নয়াকৃষির আলোতে আলোকিত চিলমারী চর
কুড়িগ্রাম জেলার ছোট একটি থানা চিলমারী। চিলমারী উত্তর বঙ্গের একটি নামকরা বন্দর। ‘‘হাকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে”- এই ভাওয়াইয়া গান সকলেরই কম বেশি শোনা। ব্রক্ষ্মপুত্র নদের বুকে এই বন্দর অবস্থিত। চিলমারীর ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন শুরু হয় ১৯৭০ সাল থেকে। এর আগেও ব্রক্ষ্মপুত্র নদ ভেঙ্গেছে কিন্তু ১৯৭০ সাল থেকে ভাঙ্গন বেশি মাত্রায় শুরু হয়। ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন এর আগে এত মারাত্মক আকার ধারণ করে নি। চিলমারীর যে আদি বন্দর ১৯৭১ সালে তা ভেঙ্গে আরও সাত কিলোমিটার নদের গর্ভে চলে যায়। চিলমারী থানার উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রক্ষ্মপুত্র নদ।
নয়টি থানা নিয়ে অবস্থিত কুড়িগ্রাম জেলা। এর মধ্যে একটি থানা চিলমারী। চিলমারী থানার মধ্যে আছে ছয়টি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নগুলো হলো-
১. চিলমারী সদর, ২. অষ্টমীর চর, ৩. নয়ার হাট, ৪. রাণীগঞ্জ, ৫. থানা হাট ও ৬. রমনা।
ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে অষ্টমীর চর, নয়ার হাট ও চিলমারী বর্তমানে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের চরে পরিণত হয়েছে। বাকি তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে রমনা ৬০ ভাগ, থানাহাট ৪০ ভাগ এবং রাণীগঞ্জ ৫০ ভাগ নদের গর্ভে বিলিন হয়ে আছে। চিলমারী বন্দরটি রমনা থানার মধ্যে।
চিলমারী দীর্ঘদিন ধরে গরু-মহিষের জন্য বিখ্যাত। একটি ছোট ইউনিয়ন হওয়া সত্ত্বেও এখানে গরু-মহিষের সংখ্যা বেশি। চাষাবাদ ছাড়াও যানবাহনের প্রধান মাধ্যম এখানে গরু-মহিষ। বার বছর আগেও গরুর গাড়ি ছিল চিলমারীর প্রধান যানবাহন। যে কোন মালামাল টানা, নতুন বউয়ের বাপের বাড়ি যাওয়া সব কাজই চলতো গরুর গাড়িতে। এখন গরুর গাড়ি কমে গেছে, পাশাপাশি এসেছে বাস, কোষ্টার, টেম্পু, ভ্যান গাড়ি ও রিক্সা। কিন্তু চর এলাকায় যেতে হলে একমাত্র অবলম্বন নৌকা। চিলমারী বন্দরে ইঞ্জিন চালিত ভাড়া নৌকা সবসময় পাওয়া যায়। তবে শুকনা মৌসুমে কোন কোন চরে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা যায়।
চরের বেশিরভাগ ঘর কাশ বনের তৈরী। ঘরের বেড়াও কাশ বনের। দুই-একটা টিনের ঘর আছে, কারিতাস (বেসরকারী প্রতিষ্ঠান) সংগঠনের মাধ্যমে পেয়েছে। পরিবারগুলোতে বেশিরভাগ একটা করে ছাপড়া ঘর। কেউ কেউ ছাপড়া ঘরের সাথে রান্না এবং খড়ি রাখার ব্যবস্থা করেছে। এই চরের মানুষ দিনে দুইবার রান্না করে, সকালে ও বিকালে। রান্নার জন্য এখানে খড়ি কিনতে হয় না। ব্রক্ষ্মপুত্র নদ থেকে ছোট ছেলে মেয়েরা এবং বয়স্ক মহিলারা ভেসে যাওয়া কাঠ, খড়ি কুড়িয়ে আনে। শুধু খড়ি নয় কলা গাছ, কচু গাছ এগুলোও তারা নদী থেকে জোগার করে। নদীতে ভেসে আসা গাছগুলো ধরে এনে বাড়ির আশেপাশে লাগিয়ে দেয়। চরে অনেক কাশিয়া (কাশ বন) হয়। অনেক সময় কাশিয়া খড়ির আঁটি করে বাজারে বিক্রিও করে।
চরে গাছ-পালা তেমন নাই বললেই চলে। মাঝে মাঝে দুই একটা শিমুল গাছ দেখা যায়। আর আছে ঢোল কলমি এবং বিচিকলা গাছ। কলা গাছে কলা ধরে না, অনেক লম্বা গাছ হয়। যে চরে কলা গাছ বেশি সেই চরের মানুষদের মনে খুশিও বেশি। বর্ষার সময় এই কলা গাছ তাদের সঙ্গী। কলার ভেলায় নিজেরা থাকে, পরিবারের সদস্য হিসাবে গরুকেও ভেলাতে রাখে। চরে বেশিরভাগ পরিবারে গরু আছে। নিজেরা গরু কিনেছে এমন পরিবার নাই বললেই চলে। এই গরু টাকা দিয়ে কেনা নয়। পরিবারের মহিলারা চিলমারী সদর, উলিপুর (উপজেলা) অথবা কুড়িগ্রামে (জেলা) গিয়ে পরিচিত পরিবারের কাছ থেকে গরু চেয়ে আনে বর্গা বা আধি পালার জন্যে। অথবা ছেলেকে বিয়ে দিয়ে গরু যৌতুক পেয়েছে। তাই পরিবারের মহিলারা বলেন, ‘যার নাই গরু, সেই হয় সরু (চিকন)’।
চরে প্রচুর ঘাস হয়, কাশিয়া হয়। গরুর খাবারের কোন অসুবিধা হয় না। তবে চরে সাধারণত কেউ ছাগল পালতে চায় না। বন্যার সময় ছাগল পানি সহ্য করতে পারে না। ছাগলের জন্য ঘাস-পাতা পাওয়া যায় না। গরু কাশ বন খেতে পারে কিন্তু ছাগল তা খায় না।
নয়াকৃষি আন্দোলনের কাজ শুরু ২০০২ সাল থেকে
চিলমারী থানার তিনটি ইউনিয়ন অষ্টমীর চর, নয়াহাট ও চিলমারী বর্তমানে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের চরে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে দুইটি ইউনিয়ন অষ্টমীর চর ও চিলমারীতে নয়াকৃষি আন্দোলনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সাল থেকে। বর্তমানে দুই চরের ১৫টি গ্রাম - ১. মনতলা, ২. কড়াই বরিশাল, ৩. শাখাহাতি, ৪. নালিতার খাতা, ৫. বলমনদিয়ার খাতা, ৬. খামার বাঁশপাতা, ৭. বল্লভ পাড়া, ৮. গাজির পাড়া, ৯. মানুষ মারার চর, ১০ ঢুস মারা, ১১. বিষের পাড়া, ১২. মাঝ পাড়া, ১৩. নাটার কান্দি, ১৪. ফকির পাড়া ও ১৫. ডাটিয়ার চর, নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষি ব্যবস্থার সাথে জড়িত। এই গ্রামে মোট পরিবার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় বার হাজার। এর মধ্যে প্রায় দশ হাজারেরও বেশী কৃষক নয়া কৃষির সাথে জড়িত। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি চরে (গাজির পাড়া, মনতলা ও কড়াই বরিশাল) ৭৫টি কৃষক পরিবার নিয়ে নয়াকৃষি আন্দোলনের কাজ শুরু হয়েছিল।
নয়াকৃষি আন্দোলন
নয়াকৃষি আন্দোলন মানুষসহ গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, কীট-পতঙ্গ প্রতিটি প্রাণীর প্রতি ভালবাসা ও মায়া মমতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। রাসায়নিক সার, বিষ, সেচের যন্ত্র ও পানি ব্যবহার, ল্যাবরোটারিতে উৎপাদিত এবং কোম্পানীর বাজারজাত বীজ ব্যবহার না করেও চাষাবাদ করা যায়, এটাই নয়াকৃষি। নয়াকৃষি মানেই আনন্দময় জীবনযাপন। নয়াকৃষি পদ্ধতিতে সার, বিষ ছাড়া ফসল উৎপাদন করা এবং অতি সহজেই অধিক ফলন ফলানো সম্ভব। অর্থাৎ প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাই হলো নয়াকৃষি। নয়াকৃষি আন্দোলনের নীতি রয়েছে ১০টি। এর প্রথম নীতি হলো-বিষ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সকল প্রকার কীটনাশকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা নয়াকৃষির প্রথম নীতি। এ ব্যপারে কৃষকের সাথে কোন আপোষ নাই। নয়াকৃষির কৃষকেরা নিজেরাই স্থানীয় বা দেশী বীজ ঘরে রাখে। কারণ দেশীয় বীজের রোগ বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশী। নয়াকৃষি মিশ্র ফসলের চাষ করে। মিশ্র ফসলের চাষ করলে পোকা-মাকড়ের আক্রমন হয় না। রোগ-বালাইও কম হয়।
নয়াকৃষি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আগে
এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অত্যন্ত গরিব এবং তাদের নিজস্ব জমি জায়গা নাই। বসত ভিটাও পরের জমিতে। যারা অন্যের জমিতে থাকে, তারা মাটি ভাড়া হিসাবে জমির মালিককে কোন টাকা দেয় না। নিজের জমির মতই বসতভিটা তৈরী করে ব্যবহার করছে। জমির আসল মালিক বেশির ভাগ থাকে শহরে, কুড়িগ্রাম, ঢাকা বা দেশের অন্য কোন শহরে। তারা খুব একটা খোঁজ-খবর নেয় না। কেননা প্রতি নিয়তই চর ভাংছে এবং নতুন চর জাগছে। নতুন চর হলে ১/২ বছর কোন আবাদ করা যায় না। জমিতে মাটি থাকে না, শুধু থাকে বালি। তাই জমির মালিকদের চরের জমির প্রতি খুব একটা গরজ থাকে না।
চরে কোন কাজ নাই বলে পুরুষেরা অন্যান্য জেলায় কাজের জন্য যায়। তারা বেশির ভাগ কৃষি কাজ করে অর্থাৎ কৃষিতে কামলা কাজ। ফসল লাগাবার সময় এবং ফসল কাটার সময় তারা বিভিন্ন জেলায় কাজে যায়। কাজের আশায় চরের লোকেরা পাড়ি জমায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, নোয়াখালী, বিক্রমপুর, ঢাকা, টাংগাইল কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কিছু কিছু মানুষ শহরে রিক্সা চালকের কাজও করে। এক নাগারে তিন-চার মাস বিদেশে (নিজের এলাকা বাদে দেশের মধ্যে বিভিন্ন জেলাকে তারা বিদেশ বলে) কাজ করে পুরুষেরা ঘরে ফিরে। আর যে টাকা রোজগার করে নিয়ে আসে তা দিয়ে চরের মুদির দোকানে বউ বাচ্চাদের বাকি খাওয়ার দেনা পরিশোধ করে। নিজ বাড়িতে ১২-১৪ দিন অথবা এক মাস থেকে আবার কাজের জন্য বেড়িয়ে পরে পুরুষেরা। মহিলারা গরুর ঘাস কাটে, খড় জোগার করে, সংসারের কাজ করে। এই হলো তাদের কাজ।
নয়াকৃষি আন্দোলনের কাজ শুরুর আগে এই এলাকায় কিছু কৃষকেরা এক ফসলী ইরি আবাদের সাথে যুক্ত ছিল। কৃষকের হাতে ছিল না কোন দেশীয় ধান অথবা অন্যান্য ফসলের বীজ। চরে কোন বড় গাছপালা ছিল না। কেবলমাত্র বিচি কলা, ঢোল কলমি আর কয়েকটা ভেরেন্ডার গাছ। চরের মাটি হয়েছিল নষ্ট। মহিলাদের হাতে ছিল না কোন সবজির বীজ। বছরের আট থেকে দশ মাস চর এলাকার বাড়িগুলোতে কাজ করতে সক্ষম এমন পুরুষ মানুষের সাক্ষাত পাওয়া ছিল ভার। বাড়িতে সাধারণত থাকতো বৃদ্ধ পুরুষ, মহিলা ও শিশুরা।
কাজের আশায় মেয়েদের চরের বাইরে যাওয়া
চিলমারী চর এলাকায় খুব অল্প বয়সের মেয়েদের (নয়, দশ বছর) বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ। যৌতুক ছাড়া চরের মেয়েদের বিয়ে হয় না। চরে যৌতুককে বলে ‘ডিমান্ড’। যদি চর এলাকার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেয় তাহলে ১টা গরু আর কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা ডিমান্ড হিসাবে দিতে হয়। সাথে থাকে শাড়ি কাপড় আর হাতে তৈরী একটা কাঁথা। এটা দিতেই হয়। আর যদি কাইম এলাকায় (চর ছাড়া উঁচ জায়গা বা শহরের কাছাকাছি গ্রাম) মেয়ের বিয়ে হয় তাহলে টাকা আরও বেশি লাগে। মা-বাবারা মেয়ের বিয়ের জন্য কাইম এলাকা পছন্দ করলেও চরের ছেলের সাথেই মেয়ের বিয়ে দেয়। কাইম এলাকায় মেয়ে বিয়ে দিলে স্থায়ী জায়গায় বসবাস হয় ঠিকই কিন্তু ডিমান্ড লাগে অনেক বেশি। মা-বাবারা ডিমান্ডের এত টাকা জোগার করতে পারে না।
চরে ১০ বছর থেকে মেয়েদের বিয়ের বয়স হয়েছে বলে ধরে নেয়। ছোট বয়সে বিয়ে হলে ডিমান্ড কম লাগে। এ জন্য মা-বাবারা তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। কিন্তু দেখা গেছে বিয়ের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ হাজার টাকা বিয়ের এক বছরের মধ্যে মেয়ের বাবা জামাইকে (মেয়ের স্বামী) দিতে না পারার কারণে বহু বিবাহিত মেয়ে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে বছরের পর বছর। মেয়েদের বয়স ১০-১২ বছর হলেও যেহেতু তাদের বিয়ে হয়েছিল তাই তারা শাড়ি পরে। তারা আর মেয়ে থাকে না, হয়ে যায় মহিলা। অনেকের কোলে একটা বাচ্চা। এই মেয়েদের মুখে হাসি নাই। একটা অসহায় ভাব চোখে মুখে। সব সময় লোকের মুখে শুনছে, যৌতুকের টাকা বাপে দিতে পারে নাই বলে স্বামী ফেলে রেখে গেছে।
স্বভাবতই চর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামগুলি থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘বাড়ির কাজ’ এর কথা বলে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া ছিল সহজ। গরিব মা বাবারা স্বেচ্ছায় সন্তানদের কাজের আশায় পাঠাত দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আর এই সুযোগকে ব্যবসা আকারে গ্রহণ করে কিছু মানুষ। মেয়েদের বিভিন্ন এলাকায় কাজে নেওয়ার ব্যপারে বিশেষ ভূমিকা রাখে গ্রামের আশেপাশের মহিলারা। শহরে মেয়েকে কাজে দিলে সে খেয়ে, পরে ভাল থাকবে এবং তার মা-বাবাকে টাকা পাঠাতে পারবে-এই প্রলোভন দেখান হয়। কাজের নামে গ্রামের মহিলারা মেয়েদের শহরে নিয়ে যায়। গ্রামে তাদের সবাই চিনে। তাদের (মহিলাদের) ‘দালাল’ বলে। দেখা গেছে ‘দালাল’ কাজের জন্য মেয়েকে নিয়ে ঢাকা গেছে কিন্তু ছয় মাস পরে যে বাড়িতে মেয়েটিকে দেওয়া হয়েছিল সেই বাড়িওয়ালী তার মেয়ের বাড়ি চট্টগ্রামে কাজের মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছে। ‘দালাল’ আর সেই মেয়ের ঠিকানা পায় না। আর গ্রামে মা-বাবারা জানে না যে তার সন্তানেরা কাজের নামে কোথায় যাচ্ছে। আদো কাজ করছে কি না অথবা কি ধরণের কাজে জরিত আছে। এইভাবে পরিবারের সাথে অনেকের সম্পর্ক হয়ে যায় ছিন্ন।
নয়াকৃষির ফলে চরের মানুষ কাজের জন্য আর বাইরে যায় না
চিলমারী থানার দুইটি ইউনিয়ন অষ্টমীর চর ও চিলমারীতে নয়াকৃষি পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরুর পর থেকে নয়াকৃষির কৃষকেরা কাজের জন্য চরের বাইরে আর যায় না। কৃষকের হাতে স্থানীয় জাতের আমন ধানের বীজ আছে ২৫ জাতের। আউশ ধানের জাত আছে ৬ প্রকার। আরও আছে তেল (সরিষা, তিসি, তিল) তিন প্রকার। ডাল (মুসুরী, খেসারী, মটর, কালাই, বুট) পাঁচ প্রকার। কাউন, চিনা, বাদাম, গম, মসলা ধনিয়া, মৌরি, পিয়াজ রসুন, শাক-সবজিসহ আরও অন্যান্য বীজ কৃষকের হাতে রয়েছে।
কৃষকরা আউশ, আমন এবং রবি শস্যের সাথে মিশ্র আবাদ করে ফসল ফলায়। আউশ ধানের সাথে আমন ধান। চরে আউশ ধান ‘গরিয়া চাপাল’ এবং আমন ধান ‘গাঞ্জিয়া’ প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে ছিল। নয়াকৃষির কৃষকেরা সেই ধান আবার ফিরিয়ে এনেছে। কৃষকেরা মিশ্রফসল হিসাবে আমন ধানের সাথে তিল, কাউন আবাদ করে। রবি শষ্য হিসাবে আবাদ করে খেসারীর সাথে সরিষা, বাদাম (চিনা বাদাম) এর সাথে মিষ্টি আলু, মুলার সাথে লাল শাক, ডাঁটা। ধনিয়ার সাথে আবাদ করে আলু। বেগুনের সাথে মরিচ, পেয়াজের সাথে রসুন। গমের সাথে আবাদ করে কুসুম ফুল। কুসুম ফুল দিয়ে তেল হয়।
গমের সাথে আপন জালা (নিজে নিজেই হয়) থাকে বথুয়ার শাক রবি শষ্যের আবাদ শেষ হলে জমিতে লাগায় পাট। কৃষকদের ঘরে এখন সব সময় কাজ। কৃষি কাজে মেয়েরাও সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে। যাদের জমি নাই সেই পরিবারের মেয়েরা জমি নিরানো, বাদাম তেলা, পাট বাছা, ডাল তোলা নানারকম কামলা কাজ গ্রামেই করে। দুই ধামা (বাঁশের বড় ঝুড়ি) বাদাম তুললে এক কেজি বাদাম দেয়া হয়। যাদের ঘরে গরু আছে তারা বাদাম না নিয়ে গরুর খাবারের জন্য বাদাম গাছগুলো এনে থাকে। চরে এখন সারা বছরই কৃষি কাজ। মেয়েরা আর ‘বাড়ির কাজ’ এর মানুষ হিসাবে চরের বাইরে যায় না। প্রতি বাড়িতেই দেখা যায় মিষ্টি কুমড়া, আনাজি কচু, লাউ গাছ, ডেমরা (ধন্দুল), দুধকুশি (চিচিংগা), সাতপুথি (ধুন্দলের মত আকারে ছোট), বিভিন্ন জাতের সবজির গাছ। কুড়িয়ে পাওয়া শাক যেমন-ডেমার, কেরেন্ডা, কাঁটাশাক, চরাই ঠুঙ্গি, ডিমলা নুনা, হেলেঞ্চা, কলমি, বথুয়া এ সব নয়াকৃষি পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার পর এখন পাওয়া যাচ্ছে।
নয়াকৃষি আন্দোলনের বর্তমান কৃষকেরা
বর্তমানে ১০,০০০ (দশ হাজার) এরও বেশী কৃষক পরিবার নয়াকৃষি পদ্ধতিতে চাষাবাদের সাথে যুক্ত। নয়াকৃষির কৃষকেরা একজন অপরের সাথে বীজ বিনিময় করে। বীজ রাখার সুবিধার্থে তাদের তিনটি (তিন এলাকায়) বীজঘর তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। তিনটি বীজ ঘর আছে-বলবনদিয়ার খাতা, কড়াই বরিশাল ও মানুষমারার চরে। এই বীজ ঘরকে ‘বীজ আখড়া’ বলা হয়। কৃষকরা নিজের ঘরেও বীজ রাখে পারে আবার কৃষকদের নিজের ঘরে বীজ রাখতে অসুবিধা হলে বীজ আখরাতেও বীজ রাখে। জমি চাষের মৌসুমে তারা প্রয়োজন অনুসারে বীজ বেড় করে নেয়। নয়াকৃষির সদস্যের বাড়ীতে বীজ আখড়া তৈরী করা হয়েছে। বীজ ঘর দেখাশুনা করে সেই বাড়ীর মহিলা কৃষক। জমিতে চাষের মৌসুমে নয়াকৃষির সদস্যরা একত্রে বসে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে যার যতটুকু প্রয়োজন বীজ নেয়। ফসল ঘরে তুলা হলে যে পরিমাণ বীজ দেওয়া হয়েছিল তার থেকে কিছু বেশী বীজ ‘বীজ আখড়া’য় জমা দেয়।
চিলমারী চরের কৃষকেরা এখন মিশ্র ফসলের আবাদ করে। কৃষি কাজে কীটনাশক ব্যবহার করে না। চরের বাড়িগুলোর ঘরের চালে দেখা যায় মৌসুম অনুসারে লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, ধুন্দল, ঝিংগা, সাতপুঁথি আরও কত কি।