে প্রাণবৈচিত্য সিরক্ষা ও বিকাশের কৃষি হিশাবে পুরাপুরি বুঝতে হলে জতে প্রাণ্র প্রক্রিয়া কিভাবে পস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থে প্রবাহিত হয় সেই বৃহত্তর পশ্নের দিকে আমামদের যেতে হবে। তবে নয়াকৃষিতে ফলন কমে না বরং বাড়ে তার বিজ্ঞান্সম্মত হিশাব এ ধরণের স্বাধীন গবেষণা আমামদের নিশ্চিত করে।
রাসমুসেন ও সহকর্মীরা ১১টি দেশের ২,৬৫৫টি কৃষিখামার নিয়ে করা ২৪টি গবেষণা বিচার করেছেন। তাঁরা ফসল, গবাদিপশু, মাটি, ফসলের বাইরের গাছপালা ও পানি সংরক্ষণে বৈচিত্র্য আনার চর্চা দেখেছেন। সাধারণভাবে আলাদা একটি কৌশলের চেয়ে একাধিক কৌশল একসঙ্গে নিলে সামাজিক ও পরিবেশগত সুফলও একসঙ্গে বেশি পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, কৃষির প্রাণব্যবস্থায় বিভিন্ন চর্চা কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে কাজ করে, তা বিচার করা দরকার। এই সম্পর্কগুলো সময়ের সঙ্গে নানা প্রাণ ও মানুষের জীবিকা ধরে রাখার সামর্থ্য বাড়ায় কি না, সেই অনুসন্ধানেরও ভিত্তি মেলে (Rasmussen et al., 2024)।
বীজের সার্বভৌমত্ব ও দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য
গবেষণা ও সংরক্ষণের জীবন্ত প্রতিষ্ঠান কৃষক পরিবার
নয়াকৃষিতে বীজের কৌশলগত গুরুত্ব হলো, তা প্রাণের ধারাবাহিকতার সঙ্গে মানুষের জীবিকা চালানোর ক্ষমতাকে যুক্ত করে। একবারের ফসল এখনকার খাবার জোগাতে পারে। কিন্তু পরের ফসলের সম্ভাবনা নির্ভর করে জীবন্ত ও অঙ্কুর গজানোর উপযুক্ত বীজ, চাষের অনুকূল অবস্থা এবং দুটোকে মেলানোর জ্ঞানের ওপর। বীজ রক্ষা তাই কৃষকসমাজের চাষ চালিয়ে যাওয়া, খাবার জোগানো ও চারপাশের কৃষির প্রাণব্যবস্থা নবায়নের সামর্থ্য রক্ষার বিষয়। বীজ, মাটি, পানি, গাছপালা, পশুপাখি ও মানুষের যত্নের সম্পর্কের মধ্যেই এর গুরুত্ব ছড়িয়ে আছে (Mazhar, 2019; Mazhar & Akhter, 2023)।

এই বোঝাপড়া কৃষির প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার কেন্দ্রে কৃষক পরিবারের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। নয়াকৃষির পরিবারগুলো চাষ করে ও বীজ বাছাই করে, বদলে যাওয়া পরিবেশ লক্ষ করে, মজুত রাখে এবং বীজ ও জ্ঞান বিনিময় করে। পরিবার তাই এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রতিদিনের জীবন একসঙ্গে থাকে। এই প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য মেনে নিলে জাতীয় নীতির প্রশ্নও বদলে যায়। জমা বীজ রক্ষার ভবনের পাশাপাশি যাঁদের শ্রম ও প্রাণসম্পর্কের মধ্য দিয়ে বীজ পাওয়া যায়, কাজে লাগে এবং নতুন জীবন গড়ার ক্ষমতা ধরে রাখে, বাংলাদেশকে তাঁদেরও সহায়তা দিতে হবে।
বীজ খাদ্য ও পুষ্টির সার্বভৌমত্ব
বীজের সার্বভৌমত্ব (seed sovereignty) মানে বীজ রাখা, চাষ করা, বাছাই, নবায়ন ও বিনিময়ে কৃষকের কার্যকর অধিকার ও সামর্থ্য। এসব কাজের নিয়ম তৈরিতেও তাঁর মতামতের গুরুত্ব থাকতে হবে। এর জন্য বীজ ও অন্যান্য দরকারি সম্পদে প্রবেশাধিকার, জ্ঞান, সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান এবং জমি, পানি ও চাষের সুযোগ থাকা দরকার।
খাদ্যের সার্বভৌমত্ব (food sovereignty) এই অধিকারকে প্রসারিত করে কী ফলানো হবে, খাদ্য কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং কার প্রয়োজন কৃষিনীতিকে পরিচালনা করবে, সেই সিদ্ধান্ত পর্যন্ত। পুষ্টির সার্বভৌমত্ব (nutritional sovereignty) হলো এমন অবস্থার ওপর মানুষের কর্তৃত্ব, যার সাহায্যে তারা নানা ধরনের, নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই এবং যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার পেতে পারে। ডাল, সবজি, তেলবীজ, মসলা ও ফলের বীজ পুষ্টির বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে।
বীজের বৈচিত্র্যের সঙ্গে খাবার জোগানের নানা সম্পর্ক টিকে থাকার যোগ আছে। এর সাহায্যে ভিন্ন সময়ে পাকে, ভিন্ন জায়গায় জন্মায় এবং পরিবারের আলাদা প্রয়োজন মেটায়—এমন ফসল রাখা যায়। নিজেদের জমি-পানি ও পরিবেশের উপযুক্ত ফসলসমন্বয় বেছে নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যেই এর কৌশলগত মূল্য। তবে গবাদিপশু, মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদ এবং অনাবাদি খাবারের সঙ্গেও একে যুক্ত রাখতে হবে। শুধু চাষের বীজ দিয়ে খাদ্য ও পুষ্টির সার্বভৌমত্বের পুরো অর্থ বোঝানো যায় না (Mazhar, 2019)।

জাতিসংঘের কৃষক ও গ্রামে কর্মরত অন্য মানুষের অধিকারবিষয়ক ঘোষণা (UNDROP) এই অবস্থানের নীতিগত ভিত্তি দেয়। এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বীজসংক্রান্ত অধিকার স্বীকার করা হয়েছে এবং কৃষকের বীজব্যবস্থা ও কৃষির প্রাণবৈচিত্র্যকে সহায়তার কথা আছে। এই নীতিকে কাজে রূপ দিতে এমন জাতীয় ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান দরকার, যার মাধ্যমে কৃষক নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন (United Nations General Assembly, 2018)।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিশাবে কৃষক পরিবার
নয়াকৃষির কৃষক পরিবার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কৃষক বীজের পুরো জীবনধারার সঙ্গে থাকেন—বাছাই, মজুত, অঙ্কুর গজানো, বেড়ে ওঠা, ফুল আসা, ফসল তোলা এবং আবার বাছাই। নির্দিষ্ট পানি, মাটি, বোনার তারিখ ও আবহাওয়ায় একটি জাত কেমন করে, তাঁরা লক্ষ করেন। খড় ও গোখাদ্যের গুণ, রান্নার স্বাদ-ধরন, মজুতে টিকে থাকা এবং ঘরের কাজে মানানসই হওয়াও বিচার করেন। এসব পর্যবেক্ষণ এমন বৈশিষ্ট্যগুলোকে যুক্ত করে, যেগুলো কোন নীজের শুধু ফলন নিয়ে সংকীর্ণ পরীক্ষায় থাকে না, কিম্বা আলাদাভাবে দেখা হয়, তবে প্রায় সবসময়ই বাদ পড়ে যায়। অর্থাৎ ফলন কেন্দ্রিক নতুন জাত উদ্ভাবনের বৈজ্ঞানিক চর্চা যে তথ্য আমামদের দিতে অক্ষম এবং কৃহি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ধরতে অপারগ কৃষক পরিবার সেই ক্ষেত্রে গবেষণাগারের ভূমিকা পালন করে।
বারবার কাজ করতে করতে এই জ্ঞান গড়ে ওঠে। কৃষক মৌসুম মিলিয়ে দেখেন, ব্যতিক্রমী অবস্থার কথা মনে রাখেন, পরে কাজে লাগতে পারে এমন বীজ রাখেন এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে ফল নিয়ে আলোচনা করেন। অন্য তারিখে বোনা, ভিন্ন ফসল একসঙ্গে চাষ, জমির অন্য জায়গা ব্যবহার বা বীজ রাখার ধরন বদলে পরীক্ষা চলতে পারে। পরিবারের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ও তার বাস্তব ফল একই অনুসন্ধানের অংশ। ভুল সিদ্ধান্তে খাদ্য, বীজের মজুত, শ্রম ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে গবেষণার প্রশ্ন হলো, বদলে যাওয়া অবস্থায় কীভাবে জীবন চালিয়ে যাওয়া যায় (Mazhar & Akhter, 2023)।

এই কাজে নারীর বিশেষ জ্ঞান ও শ্রম কেন্দ্রীয়। বীজ বাছাই, শুকানো, মজুত রাখা ও ঘরের খাবারের বহু সিদ্ধান্ত তাঁদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। পরিবারকে গবেষণার ভিত্তি বলে স্বীকার করলে পরিবারের মধ্যে নারীর সিদ্ধান্তের কর্তৃত্বও স্বীকার করতে হবে। সরকারি কর্মসূচিতে বীজরক্ষকদের পারিশ্রমিক, সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণের নতুন দায়িত্ব যেন বিনা মজুরির বাড়তি বোঝা না হয়, তার ব্যবস্থা থাকা চাই (UBINIG, 2022)।
ক্ষেতে ও মজুতে সংরক্ষণের যোগসূত্র
নয়াকৃষির পরিবারগুলো চাষ করে সংরক্ষণ এবং মজুত রেখে সংরক্ষণকে যুক্ত করে। প্রাণবৈচিত্র্য সনদের (Convention on Biological Diversity) ভাষায়, চাষের কোনো প্রজাতির নিজস্ব গুণগুলো যেখানে গড়ে উঠেছে, সেই পরিবেশে তাকে ধরে রাখাও স্বস্থানে সংরক্ষণ (in situ conservation)। ক্ষেতে চাষ করে সংরক্ষণ তার একটি ধরন। অন্যদিকে, সেই পরিবেশের বাইরে প্রাণসম্পদ ধরে রাখা হলো স্থানবহির্ভূত সংরক্ষণ (ex situ conservation)। শুধু পরের মৌসুমের বীজ তুলে রাখার পাশাপাশি ঘরে বা সমাজের বীজভাণ্ডারে যদি চাষের বাইরে পরিকল্পিতভাবে বীজ সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে স্থানীয়ভাবেও এই দ্বিতীয় কাজটি হতে পারে (CBD, 1992)।
কৃষক পরিবার স্থান ও সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে এই দুই কাজ যুক্ত রাখে। ক্ষেত ও চাষের জায়গা গাছকে তার প্রাণসম্পর্কের মধ্যে ধরে রাখে। বীজভাণ্ডার দুই মৌসুমের মাঝখানে বীজ রক্ষা করে এবং পরে দরকার হতে পারে এমন বিকল্প বজায় রাখে। ক্ষেত থেকে বীজ ভাণ্ডারে যায়, আবার ভাণ্ডার থেকে ক্ষেতে ফেরে। সঙ্গে থাকে তার পরিচয়, আচরণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত জ্ঞান। এই চলাচলের সঙ্গে যুক্ত গবেষণা ও সিদ্ধান্তই সংগ্রহটিকে বাস্তবে কাজে লাগার অর্থ দেয়।
চাষের মাধ্যমে সংরক্ষণে ফসল বদলে যাওয়া পরিবেশের মুখোমুখি হয় এবং কৃষকের নিয়মিত বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। মজুতে বংশগত উপাদান ধরে রাখা আর স্থানীয়ভাবে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য ধরে রাখা সম্পর্কিত হলেও এক কাজ নয়। একটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যটির বিকল্প ধরা যায় না।
প্রাণের নবায়ন শুধু বীজের সংখ্যা বাড়ানো নয়। মাটির জীব, পানি, গাছপালা, পশুপাখি ও মানুষের কাজের সম্পর্কের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হয়। বীজের মজুত নবায়ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা এই সম্পর্ক এবং এর ওপর দাঁড়ানো জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
কৃষক থেকে বিচ্ছিন্ন সংরক্ষণের সীমা
প্রচলিত জিনব্যাংক (genebank) হলো জীবের বংশগত বৈচিত্র্য ধরে রাখার বিশেষ ভাণ্ডার। সেখানে সংগ্রহের প্রতিটি নমুনাকে আলাদা পরিচিতি দেওয়া হয়; এমন নমুনাকে অ্যাকসেশন (accession) বলে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখা, বীজ জীবন্ত আছে কি না পরীক্ষা, তথ্য লেখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর চাষ করে নতুন বীজ সংগ্রহের মাধ্যমে সংরক্ষণ চলে। বংশগত সম্পদ হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে এসব কাজ গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মানদণ্ডেও জিনব্যাংকের প্রধান দায়িত্বের মধ্যে নতুন করে বীজ সংগ্রহের কথা আছে। এই নবায়নের সময় নমুনার বংশগত বৈশিষ্ট্য যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, তার ব্যবস্থাও সেখানে বলা হয়েছে (Food and Agriculture Organization of the United Nations [FAO], 2014)।
বীজের স্বাস্থ্য ও অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা, একই সংগ্রহের দ্বিতীয় মজুত রাখা এবং যৌথ গবেষণায় সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান জরুরি অবদান রাখতে পারে। পরিবার ও সমাজকে নিয়মিত বীজরক্ষক এবং গবেষক হিশাবে সহায়তা করলে এই বিশেষ সামর্থ্য আরও কাজে লাগে। প্রাণবৈচিত্র্য সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদেও স্থানবহির্ভূত সংরক্ষণকে মূলত স্বস্থানে সংরক্ষণের পরিপূরক বলা হয়েছে। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গড়ার ভিত্তি সেখানেও আছে (CBD, 1992)।
তাই জাতীয় কৌশলে জিনব্যাংক ও কৃষকের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। জমা দেওয়া বীজ ফেরত পাওয়ার সুযোগ, দরকারি তথ্য কৃষককে জানানো, গবেষণায় উপযুক্ত সম্মতি এবং সমাজের জ্ঞান রক্ষার ব্যবস্থা চুক্তিতে থাকা চাই। সরকারি সংগ্রহ থেকে কৃষক যেন হারানো জাত ফিরে পান এবং সংরক্ষণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারেন, তার পথ থাকতে হবে। তখন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ও কৃষক পরিবার একই সংরক্ষণব্যবস্থার মধ্যে আলাদা কিন্তু পরিপূরক কাজ করতে পারবে।
নয়াকৃষির ছড়িয়ে থাকা বীজ প্রতিষ্ঠান
টাঙ্গাইল ও পাবনার দুটি সামাজিক বীজসম্পদ কেন্দ্র (Community Seed Wealth Centre) এবং নয়টি বীজ আখড়া (Seed Hut) মিলিয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কে প্রায় ২,৮০০ ধানের জাত এবং সবজি, তেলবীজ, ডাল ও মসলার ৫৩৮টি জাত রয়েছে। সংগ্রহের ধান প্রতিবছর চাষ করে আবার বীজ রাখা হয় (UBINIG, n.d.)। এই ব্যবস্থার গুরুত্ব হলো, নিয়মিত কাজের মাধ্যমে বীজ জীবন্ত থাকে এবং চাষের সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় থাকে।
কৃষক পরিবার ব্যবহার করার জায়গার কাছেই বীজ রাখে। একেকটি বীজ আখড়া আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামের বীজরক্ষক ও কৃষককে যুক্ত করে। নারীদের বিশেষ বীজ নেটওয়ার্ক নির্দিষ্ট ফসল ও জাতের জ্ঞান ধরে রাখে। সামাজিক বীজসম্পদ কেন্দ্রগুলো আরও বিস্তৃত সংরক্ষণ, তথ্য রাখা ও বিনিময়ে সহায়তা করে। এভাবে দায়িত্ব বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকে এবং এক পরিবারের বাইরের সম্পদ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্থানীয় পর্যবেক্ষণের যোগ ঘটে (Mazhar, 2019)।

বড় কেন্দ্রগুলোর কাজ হবে পরিবারভিত্তিক এই ভিতকে মজবুত করা। বীজের মজুত পূরণ, উপযুক্ত বীজ খুঁজে দেওয়া, বাড়তি যত্ন দরকার এমন জাত রক্ষা এবং কৃষকের প্রশ্নকে সরকারি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে এগুলো সাহায্য করতে পারে। কেবল কেন্দ্রকে সহায়তা দিয়ে পরিবারের চাষাবাদ, বীজের কাজ ও জমিতে প্রবেশাধিকার উপেক্ষা করলে যে সম্পর্কের ওপর কেন্দ্রগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই দুর্বল হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশলগত ভিত্তি বীজ: আপদকালীন বীজ
দুর্যোগের পর বীজের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়ে যায়, কারণ চাষের সুযোগ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজে লাগাতে হয়। পরিবারের হাতে টাকা থাকলেও মৌসুমের বাকি সময়ের উপযুক্ত, অঙ্কুর গজাতে সক্ষম জাতের বীজ না-ও মিলতে পারে। রাস্তা ভাঙা থাকতে পারে, বাজারের বীজ দেরিতে আসতে পারে অথবা পাওয়া বীজের জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা তখন আর নাও থাকতে পারে। ঘুরে দাঁড়াতে হলে উপযুক্ত বীজ, স্থানীয় প্রাণসম্পর্কের জ্ঞান এবং সময়মতো চাষের সুযোগ একসঙ্গে মেলাতে হবে।
‘আপদকালীন বীজ’ এই সামর্থ্য আগেই গড়ে রাখে। কৃষকের ভাষায় ‘আপদ’ হলো এমন বিপদ বা অপ্রত্যাশিত অবস্থা, যা স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দেয়। হঠাৎ বন্যা, অসময়ের বৃষ্টি, খরা, ফসলের রোগ কিংবা বীজ হারানো—সবই আপদ হতে পারে। কিন্তু আপদকালীন বীজ মানে দুর্যোগের পরে ব্যবহারের জন্য শুধু কিছু বাড়তি বীজ জমিয়ে রাখা নয়। এটি কৃষকের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত হওয়ার, ভিন্ন পথে কাজ করার সুযোগ ধরে রাখার এবং আবার চাষ শুরু করার পদ্ধতি। এতে বীজের বাজার, বেসরকারি কোম্পানি, ত্রাণ সংস্থা বা সরকারি বিতরণের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয় না (Akhter & Mazhar, 2026)।

এই মজুত দিয়ে নষ্ট হওয়া ফসল আবার বোনা যায়, কম সময়ে পাকে এমন জাত নেওয়া যায় অথবা খালি জমিতে অন্য ফসল করা যায়। কোনটি ঠিক হবে, তা পানি, মাটি, আবহাওয়া, শ্রম ও ঘরের খাবারের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে। আপদকালীন বীজ তাই ত্রাণের একটি বিচ্ছিন্ন জিনিস নয়; এটি চাষাবাদ ও প্রাণের নবায়ন চালু রাখার কৌশলের অংশ।
২০২৪ সালে অতিবৃষ্টিতে ২১৬ জন কৃষকের প্রায় ১৮০ একর জমির জন্য তৈরি আমনের বীজতলা নষ্ট হয়। নয়াকৃষির সামাজিক বীজসম্পদ কেন্দ্রগুলো বিকল্প বীজ সরবরাহ করে। মজুতের সাহায্যে ১৪২টি ধানের জাতের বীজ নতুন করে রাখার কাজও চালু রাখা সম্ভব হয়। ২০২৫ সালে শীতের কুয়াশায় নাটোরের ৫৪ জন এবং আটঘরিয়ার ৮২ জন কৃষকের সরিষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৌসুমের অবস্থা যেখানে সুযোগ দিয়েছে, সেখানে সামাজিক বীজসম্পদের সাহায্যে আবার বোনা গেছে (Akhter & Mazhar, 2026)।
পরিবারভিত্তিক সংরক্ষণ ও গবেষণার জাতীয় পরিকল্পনা
বৈশ্বিক প্রাণবৈচিত্র্য কাঠামোর ১০ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় পরিকল্পনাকে কৃষক পরিবারকে সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রাণের নবায়নের প্রতিষ্ঠান হিশাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পরিবারে বীজের কাজের সঙ্গে সমাজের নেটওয়ার্ক, সরকারি জিনব্যাংক, কৃষি গবেষণা ও দুর্যোগের প্রস্তুতি যুক্ত করা দরকার। বাংলাদেশের ভিন্ন জমি-পানি ও প্রাণপরিবেশে এমন উদ্যোগ গড়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত নয়াকৃষিতে আছে (CBD, 2022; Mazhar, 2019)।
পরিকল্পনার শুরুতে কৃষকদের নিয়ে দেখতে হবে কোন কোন জীবন্ত বীজ আছে, কারা তার যত্ন করেন, কোথায় চাষ হয়, পরিবারগুলো কীভাবে বীজ পায় এবং কী ধরনের বিপদের মুখে আছে। ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াতে কোন জাত ও ফসল কাজে আসতে পারে, মজুত কোথায় থাকবে এবং দরকারে কীভাবে সরানো হবে—স্থানীয় পরিকল্পনায় তা ঠিক করা চাই। যেসব পরিবারের জমি, বীজ রাখার জায়গা কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাব নাই, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। সংরক্ষণের সহায়তা যেন আগে থেকে থাকা বঞ্চনা আরও না বাড়ায়।
সরকারি বিজ্ঞানী ও কৃষি সম্প্রসারণকর্মীর বিশেষ দায়িত্বের পাশাপাশি নারী বীজরক্ষক, বর্গাচাষি ও ভূমিহীন পরিবারের অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব থাকা চাই। এই অবস্থানের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বক্তব্যের মিল আছে। কৃষির পরিবর্তনে মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কাজ করার সামর্থ্য, জ্ঞান এবং অংশগ্রহণকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে (High Level Panel of Experts on Food Security and Nutrition [HLPE], 2019)।
প্রাণের নবায়নে অর্থ সামর্থ্য ও জবাবদিহি
বীজের সংগ্রহকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাখার নিয়মিত কাজের জন্য অর্থ লাগবে। ভাণ্ডারে উপযুক্ত সরঞ্জাম ও রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। প্রতিবছর চাষ, শুকানো, পরীক্ষা, তথ্য রাখা ও বিনিময়ে সময় ও সম্পদ লাগে। বীজরক্ষক এবং কৃষক প্রশিক্ষকদের পারিশ্রমিক দিতে হবে। শুধু ভবন বানানোর টাকা দিয়ে এই কাজগুলো উপেক্ষা করলে দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ গড়ে উঠবে না।
সরকারি বাজেট এসব কাজ চালানোর অর্থের প্রয়োজন নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু প্রাণের নবায়নকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ধরে নেওয়ার দরকার নাই। ব্যয়ের হিসাবে নির্দিষ্ট খাতে টাকা দেওয়া ও উপকরণের প্রয়োজন বোঝা যায়। বীজের বৈচিত্র্য, জ্ঞান এবং ভবিষ্যতে চাষ করার সম্ভাবনা ধরে রাখার পুরো মূল্য তাতে ধরা যায় না। সরকারি সহায়তায় এই সামর্থ্যগুলোকে খাদ্য-পুষ্টির সার্বভৌমত্ব ও দুর্যোগ মোকাবিলার ভিত্তি হিশাবে স্বীকার করতে হবে।

বৈশ্বিক কাঠামোর ১৯ নম্বর লক্ষ্য সম্মিলিত কাজ ও বাজারের বাইরে পরিচালিত উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়। এই ধরনের সহায়তার ভিত্তি সেখানেও আছে। দেশের নিজস্ব অর্থ থেকে নির্ভরযোগ্য বরাদ্দ থাকা দরকার। উপযুক্ত ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অনুদান তা বাড়াতে পারে। কোনো সমাজ বীজের কাজকে বাণিজ্যিক লাভের প্রকল্প বানাতে পারছে কি না, সহায়তা পাওয়ার শর্ত তা হতে পারে না (CBD, 2022)।
সামর্থ্য বাড়ানোর কাজও কৃষকের বিদ্যমান জ্ঞান থেকে শুরু করে তাঁর অনুসন্ধান, সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতার ক্ষমতা বাড়াবে। ব্যবহারিক সহায়তায় বীজ শুকানো, রাখা, স্বাস্থ্য ও অঙ্কুর গজানোর ক্ষমতা পরীক্ষা এবং তথ্য রাখার কাজ উন্নত হতে পারে। যৌথ গবেষণায় পরিবারের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নিয়মমাফিক তুলনার যোগ ঘটবে। তবে ফল কৃষকের কাছে বোধগম্য ও কাজে লাগার মতো থাকতে হবে। এই সম্পর্কগুলোর জন্য দরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাকে ২০ নম্বর লক্ষ্যও সমর্থন করে (CBD, 2022)।
জাতীয় প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ১০ নম্বর লক্ষ্যের প্রধান সূচক ১০.১-এর যোগ থাকতে হবে। সূচকটি হলো মোট কৃষিজমির কত অংশে ফলনদায়ী ও দীর্ঘকাল টেকসই কৃষি চলছে। এই সূচক অনুযায়ী প্রতিবেদন দিতে নির্ধারিত পদ্ধতি মানতে হয়। কোনো জমিতে নয়াকৃষি হচ্ছে বা কত হেক্টর সহায়তা পেয়েছে, শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে সূচকের শর্ত পূরণ হয়েছে বলা যায় না। বীজের ধারাবাহিকতা, প্রাণবৈচিত্র্য ও দুর্যোগের পরে ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে কৃষকের নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ সরকারি সূচককে সমৃদ্ধ করবে। অর্থের হিশাব ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনও দরকার, তবে সেগুলোর মাপকাঠি যেন কর্মসূচির প্রাণগত ও সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণের কাজে লাগে (CBD, 2025)।
জীবন্ত কৃষক পরিবারের ভিত্তিতে জাতীয় বীজকৌশল
নয়াকৃষির অভিজ্ঞতা দেখায়, কৃষক যে সম্পর্কের মধ্যে বাঁচেন, দেখেন ও শেখেন, তার মধ্যে বীজ সংরক্ষণ ধরে রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার চাষের মধ্য দিয়ে স্বস্থানে সংরক্ষণ এবং ভাণ্ডারের মাধ্যমে স্থানীয় স্থানবহির্ভূত সংরক্ষণকে যুক্ত করে। নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই সামর্থ্য এক পরিবারের বাইরেও কাজে লাগে। সরকারি জিনব্যাংক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এর পরিপূরক সুরক্ষা ও সহযোগিতা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় দায়িত্ব হলো দুর্যোগের আগেই এই জীবন্ত ভিত্তি টিকিয়ে রাখা। বীজ, খাদ্য ও পুষ্টির সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে কৃষকসমাজ নিজের কৃষির প্রাণব্যবস্থা নবায়ন করতে এবং বদলে যাওয়া অবস্থায় বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না তার ওপর। তাই পরিবারভিত্তিক গবেষণা ও সংরক্ষণের স্বীকৃতি এবং তার কাজের জন্য সম্পদ জোগানোকে ১০ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
গোটা ব্যবস্থার ফলন ও প্রাণের নবায়ন
এক ফসলের হিসাবে কৃষির যা বাদ পড়ে
কৃষির ফলন নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে আমরা কৃষিকে কী টিকিয়ে রাখার কাজ মনে করি, সেই প্রশ্নও জড়িত। কৃষিকে মূলত বাছাই করা একটি পণ্য তৈরির কাজ ধরলে মনে হতে পারে হেক্টরপ্রতি কত উঠল, সেটিই তার সাফল্যের যথেষ্ট হিশাব। কিন্তু কৃষি যদি মাটি, পানি, গাছপালা, পশুপাখি ও মানুষের সম্পর্ক ক্রমাগত নবায়নের কাজ হয়, তাহলে ফসলের পরিমাণ অনেক বড় এক বিচারের প্রয়োজনীয় একটি পর্যবেক্ষণমাত্র। নয়াকৃষির গোটা ব্যবস্থার ফলন (systemic yield) ধারণা এই বিস্তৃত বোঝাপড়া থেকে শুরু হয় (Mazhar, 2019; Mazhar & Akhter, 2023)।
ফারাকটি মৌলিক। ধানের ফসল চাষের একটি দৃশ্যমান ফল। কিন্তু কৃষির প্রাণব্যবস্থায় এই ধানের সঙ্গে অন্য খাবার, গোখাদ্য, বীজ, প্রাণের সম্পর্ক এবং পরের চাষের শর্তও থাকে। মানুষ ব্যবস্থা থেকে কী পায় এবং ব্যবস্থা কীভাবে তাদের জীবন-জীবিকা ধরে রাখার নিজের সামর্থ্য নবায়ন করে, দুটোই এর বিচারের বিষয়। ফলে গোটা ব্যবস্থার ফলন বর্তমানের পুষ্টির সঙ্গে সময়জুড়ে প্রাণের নবায়নকে যুক্ত করে।

নয়াকৃষির সপ্তম নীতিতে গোটা কৃষিব্যবস্থার ফলন বোঝার কথা আছে। এই নীতি কৃষিকে কেবল একটি কাটা ফসলের পণ্যে নামিয়ে আনার বিরোধিতা করে। আংশিক হিসাব দিয়ে যদি সরকারি স্বীকৃতি, গবেষণাসহায়তা ও অর্থ বরাদ্দের মানদণ্ড তৈরি হয়, তাহলে সমস্যা রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। কৃষক প্রতিদিন যার ওপর নির্ভর করেন, হিশাবে বাদ পড়ার কারণে সেটিও নীতি থেকে হারিয়ে যেতে পারে (Mazhar & Akhter, 2023)।
শুধু শস্যের হিসাবে যে প্রাণসম্পর্কগুলো ধরা পড়ে না
ধানের খড়কে ঘিরে সম্পর্কগুলোই ধরা যাক। খড় গোখাদ্য, পশুর বিছানা, জ্বালানি কিংবা মাটিতে ফেরত দেওয়া জৈব পদার্থ হতে পারে। গোখাদ্য পশু টিকিয়ে রাখে, পশু গোবর দেয়, আর গোবর মাটির উর্বরতা নবায়নে অংশ নেয়। শুধু ধানের দানা দিয়ে জাতের তুলনা করলে এসব সম্পর্ক হিসাবের বাইরে থাকে। তাই খড়ের পরিমাণ ও গুণমান এবং পরিবারের হাতে বিকল্প কী আছে, তা দেখলে দানার ফলনে কোনো জাতের আপাত সুবিধার অর্থও বদলে যেতে পারে (Mazhar & Akhter, 2023)।
একই বিচার ডাল, তেলবীজ, সবজি, ফলগাছ, মাছ, পশুপালন ও অচাষের খাবারের ক্ষেত্রেও খাটে। এগুলো ক্ষেতের আল, বাড়ির আঙিনা, পুকুর কিংবা বছরের ভিন্ন মৌসুমে জায়গা করে নিতে পারে। পরিবারের জন্য রেখে দেওয়া খাবার, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় এবং পরের চাষের সম্বলও তাদের অবদানের অংশ। শুধু একটি শস্যের হিসাব এই বিচিত্র জোগান ধরতে পারে না।
প্রাণবৈচিত্র্যের মধ্যে এমন জীবও আছে, যাদের অবদান আলাদা করে কেটে বা তুলে পাওয়া জিনিস নয়। মাটির জীব জৈব পদার্থ পচানো ও পুষ্টি উপাদানের চলাচলে অংশ নেয়। অন্য পোকা খেয়ে বাঁচে এমন প্রাণসহ নানা জীব ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কে কাজ করে। গাছপালা ও আবাসের যোগসূত্র এসব জীবের টিকে থাকায় প্রভাব ফেলে। জাভার সেচনির্ভর ধানক্ষেতে সেটল ও সহকর্মীরা পরীক্ষায় দেখেছেন, জৈব পদার্থ এবং বিকল্প খাবার ক্ষতিকর পোকার প্রাকৃতিক শত্রুদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, মৌসুমের শুরুতে কীটনাশক প্রয়োগে উপকারী শিকারি জীব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরে ক্ষতিকর পোকা আবার বেড়ে উঠতে পারে। তাই ধানের চারপাশের প্রাণসম্পর্কও মূল্যায়নের মধ্যে থাকা দরকার (Settle et al., 1996)।
এই অবদানগুলো আলাদা পণ্য নয়, যেগুলো কেবল তালিকায় যোগ করলেই হবে। এগুলোর গুরুত্ব একাংশে পারস্পরিক ক্রিয়ার মধ্যে। কোনো একটি সম্পর্ক ছিন্ন হলে তখনকার ফসল ভালো থাকলেও ব্যবস্থার নবায়নের সামর্থ্য কমে যেতে পারে। তাই দৃশ্যমান ফসলের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কগুলোর অবস্থাও দেখতে হবে।
প্রাণের নবায়নের সুফলও হিসাবে বাদ পড়ে
হিসাবের সমস্যা দুই দিকেই কাজ করে। একটি কৃষিব্যবস্থার ক্ষতি তার লেখা খরচে না-ও থাকতে পারে। আবার প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক কৃষির সুফলও স্বীকৃত অবদানের বাইরে থেকে যেতে পারে। বীজের বৈচিত্র্য ধরে রাখা, মাটির জীব টিকিয়ে রাখা, অনাবাদি জায়গা থেকে খাবার পাওয়া এবং বন্যার পরে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পরিবার যে কাজ করে, পণ্য বিক্রির হিসাবে তার গুরুত্বের একাংশই দেখা যায়।
নয়াকৃষি এই সম্পর্কগুলোকে চাষাবাদ ও জীবিকার ভিত হিশাবে দেখে। পরের মৌসুমের জন্য রাখা বীজ ভবিষ্যতের বিকল্প বজায় রাখে। মাটিতে ফেরত দেওয়া জৈব পদার্থ চলমান প্রাণপ্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। কম জমির পরিবারও সবার ব্যবহারযোগ্য গোখাদ্য বা খাওয়ার উদ্ভিদ থেকে উপকার পেতে পারে। কৃষকের মধ্যে জ্ঞানের আদান-প্রদান বদলে যাওয়া অবস্থা দেখা, তুলনা ও সাড়া দেওয়ার সামর্থ্য দেয়। এক মৌসুমে ওঠা ধানের দাম দিয়ে এসবের গুরুত্ব যথাযথভাবে বোঝানো যায় না (Mazhar, 2019)।

এতে তুলনাটিই নিয়মিতভাবে একদিকে হেলে পড়তে পারে। একটি ব্যবস্থা তার প্রধান পণ্যের জন্য স্বীকৃতি পায়, অথচ তার কিছু বোঝা হিসাবে থাকে না। অন্য ব্যবস্থা প্রাণের নবায়ন ও বিচিত্র জোগান ধরে রাখলেও তার যথেষ্ট স্বীকৃতি মেলে না। ফলে পূর্ণাঙ্গ বিচার ভিন্ন কৃষিপথের পক্ষে গেলেও সংকীর্ণ হিসাব প্রাণসম্পর্ক সরল করে ফেলার চর্চাকে সুবিধা দিতে পারে।
এক মৌসুমের পর আরেক মৌসুমে ফসল ও নবায়ন
সময়ের ধারায় দেখলে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও প্রাণের নবায়নের ফারাক আরও স্পষ্ট হয়। ফসল হলো নির্দিষ্ট সময়ে কৃষিব্যবস্থা থেকে তুলে নেওয়া জিনিস। আর নবায়নের সামর্থ্য হলো সেই চলমান শর্তগুলো, যেগুলোর কারণে পরের ফসল ও অন্য প্রাণের জীবন সম্ভব হয়। এর মধ্যে মাটির উর্বরতা, পানি, জীবন্ত বীজ, প্রাণের সম্পর্ক এবং সেগুলো ধরে রাখার জ্ঞান ও সহযোগিতা আছে।
গোটা ব্যবস্থার ফলনের পরিধি তাই একটি ফসলের হিশাবের চেয়ে বড়। সংকীর্ণ হিসাব যেসব জোগান ও নবায়নের সুফল দেখতে পায় না, তা এখানে ধরা পড়ে। যেখানে এসব সুফল আছে, সেখানে শুধু শস্যের হিসাব কৃষিব্যবস্থার অবদানকে ছোট করে দেখায়। প্রচলিত ফলন-তুলনা নিয়ে নয়াকৃষির আপত্তির নির্দিষ্ট ভিত্তি এখানেই।
দীর্ঘ সময়ের গবেষণা কী দেখায়
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাও তাৎক্ষণিক ফসলের বাইরে তাকানোর যুক্তি জোরালো করে। রাভেলোয়ারিতিয়ানা ও ওয়াঙ্গার ১৮৪টি গবেষণা-সমন্বয় বিচার করে দেখেছেন, সময়ের সঙ্গে আর্থিক লাভ, প্রাণবৈচিত্র্য, পরাগায়ন, মাটির গুণ ও কার্বন ধরে রাখায় উন্নতি হয়েছে। তবে ফসলের ফলন, পোকা নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সময়ের সঙ্গে বদলের সামগ্রিক প্রবণতা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। চর্চা ও পরিবেশভেদে ফল আলাদা হয়েছে (Raveloaritiana & Wanger, 2026)।
গোটা ব্যবস্থার ফলন দুর্যোগ ও জাতীয় নীতি
গড়ে বেশি ফসল হলেই বড় বিপর্যয়ে কোনো পরিবার খাদ্য ও জীবিকা ধরে রাখতে পারবে, তা প্রমাণ হয় না। একই ধাক্কায় ব্যবস্থার ভিন্ন অংশ ভিন্নভাবে সাড়া দেয় কি না, জীবন্ত বীজ পাওয়া যায় কি না এবং পরিবার আবার চাষ গুছিয়ে নিতে পারে কি না—দুর্যোগ সামলানোর ক্ষমতা আংশিকভাবে এসবের ওপর নির্ভর করে। বৈচিত্র্য বিকল্প দেয়; কাজের প্রতিষ্ঠান সেই বিকল্প ব্যবহারযোগ্য করে।
তাই গোটা ব্যবস্থার বিচারে কঠিন মৌসুমেও পুষ্টির জোগান চালু থাকে কি না দেখতে হবে। মাঠের চাষ নষ্ট হলে গোখাদ্য দেয় এমন ফসল, আবার বোনার বীজের মজুত কিংবা বাড়ির আঙিনার সবজি বিশেষ কাজে আসতে পারে। প্রধান ফসল ওজন করেই বিচার শেষ না করে সময়ের ধারায় পরিবারের প্রয়োজন ও প্রাণব্যবস্থার ঘুরে দাঁড়ানো অনুসরণ করলে এগুলোর গুরুত্ব বোঝা যায়।
বাংলাদেশের নীতিগত কাজ তাই দুই দিক একসঙ্গে বিচার করা। কৃষির কোনো উদ্যোগ এখন যথেষ্ট খাবার জোগাতে কী ভূমিকা রাখছে এবং পরের চাষের প্রাণভিত্তির ওপর তার কী প্রভাব পড়ছে। সরকারি গবেষণায় নির্দিষ্ট ফসলের ফলন মাপা চলবে, পাশাপাশি একাধিক মৌসুম ধরে গোটা ব্যবস্থার তুলনাও করতে হবে। নিজের হিসাবের বাইরে অন্য মানুষ ও পরিবেশের ওপর চাপানো ক্ষতি (externalised damage), বিচিত্র খাদ্যজোগান, নবায়নের ক্ষমতা এবং শ্রম ও সুফল কার মধ্যে কীভাবে বণ্টিত হয়, তা দেখতে হবে।
কৃষকের নেতৃত্বে একাধিক মৌসুমের পর্যবেক্ষণ, সামাজিক বীজব্যবস্থা, প্রাণের আবাস ফিরিয়ে আনা এবং এই কৃষিপথে যাওয়ার বাস্তব প্রয়োজনগুলো সরকারি অর্থে সহায়তা পাওয়া উচিত। নয়াকৃষি পরিবার গবেষণার প্রশ্ন ঠিক করা ও ফল বোঝার কাজে থাকবে। সংকীর্ণভাবে সাজানো ফসলের পরীক্ষায় যে সম্পর্ক বাদ পড়তে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কৃষকের দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণে। একমত হয়ে ঠিক করা পদ্ধতি, মাটি-পানির পরীক্ষা এবং ভিন্ন কৃষি-পরিবেশের অঞ্চলের তুলনা দিয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এই কাজকে শক্তিশালী করতে পারে।
এই পদ্ধতি বৈশ্বিক প্রাণবৈচিত্র্য কাঠামোর ১০ নম্বর লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ফলনের সামর্থ্য ও দুর্যোগ মোকাবিলার সঙ্গে প্রাণবৈচিত্র্য বজায় রেখে কৃষি পরিচালনার যোগ আছে। এক ফসলের বড় ফলনকেই লক্ষ্য পূরণ ধরে নিলে চলবে না। কৃষিব্যবস্থা এসব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখছে কি না, বাস্তবায়নে তার প্রমাণ দরকার (CBD, 2022)।
নয়াকৃষির গোটা ব্যবস্থার ফলন ধারণা তাই কৃষি বিচার করার ভিত্তি বদলে দেয়। প্রশ্ন হলো, প্রাণের যেসব সম্পর্কের মধ্য দিয়ে খাদ্য ও জীবিকা সম্ভব হয়, সেগুলো নবায়ন করে চাষাবাদ কীভাবে যথেষ্ট খাবার ও জীবিকা ধরে রাখে। শস্যের ফলন এই অনুসন্ধানের অংশ। কিন্তু প্রতি ফসল সম্ভব করে তোলে যে জীবন্ত ব্যবস্থার অবিরাম নবায়ন, শস্যের ফলন একা তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

অন্য দেশের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার বড় শিক্ষা হলো, প্রাণবৈচিত্র্য যে বিকল্প দেয়, তার সঙ্গে সেই বিকল্প কাজে লাগানোর প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক। দরকারের সময় কৃষকের কাছে জীবন্ত বীজ না পৌঁছালে বৈচিত্র্যের সুরক্ষা সামান্যই। নিয়মিত বীজ নবায়ন, জ্ঞানী বীজরক্ষক ও চাষের সুযোগ ছাড়া একটি ভাণ্ডার ভবন দিয়েও বেশি কিছু হয় না। নয়াকৃষি পরিবার ও সমাজের নেটওয়ার্কে এই কাজগুলো একসঙ্গে করে। অন্য দুর্যোগপ্রবণ কৃষি অঞ্চলের জন্যও এই সমন্বয় ব্যবহারিক নীতিশিক্ষা দেয় (Mazhar & Akhter, 2023; Akhter & Mazhar, 2026)।
ছড়িয়ে থাকা বীজরক্ষার দায়িত্ব, ফসল ও আবাসের বৈচিত্র্য, কৃষকের নেতৃত্বে অনুসন্ধান এবং চাষের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে আপদের প্রস্তুতি—এসব নীতি অন্য জায়গায় কাজে লাগতে পারে। অন্য দেশের বন্যাপ্রবণ সমাজ আপদকালীন বীজের পরিকল্পনা থেকে সরাসরি শিখতে পারে। খরাপ্রবণ এলাকায় পানির চাহিদা, বোনার সুযোগ ও মাটি ঢেকে রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব লাগতে পারে। উপকূল ও লবণাক্ত এলাকার জন্য নিজস্ব বাছাই ও বিচার দরকার। তাই স্থানীয় পরীক্ষা থেকেই ফসল ও জাতের সমন্বয় ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট চাষের পঞ্জিকাকে সর্বত্র খাটে এমন বিধান করা যায় না।
প্রয়োগ নির্ভর করবে জমি ও পানি ব্যবহারের সুযোগ, শ্রম, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, জমির ভোগদখল ও চাষের অধিকার, বীজের নিয়ম এবং স্থানীয় সংগঠনের শক্তির ওপরও। যেখানে এসব আলাদা, সেখানে যাঁরা প্রতিষ্ঠান চালাবেন তাঁদের সঙ্গে নিয়েই তার ব্যবস্থা গড়তে হবে। কৃষকের মধ্যে বিনিময়ে অভিজ্ঞতা ছড়াতে পারে, তবে জ্ঞান বা বীজ অন্য জায়গায় নিলেই মানিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক বীজ বিনিময়ে উদ্ভিদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও সম্পদে প্রবেশাধিকারের প্রযোজ্য নিয়ম মানতে হবে। পদ্ধতি বিনিময় ও যৌথ পর্যবেক্ষণও উপযুক্ত অংশীদারির মধ্য দিয়ে চলতে পারে।

আগে আলোচিত আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বাংলাদেশের বাইরেও এই প্রাণসম্পর্কগুলোর গুরুত্বের পক্ষে প্রমাণ দেয়। নয়াকৃষির নজির দেখায়, বাস্তবে সেগুলো কীভাবে সংগঠিত হয়। কোনো প্রমাণই সব বিপদে একই ফলের নিশ্চয়তা দেয় না। আন্তর্জাতিক পরিসরে নয়াকৃষির উপযুক্ত ভূমিকা তাই তুলনামূলক শিক্ষা ও নীতি গড়ার অংশীদার হিশাবে। এই অভিজ্ঞ আন্দোলনের নীতি থেকে স্থানীয় মানুষের কর্তৃত্বে মানিয়ে নেওয়ার পথ শেখা যায়। পাশাপাশি ভিন্ন মৌসুম ও বিপর্যয়ে কী ফল হচ্ছে, তা বিচার করতে হবে (Tamburini et al., 2020; Rasmussen et al., 2024)।
উপসংহার ও নীতির দিশা
বাংলাদেশের জন্য নয়াকৃষির গুরুত্ব তার কৃষিবোধে। খাদ্য পাওয়া, জীবিকা চালানো এবং প্রাণময় জগতে বাস করার যেসব সম্পর্ক, কৃষি সেগুলোর চলমান নবায়ন। বীজ, মাটি, পানি, ফসল, পশুপাখি, জলজ প্রাণ ও অনাবাদি উদ্ভিদ একই প্রাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কৃষক দেখা, বাছাই, চাষ, বিনিময় ও সম্মিলিত যত্নের মধ্য দিয়ে তার নবায়নে অংশ নেন। এখানে প্রাণবৈচিত্র্য চাষের বাইরে আলাদা করে বাঁচিয়ে রাখার বিষয় নয়; তা কৃষির জীবন্ত ভিত (Mazhar, 2019; Mazhar & Akhter, 2023)।
এই ফারাক কৃষির সাফল্য বোঝার ধরন বদলে দেয়। বেশি ধান ওঠা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই পরিমাণ একা বলে না, কৃষিব্যবস্থা যথেষ্ট পুষ্টি দিচ্ছে কি না, বীজের বৈচিত্র্য ও পানি রক্ষা করছে কি না কিংবা ভবিষ্যতের চাষের শর্ত মজবুত করছে কি না। ধান ও লাভে আটকে থাকা বিচারে অন্যের ওপর চাপানো ক্ষতি এবং কৃষকের ধরে রাখা নবায়নের সুফল—দুটোই বাদ পড়তে পারে। তাই গোটা ব্যবস্থার বিচারে নানা ফসলের সঙ্গে প্রাণসম্পর্কের নবায়ন, শ্রম ও সুফলের বণ্টন এবং কঠিন মৌসুমে পরিবারের টিকে থাকার সামর্থ্য দেখতে হবে।
দুর্যোগে এই পদ্ধতির গুরুত্ব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। ঘুরে দাঁড়াতে জীবন্ত ও উপযুক্ত বীজ, কাজের উপযোগী মাটি-পানির ব্যবস্থা, খাবারের বিচিত্র উৎস এবং আবার চাষ গুছিয়ে নেওয়ার মানুষ দরকার। কোন জাত কখন, কোথায় ও কীভাবে হবে—কৃষকের এই জ্ঞানের মধ্য দিয়ে বীজের সংগ্রহ কাজে আসে। তাই দুর্যোগ সামলানোর ক্ষমতা নির্ভর করে জীবন্ত বীজব্যবস্থা এবং তাকে ধরে রাখা পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতার ওপর। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা মানে দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যে বিনিয়োগ।
এই সম্পর্কগুলোকে জাতীয় কৃষিনীতিতে আনার ভিত্তি দেয় বৈশ্বিক প্রাণবৈচিত্র্য কাঠামোর ১০ নম্বর লক্ষ্য। এটি প্রাণবৈচিত্র্য ব্যবহার করে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ভিত্তি দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখার কথা বলে। প্রাণসম্পর্কভিত্তিক কৃষিসহ প্রাণবৈচিত্র্যের সহায়ক চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথাও আছে। এর উদ্দেশ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, দুর্যোগ সামলানো, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও পুনরুদ্ধার এবং প্রাণপ্রক্রিয়া চালু রাখার যোগ আছে (CBD, 2022)। বাংলাদেশে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, অনুসন্ধান ও উন্নত করার জন্য নয়াকৃষি কৃষকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতা জোগায়।
কৃষকের নেতৃত্বে প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক কৃষিকে জাতীয় নীতির দিশা করা
১০ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নের কৌশলগত পথ হিশাবে বাংলাদেশকে কৃষকের নেতৃত্বে প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক কৃষির স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বীকৃতির সঙ্গে দায়িত্ব, বাজেট ও সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকা চাই। কৃষি, পরিবেশ, পানি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই বাস্তবায়ন কাঠামোয় কাজ করতে হবে। শুরু থেকেই সিদ্ধান্তে কৃষকের সংগঠন থাকবে।
পরিবার, গ্রাম ও বৃহত্তর এলাকার স্তরে ক্ষেত, বাড়ির আঙিনা, পুকুর, জলাভূমি ও সবার ব্যবহারযোগ্য সম্পদ একসঙ্গে কীভাবে কাজ করবে, কাঠামোতে তা নির্ধারণ করা দরকার। আশপাশের পানি দূষিত হলে, জলাভূমির যোগ ছিন্ন হলে কিংবা খাবার ও গোখাদ্যের সাধারণ উৎসে অধিকার হারালে একটি জমিতে এই কৃষিকে উৎসাহ দিয়েও সীমিত ফল হবে। তাই প্রশাসন ও খাতের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় পরিকল্পনায় এসব সম্পর্ক ধরতে হবে।
সরকার ও নয়াকৃষি কৃষকসমাজের আনুষ্ঠানিক অংশীদারির মধ্য দিয়ে এই নীতির পথ গড়া উচিত। উবিনীগ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করবে। অংশীদারি বিদ্যমান চর্চাকে শক্তি দেবে এবং ভিন্ন কৃষি-পরিবেশে তা মানিয়ে নেওয়া বিচার করবে। একটি জীবন্ত আন্দোলনকে কিছু বাঁধাধরা কৌশলের প্যাকেজ না বানিয়ে শেখার বিস্তৃত সামর্থ্য বাড়ানোই সরকারি স্বীকৃতির কাজ।

বিস্তার ঘটাতে বিদ্যমান কৃষক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, পাশের সমাজগুলোকে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়তে সাহায্য এবং ধারাবাহিকতার পথে নীতিগত বাধা সরানো দরকার। বীজরক্ষা, প্রাণসম্পর্ক ও কৃষকের সিদ্ধান্তের অধিকার টেকানো গেলেই পরিবারের সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ থাকে। সরকারকে তাই জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য পরিকল্পনা ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে এই পদ্ধতি যুক্ত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে একমত হয়ে চাষ, পানি, আবাস ও দুর্যোগের প্রস্তুতির পরিকল্পনাও করতে হবে।
বীজের সার্বভৌমত্বকে জরুরি জাতীয় সামর্থ্য হিশাবে ধরা
জাতীয় কৌশলে কৃষকের নানা বীজ রাখা, বাছাই, চাষ, নবায়ন ও বিনিময়ের সামর্থ্যকে সহায়তা দিতে হবে। সামাজিক বীজ প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য ঘর, স্থানীয় অবস্থার উপযুক্ত সংরক্ষণ, অঙ্কুর গজানোর পরীক্ষা, তথ্য রাখা এবং ভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে মজুত দরকার। এতে এক দুর্যোগে গোটা সংগ্রহ হারানোর আশঙ্কা কমে। আবার চাষ শুরুর দরকারে পরিবার উপযুক্ত বীজ পাচ্ছে কি না, তা দিয়েও প্রতিষ্ঠানের কাজ বিচার করতে হবে।
কৃষক পরিবারকে সংরক্ষণ ও গবেষণার অপরিহার্য ভিত্তি হিশাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নিয়মিত চাষ ও বাছাইয়ের মাধ্যমে তার ক্ষেত সংরক্ষণের কাজ করে। ঘর ও সামাজিক ভাণ্ডার দুই চাষের মাঝখানে বীজ রাখে। এভাবে সংরক্ষণের সঙ্গে ব্যবহার, পর্যবেক্ষণ ও মানিয়ে নেওয়ার যোগ থাকে।
সংগ্রহ রক্ষা ও গবেষণায় বৈজ্ঞানিক জিনব্যাংকের জরুরি পরিপূরক ভূমিকা আছে। বীজ ফেরত দেওয়ার সহজ ব্যবস্থা, একসঙ্গে জাতের বৈশিষ্ট্য চেনা এবং কৃষকের নেতৃত্বে পরীক্ষা দিয়ে কৃষকসমাজের সঙ্গে যোগ গড়লে তার অবদান বাড়ে। ভাণ্ডারে বীজ এবং যে জীবন্ত পরিস্থিতিতে তার গুণ জানা যায়, সংরক্ষণের নীতিকে সেই সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে।
বীজ, খাদ্য ও পুষ্টির সার্বভৌমত্ব এসব ব্যবস্থার জাতীয় নীতিগত অঙ্গীকার হওয়া চাই। এর অর্থ, কী চাষ হবে ও মানুষ কী খাবে, তা নির্ধারণের সম্পদ ও সিদ্ধান্তে মানুষের বাস্তব কর্তৃত্ব মজবুত করা। বীজ হাতে পৌঁছালেই হবে না; ব্যবহার নিয়ে কৃষকের অর্থপূর্ণ বাছাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে।
প্রাণের নবায়ন ও ন্যায্য পরিবর্তনের অর্থ জোগানো
এই কৃষি সম্ভব করে যে কাজগুলো, সরকারি অর্থে সেগুলোকে সহায়তা দিতে হবে। বীজ নবায়ন, প্রাণের আবাসের যত্ন, মাটির নবায়ন, কৃষকের কাছে কৃষকের শেখা, উপযুক্ত যন্ত্র, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ এর অন্তর্ভুক্ত। সহায়তা কয়েকটি চাষের মৌসুমজুড়ে থাকা দরকার। অল্পদিনের প্রকল্পে প্রাণসম্পর্কের বদল ও জীবিকার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সহায়তা হয় না।
কৃষির ব্যয় ও ভর্তুকির কর্মসূচি প্রাণবৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য এবং কেনা উপকরণের ওপর কৃষকের নির্ভরতায় কী প্রভাব ফেলছে, তা পর্যালোচনা করতে হবে। সহায়তার দিক বদলাতে পরিকল্পিত পরিবর্তন চাই। সঙ্গে কারিগরি সহায়তা ও আর্থিক সুরক্ষা থাকবে, যাতে গরিব পরিবারকে অন্যদের তুলনায় বেশি ঝুঁকি বইতে না হয়।
জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থও সামাজিক বীজব্যবস্থা ও চাষের প্রাণভিত্তি মজবুত করবে। বীজের মজুত, স্থানীয় জ্ঞান এবং কার্যকর প্রাণের আবাস দুর্যোগের পরের মতো আগেও সহায়তা পাওয়ার দাবিদার।
আলাদা বাজেটে বীজরক্ষার দায়িত্ব, নিয়মিত নবায়ন ও কৃষি সম্প্রসারণের চলতি ব্যয়কে ভাণ্ডার, পরীক্ষার সরঞ্জাম ও আবাস পুনরুদ্ধারের বিনিয়োগ থেকে পৃথক করে দেখাতে হবে। জবাবদিহিমূলক কৃষক প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছভাবে অনুদান দিতে হবে। হিসাবের নিয়ম কাজের আয়তনের উপযুক্ত হবে; অর্থের হিসাব রাখতে সহায়তাও মিলবে, যাতে ছোট দলগুলো অংশ নিতে পারে। দেশের বরাদ্দ ধারাবাহিকতা দেবে। যোগ্যতার শর্ত ও জাতীয় অগ্রাধিকার মিললে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য ও অভিযোজনের অর্থ বাড়তি সহায়তা দেবে। কার্বন ক্রেডিট—অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়মে কার্বন নিঃসরণ কমানো বা ধরে রাখার স্বীকৃত ইউনিট—বিক্রি কিংবা বীজরক্ষা থেকে বাণিজ্যিক লাভকে অর্থ পাওয়ার শর্ত করা উচিত নয়।
সরকারি খাদ্য ক্রয়, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উপযুক্ত বাজারের ব্যবস্থা এই কৃষিপথে যাওয়ার জীবিকা টিকিয়ে রাখতে পারে। নানারকম নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারকে এসব ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ঘরের খাওয়া ও সমাজের বিনিময়ও চাষের বৈধ উদ্দেশ্য থাকবে। উপযুক্ত সামাজিক সুরক্ষা ও সময়মতো দুর্যোগ সহায়তা দিয়ে পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে; সব জায়গায় একই চাষের প্যাকেজ চাপানো চলবে না।
কৃষকের সময় বিনা মূল্যের ধরে প্রাণের নবায়ন চলতে পারে না। বীজের যত্ন, পশুপালন, খাবার সংগ্রহ ও ঘরের পুষ্টিতে নারীর কাজকে সম্পদ, সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব এবং অতিরিক্ত কাজ কমানোর বাস্তব ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বীকৃতি দিতে হবে।
কৃষক পরিবারকে ঘিরে গবেষণা ও সম্প্রসারণ সাজানো
কৃষকের নেতৃত্বে গবেষণা সরকারি কৃষি গবেষণার নিয়মিত অংশ হতে হবে। নয়াকৃষি পরিবার এক মৌসুম থেকে অন্য মৌসুমে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের জায়গা দেয়। স্বল্প সময়ের ফসল পরীক্ষায় বাদ পড়া কঠিন সময়ও সেখানে দেখা যায়। গবেষণার প্রশ্ন ঠিক করা, তুলনা বাছা, ফলের ব্যাখ্যা ও ব্যবহার নির্ধারণে কৃষক অংশ নেবেন।

বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণকর্মী মাটি-পানির বিশ্লেষণ, পরীক্ষার পদ্ধতি, বীজের স্বাস্থ্য ও তথ্য রাখায় সাহায্য করতে পারেন। তাঁদের কাজ হবে কৃষককে নিজের অবস্থা অনুসন্ধানে আরও সক্ষম করা। তাই নির্দিষ্ট ফসলের জ্ঞানের সঙ্গে মিশ্র চাষ, প্রাণের সম্পর্ক, বীজের বৈচিত্র্য, পুষ্টি এবং কৃষকের সঙ্গে যৌথ অনুসন্ধানে সম্প্রসারণসেবার প্রশিক্ষণ দরকার।
গবেষণায় ফসল ও নবায়নের সামর্থ্য দুটোই অনুসরণ করতে হবে। পুষ্টি উপাদানের চলাচল, প্রাণের সম্পর্ক, ঘরের পুষ্টি, শ্রমের প্রয়োজন এবং বিপর্যয়ের পরে ঘুরে দাঁড়ানো দেখতে হবে। কোন জমি, কত সময় এবং বাইরে থেকে নেওয়া কত সম্পদের মধ্যে তুলনা হচ্ছে, তা স্পষ্ট থাকা চাই।
প্রাণ ও সমাজের বাস্তব ফল দিয়ে অগ্রগতি মাপা
বাস্তবায়নের শুরুতে বর্তমান অবস্থার একটি ভিত্তি-হিসাব, স্থানীয় অবস্থার উপযুক্ত ধাপ এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রকাশ্য ফলাফল দরকার। ফসলের ফলনের পাশাপাশি চাষের ও চাষের সঙ্গে যুক্ত অন্য প্রাণবৈচিত্র্য, নিয়মিত বীজ পাওয়ার সুযোগ, মাটি-পানির অবস্থা, ঘরের খাবারের বৈচিত্র্য, ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ এবং দুর্যোগের পর চাষ ফিরতে কত সময় লাগে, তা দেখতে হবে।
এই প্রস্তাবিত জাতীয় মাপকাঠি কৃষকের সঙ্গে গড়ে বৈশ্বিক কাঠামোর অগ্রগতি মাপার ব্যবস্থার সঙ্গে মেলাতে হবে। FAO-এর প্রাণসম্পর্কভিত্তিক কৃষিচর্চার সাফল্য যাচাইয়ের পদ্ধতি (Tool for Agroecology Performance Evaluation বা TAPE) একাধিক দিক থেকে বিচার করার সূচনা হতে পারে। তবে কৃষকের সঙ্গে আলোচনা করে তা মানিয়ে নিতে হবে; প্রাণের নবায়ন ও ভালো থাকা নিয়ে কৃষকের নিজস্ব বিচারের বদলি করা যাবে না (FAO, 2019)। কত প্রশিক্ষণ হলো, উপকরণ গেল বা প্রদর্শনী জমি চিহ্নিত হলো, তা গুনেই প্রাণবৈচিত্র্য ও দুর্যোগ সামলানোর ক্ষমতা বেড়েছে বলা যায় না।
জবাবদিহির বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় কোন প্রতিষ্ঠান কী করবে, অর্থ কীভাবে সমাজে পৌঁছাবে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা ব্যর্থতার কথা জানানোর সুযোগ কৃষক কীভাবে পাবেন, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। একসঙ্গে অগ্রগতি বিচার করতে হবে। প্রমাণে কোনো উদ্যোগ অকার্যকর বা নতুন বোঝা তৈরির কারণ হলে তা বদলানোর ক্ষমতাও থাকবে।
বার্ষিক প্রকাশ্য পর্যালোচনায় ব্যয় ও সহায়তাপ্রাপ্ত জমির সঙ্গে প্রাণব্যবস্থা ও পরিবারের বাস্তব ফলের যোগ দেখতে হবে। দরকারমতো নারী-পুরুষ, জমির অধিকার ও খামারের অবস্থাভেদে তথ্য আলাদা করে বিচার করতে হবে। বীজ, অর্থ বণ্টন বা বাদ পড়া নিয়ে কৃষক যেন সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন। একই পর্যালোচনায় কৃষিসহায়তা, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও পানি ব্যবস্থাপনার বিরোধগুলো খুঁজে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জবাব চাইতে হবে। এভাবে ১০ নম্বর লক্ষ্য আলাদা একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজের বদলে সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের দিশা হবে।

বাংলাদেশ ভবিষ্যতের কৃষির জন্য কোন ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে চায়, কেন্দ্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত সেখানেই। নয়াকৃষি এমন পথ দেয়, যেখানে যথেষ্ট ফসল, বিচিত্র পুষ্টি, বীজের সার্বভৌমত্ব ও দুর্যোগ সামলানোর সামর্থ্য জীবন্ত ব্যবস্থার চলমান নবায়নের ওপর দাঁড়ায়। এই বোঝাপড়া দিয়ে ১০ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়ন করলে প্রাণবৈচিত্র্য কৃষি পরিকল্পনা, সরকারি অর্থ ও গবেষণার অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। একই সঙ্গে দেশের খাদ্য ও ভবিষ্যৎ যে প্রাণসম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, তার সক্রিয় রক্ষক ও অনুসন্ধানী হিশাবে কৃষক পরিবার স্বীকৃতি পাবে।
গ্রন্থপঞ্জি
মূল প্রকাশনা খুঁজে পাওয়ার সুবিধার জন্য তথ্যসূত্রের নাম ও প্রকাশনার বিবরণ মূল ভাষায় রাখা হয়েছে।
Akhter, F., & Mazhar, F. (2026, July 26). Apadkalin seed: Seeds for emergency. UBINIG. https://ubinig.org/index.php/home/showAerticle/307/english/index.html
Convention on Biological Diversity. (1992). Convention on Biological Diversity. https://www.cbd.int/convention/text
Convention on Biological Diversity. (2022). Kunming–Montreal Global Biodiversity Framework (Decision 15/4). https://www.cbd.int/doc/decisions/cop-15/cop-15-dec-04-en.pdf
Convention on Biological Diversity. (2025). Monitoring framework for the Kunming–Montreal Global Biodiversity Framework (Decision 16/31). https://www.cbd.int/doc/decisions/cop-16/cop-16-dec-31-en.pdf
Food and Agriculture Organization of the United Nations. (2014). Genebank standards for plant genetic resources for food and agriculture (Rev. ed.). https://www.fao.org/4/i3704e/i3704e.pdf
Food and Agriculture Organization of the United Nations. (2019). TAPE: Tool for Agroecology Performance Evaluation 2019—Process of development and guidelines for application. Test version. https://www.fao.org/agroecology/in-action/detail/tool-for-agroecology-performance-evaluation-(tape)---test-version/en
Food and Agriculture Organization of the United Nations. (2023, November 6). Hidden costs of global agrifood systems worth at least $10 trillion. https://www.fao.org/newsroom/detail/hidden-costs-of-global-agrifood-systems-worth-at-least--10-trillion/en
Food and Agriculture Organization of the United Nations. (n.d.). Glossary. In Land evaluation for irrigated agriculture. https://www.fao.org/4/X5648E/x5648e0m.htm
High Level Panel of Experts on Food Security and Nutrition. (2019). Agroecological and other innovative approaches for sustainable agriculture and food systems that enhance food security and nutrition (Report 14). Committee on World Food Security. https://www.fao.org/fileadmin/user_upload/hlpe/hlpe_documents/HLPE_Reports/HLPE-Report-14_EN.pdf
Intergovernmental Panel on Climate Change. (2022). Climate change 2022: Impacts, adaptation and vulnerability. Contribution of Working Group II to the Sixth Assessment Report of the Intergovernmental Panel on Climate Change. Cambridge University Press. https://doi.org/10.1017/9781009325844
Mazhar, F. (2019). Nayakrishi Andolon. In A. Kothari, A. Salleh, A. Escobar, F. Demaria, & A. Acosta (Eds.), Pluriverse: A post-development dictionary (pp. 247–250). Tulika Books.
Mazhar, F., & Akhter, F. (2023). Nayakrishi Andolon: A farmers’ movement for seed & food sovereignty and biodiversity. Shashya Prabartana.
Ministry of Environment, Forest and Climate Change. (2022). National adaptation plan of Bangladesh (2023–2050). Government of Bangladesh. https://unfccc.int/documents/637588
Rasmussen, L. V., Grass, I., Mehrabi, Z., Smith, O. M., Bezner-Kerr, R., Blesh, J., Garibaldi, L. A., Isaac, M. E., Kennedy, C. M., Wittman, H., Batáry, P., Buchori, D., Cerda, R., Chará, J., Crowder, D. W., Darras, K., DeMaster, K., Garcia, K., Gómez, M., … Kremen, C. (2024). Joint environmental and social benefits from diversified agriculture. Science, 384(6691), 87–93. https://doi.org/10.1126/science.adj1914
Raveloaritiana, E., & Wanger, T. C. (2026). Long-term agricultural diversification increases financial profitability, biodiversity, and ecosystem services: A second-order meta-analysis. Nature Communications, 17, Article 1016. https://doi.org/10.1038/s41467-025-67757-7
Settle, W. H., Ariawan, H., Astuti, E. T., Cahyana, W., Hakim, A. L., Hindayana, D., Lestari, A. S., Pajarningsih, & Sartanto. (1996). Managing tropical rice pests through conservation of generalist natural enemies and alternative prey. Ecology, 77(7), 1975–1988. https://doi.org/10.2307/2265694
Tamburini, G., Bommarco, R., Wanger, T. C., Kremen, C., van der Heijden, M. G. A., Liebman, M., & Hallin, S. (2020). Agricultural diversification promotes multiple ecosystem services without compromising yield. Science Advances, 6(45), eaba1715. https://doi.org/10.1126/sciadv.aba1715
UBINIG. (2021, September 18). Untimely flood and the resilience of Nayakrishi farmers. https://ubinig.org/index.php/home/showAerticle/245/english/UBINIG/Untimely-flood-and-the-resilience-of-Nayakrishi-farmers
UBINIG. (2022, November 14). Nayakrishi farmers’ seed preservation, land rights, and women’s empowerment. https://ubinig.org/index.php/home/showAerticle/267/UBINIG/Nayakrishi-farmers%E2%80%99-seed-preservation-land-rights-and-women%E2%80%99s-empowerment/index.html
UBINIG. (n.d.). Nayakrishi seed conservation programme information [Unpublished programme information supplied for this policy paper].
United Nations General Assembly. (2018). United Nations Declaration on the Rights of Peasants and Other People Working in Rural Areas (A/RES/73/165). https://documents.un.org/doc/undoc/gen/n18/448/99/pdf/n1844899.pdf
ফরিদা আখতার, উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা) বাংলাদেশ